ভিন্টেজ গ্ল্যাম লুকে তাক লাগলেন দেশিকন্যা প্রিয়তী
ফরাসি রিভিয়ারার আকাশে তখন উৎসবের রঙ। বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়োজন কান চলচ্চিত্র উৎসবের রেড কার্পেট যেন প্রতি মুহূর্তে নতুন কোনো ফ্যাশন ইতিহাসের জন্ম দিচ্ছিল। আর সেই ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আইরিশ অভিনেত্রী ও সাবেক ‘মিস আয়ারল্যান্ড’ মাকসুদা আখতার প্রিয়তী। তার উপস্থিতি ছিল শুধু একটি ফ্যাশন স্টেটমেন্ট নয়, বরং পুরনো হলিউডের অভিজাত গ্ল্যামার আর আধুনিক নারীর আত্মবিশ্বাসী সৌন্দর্যের এক অসাধারণ প্রকাশ।
রেড কার্পেটে হাঁটার মুহূর্তেই প্রিয়তী যেন সময়কে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন আশির দশকের সেই ক্ল্যাসিক গ্ল্যামের যুগে। তবে পুরো বিষয়টিকে তিনি উপস্থাপন করেছেন একেবারে সমসাময়িক ব্যাখ্যায়। তার লুক ছিল এমন, যেখানে রাজকীয়তা আছে, নাটকীয়তা আছে, আবার একই সঙ্গে আছে পরিমিত সৌন্দর্যের সূক্ষ্ম নান্দনিকতা।
প্রিয়তীর পরনে ছিল আইরিশ ডিজাইনার জেরালডিন ও মিয়ারার তৈরি কাস্টম-মেড হলুদ পেপলাম গাউন। প্রথম দেখাতেই পোশাকটির সূক্ষ্ম কারুকাজ চোখে পড়ে। গাউনের বডিস ও স্লিভজুড়ে সিকুইন, পুঁতি এবং ক্রিস্টালের স্ট্রাইপড এমব্রয়ডারি আলো প্রতিফলিত করে তৈরি করছিল এক ঝলমলে আবহ। আলো-ছায়ার খেলায় পোশাকটি কখনো সোনালি, কখনো উজ্জ্বল হলুদ, আবার কখনো নরম অ্যাম্বার আভা ছড়িয়ে দিচ্ছিল।
তবে গাউনটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল এর নাটকীয় স্লিভ ডিজাইন। ডান পাশের স্লিভে ব্যবহৃত বাটারফ্লাই মোটিফ পুরো লুকে এনে দিয়েছে এক ধরনের শিল্পিত কোমলতা। অন্যদিকে বাম পাশের বোল্ড, পাফড ও স্ট্রাকচারড ফুলস্লিভটি যেন ফ্যাশনের ভাষায় শক্তিশালী এক ঘোষণা। এর সঙ্গে যুক্ত ফেদার ডিটেইলিং পুরো পোশাককে দিয়েছে হাই-ফ্যাশন রানওয়ের অনুভূতি। যেন এটি শুধু একটি গাউন নয়, বরং পরিধানযোগ্য শিল্পকর্ম।
কোমর থেকে নেমে আসা ফ্লোর-লেংথ স্কার্ট অংশটি ছিল ছিমছাম, পরিমিত এবং অত্যন্ত এলিগ্যান্ট। পেপলাম কাটের সঙ্গে ফ্লোয়িং স্কার্টের ভারসাম্য পুরো লুকে এনে দিয়েছে রাজকীয় সৌন্দর্য। ক্ল্যাসিক ভিন্টেজ স্টাইলের সঙ্গে আধুনিক কাট ও টেক্সচারের এমন নিখুঁত মিশেলই প্রিয়তীর উপস্থিতিকে অন্যদের ভিড়ে আলাদা করে তুলেছে।
শুধু পোশাকেই নয়, অ্যাক্সেসরিজ নির্বাচনেও ছিল দারুণ পরিমিতি। আইরিশ জুয়েলারি ও অ্যাক্সেসরি ডিজাইনার ফিওনা র্যাফটার-এর তৈরি গয়না ও ব্যাগ পুরো লুককে আরও পরিশীলিত করেছে। অতিরিক্ত চাকচিক্যের বদলে মিনিমাল অথচ স্টেটমেন্টধর্মী অলংকার ব্যবহার করে তিনি প্রমাণ করেছেন, সত্যিকারের এলিগ্যান্স কখনো উচ্চস্বরে কথা বলে না।
চুলের স্টাইলেও ছিল ভিন্টেজ অনুপ্রেরণার স্পষ্ট ছাপ। সাইড-পার্টেড শর্ট বব হেয়ারস্টাইলটি মনে করিয়ে দিচ্ছিল আশির দশকের হলিউড তারকাদের সেই আইকনিক গ্ল্যাম লুক। এতে ছিল আত্মবিশ্বাস, ছিল ক্ল্যাসিক সৌন্দর্যের আবেদন। অন্যদিকে মেকআপে তিনি বেছে নিয়েছেন নরম অথচ উজ্জ্বল এক গ্ল্যামার। গালে হালকা ব্লাশ, ঠোঁটে গ্লসি ন্যুড শেড এবং চোখে কাজল ও শিমারি হলুদ-সোনালি আইশ্যাডোর মিশ্রণ তার পুরো উপস্থিতিকে দিয়েছে এক পরিণত ও অভিজাত ফিনিশ।
বর্তমান ফ্যাশন দুনিয়ায় যেখানে অনেক সময় অতিরিক্ত নাটকীয়তা বা পরীক্ষামূলক উপস্থাপনাই বেশি দেখা যায়, সেখানে প্রিয়তীর এই উপস্থিতি ছিল ব্যতিক্রম। তিনি দেখিয়েছেন, গ্ল্যামার মানেই কেবল ঝলক নয়; এর সঙ্গে থাকতে হয় ব্যক্তিত্ব, রুচি এবং নিজস্ব স্টাইলের স্বাক্ষর।
কান উৎসবের রেড কার্পেটে মাকসুদা আখতার প্রিয়তীর উপস্থিতি শুধু ফ্যাশনপ্রেমীদের নজর কাড়েনি, বরং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন নারীর আন্তর্জাতিক মঞ্চে আত্মবিশ্বাসী ও গ্ল্যামারাস প্রতিনিধিত্ব হিসেবেও আলোচনায় এসেছে। তার এই লুক যেন মনে করিয়ে দেয়; ফ্যাশন কেবল পোশাক নয়, এটি নিজেকে প্রকাশ করার এক শিল্প, যেখানে প্রতিটি রং, প্রতিটি কাট এবং প্রতিটি ভঙ্গিই বলে দেয় একেকটি গল্প।
জেএস/