ইবি ছাত্রীকে আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক: হাইকোর্ট
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ছাত্রীকে কক্ষে আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। এ সংক্রান্ত রিটের শুনানিতে বৃহস্পতিবার (১৬ফেব্রুয়ারি) হাইকোর্টের বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আদালত বলেন, এটি অ্যালার্মিং।
এছাড়া এ বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। তিন দিনের মধ্যে কমিটি করে সাত দিনের মধ্যে সেই রিপোর্ট দেবে তদন্ত কমিটি। সেই সঙ্গে নির্যাতনকারী দুই শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। নির্যাতনের শিকার ছাত্রীকে নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এছাড়া ভাইরাল হওয়া ভিডিও বিটিআরসিকে সরানোর নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
এদিকে বুধবার কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ছাত্রী নির্যাতনের ঘটনায় ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সেই সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যায়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এইচ এম আলী হাসান স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আইন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক রেবা মণ্ডলকে আহ্বায়ক ও একাডেমিক শাখার উপরেজিস্ট্রার মো. আলীবদ্দীন খানকে সদস্যসচিব করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন প্রভোস্ট কাউন্সিলের সভাপতি অধ্যাপক ড. দেবাশীষ শার্মা, খালেদা জিয়া হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন আরা সাথী ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ও সহকারী প্রক্টর মুর্শিদ আলম।
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নির্যাতেনর ঘটনায় রিটের শুনানির শুরুতেই হাইকোর্ট জানতে চান মামলা হয়েছে কি না? জবাবে রিটকারী আইনজীবী গাজী মো. মহসীন বলেন, এখনো মামলা হয়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। আদালত বলেন, টর্চার হয়েছে? আইনজীবী বলেন, হ্যাঁ। এটাতো ক্রিমিনাল অফেন্স (ফৌজদারি অপরাধ)। ওই ছাত্রী লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। এখনো কিছুই করেনি।
আদালত বলেন, আবেদনে কি চেয়েছেন? আইনজীবী মহসীন বলেন, যাদের কাছে ভিডিও আছে সংগ্রহ করে অপসারণ করা, দুই নেত্রীকে তলব এবং ওই ঘটনায় রুল জারির আর্জি জানানো হয়েছে। ভিডিও সংগ্রহ করে রিমুভ করা দরকার। এগুলো ছড়ালে তার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে।
এসময় ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার কান্তি রায় বলেন, আমি কথা বলেছি। তদন্ত হচ্ছে। প্রতিবেদন আসলে ভালো হয়। আদালত বলেন, তদন্ত কে করছে? তুষার কান্তি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আইনজীবী মহসীন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো মামলা করেনি। বিষয়টি এখানে দলীয় নয়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার পরিবেশের বিষয়। আদালত বলেন, তদন্ত যেটা হচ্ছে সেটা যথেষ্ট মনে করেন? মহসীন বলেন, আপনারা প্রতিবেদন চাইলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে পারে। বিচার বিভাগীয় তদন্ত দিতে পারেন। এসময় আদালত বলেন, অনেক সময় শিক্ষকরা চাপে থাকেন। তারা যথাযথভাবে তদন্ত করতে পারে না। দুই মেয়েকে ক্যাম্পাসের বাইরে থাকতে বলেন। এটা অ্যালার্মিং।
আইনজীবী মহসীন বলেন, আমাদের সময় এসব র্যাগিং ছিল না। পরে আদালত এ বিষয়ে রুল জারিসহ কয়েক দফা আদেশ দেন। আদেশে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী নির্যাতনের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটিকে আগামী ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসককে তিন দিনের মধ্যে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। ডিসির করা কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহকারী অধ্যাপক, প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা ও জেলা জজ মনোনীত একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে রাখতে বলা হয়েছে।
তদন্ত চলাকালে ছাত্রলীগের নেত্রী সানজিদা চৌধুরী ও তাবাসসুমকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরে রাখতে বলা হয়েছে। তবে তদন্ত কমিটি চাইলে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে। আর ওই ছাত্রীকে বিবস্ত্র করে ধারণ করা ভিডিও যাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার না হয়, সে বিষয়ে বিটিআরসিকে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত বলেছেন, নির্যাতিত শিক্ষার্থী চাইলে ফৌজদারি মামলা করতে পারবেন।
এর আগে ছাত্রীকে নির্যাতনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে বুধবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গাজী মো. মোহসীন জনস্বার্থে রিট করেন। ওই ঘটনায় নেতৃত্বে থাকা ছাত্রলীগের দুই নেত্রীকে তলব এবং বিবস্ত্র করে ধারণ করা ভিডিও মুছে ফেলতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি নির্দেশনা চাওয়া হয় আবেদনে।
কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলে সাড়ে চার ঘণ্টা আটকে রেখে প্রথম বর্ষের এক ছাত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগের ঘটনায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সানজিদা চৌধুরীর নেতৃত্বে তার অনুসারীরা শেখ হাসিনা হলের গণরুমে ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে তার ওপর নির্যাতন চালায়।
ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীর অভিযোগ, সেখানে পাঁচ থেকে ছয়জনের একটি দল তাকে দিনগত রাত সাড়ে তিনটা পর্যন্ত নানাভাবে নির্যাতন করে। নির্যাতনের সময় তাকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ এবং গালাগালও করা হয়। আর ঘটনা কাউকে জানালে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওই শিক্ষার্থীর।
সানজিদা চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। অন্য অভিযুক্ত তাবাসসুম ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের। আর ভুক্তভোগী ছাত্রীও একই বিভাগের। নির্যাতনের ঘটনায় মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর, হলের প্রভোস্ট ও ছাত্র উপদেষ্টার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ওই শিক্ষার্থী।
জানা গেছে, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলে প্রথম বর্ষের এক ছাত্রীকে সাড়ে চার ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতনের বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এর মাত্র কয়েকদিন আগেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে চার ছাত্রকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে দুই ছাত্রকে আইসিউতে ভর্তি করা হয়।
এফএইচ/এমআইএইচএস/জেআইএম