মাথায় জাহাজ, ম্যাডোনা যেন জীবন্ত চিত্রকর্ম
‘ম্যাডোনা’ নামটাই যেন এক ধরনের ঘোষণা। চমক, সাহস, ভাঙাগড়া আর শিল্প-সবকিছুর এক জীবন্ত প্রতীক। ৬৭ বছর বয়সেও তিনি যে এখনও ফ্যাশন আর পারফরম্যান্সের নিয়ম নতুন করে লিখতে পারেন, তা আবারও প্রমাণ করলেন এবারের মেট গালায়।
এবারের থিম ছিল ‘কস্টিউম আর্ট’। অনেকেই যেখানে পোশাক দিয়ে থিম ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন, সেখানে ম্যাডোনা সেটিকে নিয়ে গেছেন এক ধাপ এগিয়ে; তিনি শুধু পোশাক পরেননি, বরং নিজেকে পরিণত করেছেন একটি চলমান শিল্পকর্মে।
ম্যাডোনার এবারের লুকের অনুপ্রেরণা এসেছে সুররিয়ালিস্ট শিল্পী লিওনোরা ক্যারিংটনের একটি বিখ্যাত চিত্রকর্ম থেকে। সেই চিত্রে যেমন এক রহস্যময় নারীকে দেখা যায় অদ্ভুত গঠন ও প্রতীকী উপাদানে ঘেরা অবস্থায়, তেমনই বাস্তবে তার প্রতিফলন তুলে ধরেছেন ম্যাডোনা।
এই লুকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তার টপ হ্যাট, যার ওপরে বসানো ছিল একটি ছোট জাহাজ। এটি নিছক অলংকার নয়, বরং প্রতীক। অজানা যাত্রা, স্বাধীনতা এবং শিল্পের অনির্ধারিত গন্তব্য; সবকিছুর এক চমৎকার উপস্থাপনা। হাতে ধরা হর্নটি যেন সেই যাত্রার ঘোষণা, এক ধরনের শিল্পীসুলভ আহ্বান।
ম্যাডোনা বেছে নিয়েছিলেন কালো রঙের পোশাক, যা সবসময়ই রহস্য, গভীরতা এবং শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সাদামাটা মনে হওয়া বেস লুকই আসলে পুরো শিল্পকর্মটির জন্য একটি ক্যানভাস হিসেবে কাজ করেছে। এর ওপরই স্তরে স্তরে যুক্ত হয়েছে প্রতীক, প্রপস এবং নাটকীয়তা।
তবে এই লুকের সবচেয়ে নাটকীয় অংশ ছিল বিশাল ধূসর রঙের স্বচ্ছ ওড়না। এতটাই বড় এবং বিস্তৃত ছিল এটি যে সেটি বহন করতে হয়েছে সাতজন নারী সহকারীকে। প্রতিটি সহকারী পরেছিলেন ভিন্ন ভিন্ন প্যাস্টেল রঙের পোশাক, যা পুরো দৃশ্যকে দিয়েছে এক স্বপ্নিল, প্রায় অলীক আবহ।
তাদের চোখে থাকা স্বচ্ছ অলংকার যেন পরিচয়হীনতা এবং সমষ্টিগত শিল্পচর্চার প্রতীক। এখানে ব্যক্তিগত উপস্থিতির চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে সামগ্রিক উপস্থাপনা। ম্যাডোনা যেন কেন্দ্রবিন্দু হলেও, এই সাত নারী তাকে ঘিরে তৈরি করেছেন এক পূর্ণাঙ্গ শিল্পমঞ্চ।
ম্যাডোনার এই উপস্থিতি কেবল ফ্যাশনের প্রদর্শনী নয়, বরং একটি দার্শনিক বক্তব্য। তিনি এখানে নিজেকে তুলে ধরেছেন এমন একজন শিল্পী হিসেবে, যিনি প্রচলিত সীমার বাইরে গিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন। তার পোশাক, প্রপস, এমনকি সহকারীদের উপস্থিতিও সেই স্বাধীনতা এবং ভিন্নধর্মী শিল্পচর্চার প্রতীক। এটি এক ধরনের প্রতিবাদও; যেখানে ফ্যাশনকে শুধু সৌন্দর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, তাকে ভাবনার জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়।
আরও পড়ুন:
১৯৯৭ সাল থেকে মেট গালার নিয়মিত মুখ ম্যাডোনা। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি প্রতিবারই চেষ্টা করেছেন নতুন কিছু উপস্থাপন করতে। কখনো বিতর্কিত, কখনো সাহসী, কখনো একেবারে শিল্পময়-প্রতিটি উপস্থিতিই ছিল আলাদা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বরং বয়সকে অগ্রাহ্য করে তিনি আবারও দেখিয়ে দিলেন, সৃজনশীলতার কোনো সীমা নেই।
৬৭ বছর বয়সে এসে অনেকেই যেখানে নিজেকে সীমিত করে ফেলেন, সেখানে ম্যাডোনা নিজেকে আরও বিস্তৃত করেছেন। তার এই উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দেয়-শিল্প, সৃজনশীলতা এবং নিজেকে প্রকাশ করার ক্ষমতার সঙ্গে বয়সের কোনো সম্পর্ক নেই। এবারের মেট গালায় ম্যাডোনার উপস্থিতি ছিল এক কথায় অসাধারণ। তিনি শুধু একটি থিম অনুসরণ করেননি, বরং সেটিকে নিজের মতো করে নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন।
জেএস/