বেলাল চৌধুরীর কবিতার বিষয়বৈচিত্র্য

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ , লেখক ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৫:৩২ পিএম, ২৫ এপ্রিল ২০১৮

কবি বেলাল চৌধুরী চলে গেলেন। চলে গেলেও রেখে গেলেন অজস্র সৃষ্টিকর্ম। তাঁর সৃষ্টিকর্মের বিষয়বৈচিত্র্য আমাদের আলোড়িত করে। তিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, সম্পাদক ও অনুবাদক। সাহিত্যের সব শাখাতেই তাঁর পদচারণা লক্ষ্য করা যায়। তবুও তাঁকে কবি হিসেবেই সম্বোধন করা হয়। তাঁর কবিতায় জগৎ সংসারের পরিচিত দৃশ্যপট, ব্যক্তিক অনুভূতি, স্বদেশ, মানুষ আর প্রকৃতির অপূর্ব সৌন্দর্য লীলায়িত। তাঁর কবিতার বিষয়বৈচিত্র্য পাঠককে বিমুগ্ধ করে।

কবি প্রিয়জনকে বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করেন। কখনো বা বৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর এই তুলনার তুলনা করাও খুবই কঠিন। তিনি যা বলতে চান, আমরা যেন সহজেই তা বুঝতে পারি। কবি বলেন-
‘জটিল অরণ্যে তুমিই একমাত্র বিটপী
শালের মত অটল, সেগুনের মত নমনীয় ও কোমল
ঝাউয়ের মত তোমার মর্মরিত মাধুর্যের দিকে, কাঠুরেও
তার কুড়ালের হাতলে আলতো হাত রেখে দাঁড়ায় ফিরে।’
তাঁর কবিতার উপমা মুগ্ধ করে পাঠককে। ‘উড়ন্ত উজ্জ্বল সবুজ চুল’, ‘অরণ্যের বিষণ্নতা’, ‘রাজফুলের মত তোমার রক্তিম অধর’ বলে দেয় উপমা নির্মাণে তিনি কতোটা সিদ্ধহস্ত ছিলেন।

কবি বেলাল চৌধুরীর কবিতায় আত্মশ্লাঘা প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। কবিতায় শব্দে শব্দে যে হাহাকার তোলে, তা পাঠককেও সংক্রমিত করে। কখনো কখনো নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কেও সচেতন হয়ে ওঠেন তিনি। কবি বলেন-
‘নিদারুণ তৃষ্ণায় ছটফট করছি- হায় রে জলধারা
কিন্তু এবার ওরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ- নিষ্কৃতি নেই আমার
নির্বাসনে মৃত্যুদণ্ড- ঠাণ্ডা চোখে দেখছি আমি
নীল কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে আমার দেহ।’

কবিতায় তিরস্কারকে একটি শৈল্পিক মাত্রা দিয়েছেন তিনি। ‘খর্বকায় বামনের গান’ কবিতায় তিনি কাদের তিরস্কার করলেন? ‘বুড়ো হাবড়া’ বলে তিনি কাদের খোঁচা দিতে চাইলেন। সেটা বুঝতে হয়তো কারোই বাকি নেই। তিনি বলেন-
‘খাটো বহর ওদো, অতীতচারি ওরা হাওড়ায়
নিজেদের শিকর সম্পর্কে জ্ঞাত অজ্ঞাত
বহু বহু বরকনদাজি গুল গল্প
যাকে এক কথায় বলা যায় বার ফট্টাই...’

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে সুচারুরূপে তুলে ধরেন কবিতায়। দেশপ্রেমে সমুজ্জ্বল তাঁর কাব্য সম্ভার। কবি বলেন-
‘ভাষারিক্ত মৌন মিছিলে একাকার বুড়িগঙ্গা
দিন যায় দিন আসে ফের- আমরা ভাগাভাগি করি সুন্দরকে
অন্ধকার বীজতলায় বোনা দুঃখকেও।’
কবি কত সহজেই বলতে পারেন ‘গোধূলিতে গোলাপি মেঘ’, ‘শিমুলের পাঁজর ফাটা বিষম লাল’, কিংবা ‘বারুদগন্ধী ফেব্রুয়ারি’। কবিতায় ব্যবহৃত উপমাগুলো একত্রিত করে দেখলে মনে হয়- এই কথাগুলো যেন নতুন। অথচ কী গভীর মমতায় হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া। কবির উপমাগুলো এরকম-
১. পিপাসিত হৃদয়ের আমলকী
২. দাবদগ্ধ নীল ঠোঁট
৩. শিশুর মতোন পরিষ্কার টলটলে চোখ
৪. রণরক্ত পৃথিবী
৫. অঘ্রাণ হেমন্তের যত বিপন্ন বিষাদ
৬. চঞ্চল চিত্তের যাবতীয় দ্রোহ
৭. রোষ কষায়িত মায়ারজ্জু
৮. হাওয়ার গহ্বরে গড়ে তুলতে চাই কীর্তিস্তম্ভ
৯. ছেঁড়া খোঁড়া মেঘ
১০. উড়ন্ত শিমুলের তুমুল রক্তোচ্ছ্বাস
১১. কুয়াশার মতো নৈঃশব্দ্য প্রভৃতি।

ষাটের দশকের অন্যতম শক্তিমান এই কবির কলমে গালমন্দও কেমন শৈল্পিক হয়ে যায়। অনায়াসেই বলে দেন- ‘গণ্ডদেশে শালা শুয়ারের বাচ্চা বলে ক্যাত করে সজোর চপেটাঘাতে
অবগাহন করতে চাই গঙ্গা পদ্মার একই ঘোলা জল প্রবাহে
সোদরপ্রতিম পড়শি প্রতিবোধনে...’

কবির স্মৃতিতে ‘বাল্যকালের নীল জামা’টিও চলে আসে। প্রিয় বস্তুটির জন্য তাঁর অপরিসীম দরদ পরিলক্ষিত হয়। চোখের সামনে আজও কেমন স্পষ্ট অমলিন হয়ে ওঠে বাল্যকালের গন্ধমাখা নীল জামা। বাল্যকালের দুরন্তপনার হাজার চিহ্ন আঁকেন কবিতায়। কবি বলেন-
‘রোদে পোড়া ঘামে ভেজা হাওয়ায় ওড়া-
যেন অস্থির এক প্রজাপতির রঙিন প্রগলভতা;-
নীল পাহাড়ের নিরুদ্দেশে মেঘের রেশম-স্বাধীনতা!’
অভিমানী কিশোরের চোখের জলে ভেজা নীল জামাটি তার লাল দোপাটি, দাঁত-কপাটি, হাবুডুবু, শালুক খোঁজা, বুকের দুরুদুরু, পায়ের নিচে পক্ষীরাজের খুরধ্বনি, চোখের সামনে তেপান্তরের সম্মোহন। কবিতায় একটি নীল জামাকে কেন্দ্র করে কত রকমের স্মৃতি থাকতে পারে, তা-ই তুলে এনেছেন কবি।

কবির কাজই কল্পনা। বাস্তবতার আলোকে কল্পনার সুতায় টান মেরে কখনো কখনো মেঘের দেশেও পাড়ি জমান কবি। কবি মেঘ আর ঘরকে এক সুতোয় বেঁধে নিতে চান। ঘর এবং মেঘকে তিনি সমান সুদূর বা নিরুদ্ধেশ বলে অভিহিত করেছেন। তার কাছে মেঘের যেমন ঠিকানা নেই, ঘরেরও তেমন সীমানা নেই। কবিতার ভাষায় অন্যত্র বলেন-
‘ছেঁড়া খোঁড়া মেঘে শুধু তছনছ
ভাঙাচোরা ঘরে শুধু নয় ছয়’

কবির কাছে আত্মহত্যার বিবেচনা, প্রথম বৃষ্টির আঘাত, লালকেল্লায় ভোর, বাল্যশিক্ষায় ভালোবাসা- সবই কবিতার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। কবি মনে করেন-
‘জেগে ওঠা প্রথম দিনের সেই আদিম মানব আর
চলে যাওয়া মানুষদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে
অন্তহীন বিষাদ আর দুঃখ মাড়িয়ে মাড়িয়ে,
-লালকেল্লার ভোরটি কিন্তু সেগুলির একটাও নয়।’

তাঁর কবিতায় স্বদেশ উঠে আসে আপন মহিমায়। মানব জীবনের বহমান ধারার আশা-নিরাশা ব্যঞ্জনা পায়। কবি নিজে নিজেই আঁকেন আত্মপ্রকৃতি। শৈশব-কৈশোর-যৌবনের আদ্যোপান্ত উঠে আসে ইতিহাস-ঐতিহ্য-সমৃদ্ধির সহাবস্থানে। তবুও হঠাৎ তাঁর মনে হয়:
‘এই বিংশ শতাব্দীর একজন নিঃস্ব
নিঃসঙ্গ মানুষ আমি
ভান করি স্বেচ্ছা নির্বাসিতের, অনিকেত বলতে উদ্বাহু হয়ে উঠি
অথচ জন্মেছি এই সব অখ্যাত গ্রামে গঞ্জেই
পূর্বপুরুষেরা ছিলেন কৃষিকর্মী;
অধুনা আত্মপ্রতারণায় নগরনিবাসী আমি
আর কতকাল এমন করে নিজেকেই নিজের চোখ ঠাওরাবো।’

তার চোখে নারীটিও নদী হয়ে যায়। নারায়ণগঞ্জের কিশোর ত্বকীকে নিয়েও লিখেছেন কবিতা। কবি বলেন-
‘হিমেল জ্যোৎস্নায় ভেজা রক্তখোর চিল
সূর্যোদয়ের আগে যে সদ্যপ্রস্ফুট গোলাপে বসালে
তোমার নোংরা হিংস্র নখের আঁচড়ে
তা আমার পবিত্র পতাকাকেই কলঙ্কিত করলো।’
এ কবিতায় ফুটে ওঠে তার খেদ। উচ্চকিত হয় বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। তার এ প্রতিবাদের ভাষা শক্ত। শব্দের ঝংকারে আলোড়ন তোলে। তীব্র-তীক্ষ্ম ফলার মতো আঘাত করে।

কবি বেলাল চৌধুরী বোহেমিয়ান জীবনে সম্পত্তির প্রতি চিরকালই থেকেছেন উদাসীন। তবুও জীবিকার তাগিদে কাজ করেছেন সচিত্র সন্ধানী, ভারত বিচিত্রা, দৈনিক রূপালীতে। তবে থিতু হননি কোথাও। সাহিত্যকর্মে রেখেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান। তাঁর কাব্যগ্রন্থ নিষাদ প্রদেশে, আত্মপ্রতিকৃতি, স্থির জীবন ও নিসর্গ, স্বপ্ন বন্দী, জল বিষুবের পূর্ণিমা, প্রতিনায়কের স্বগতোক্তি, যাবজ্জীবন সশ্রম উল্লাসে, বত্রিশ নম্বর, কবিতার কমল বনে, ভালোবাসার কবিতা, যে ধ্বনি চৈত্র শিমুলে, বেলাল চৌধুরীর কবিতা, প্রাণকোকিলা, সেলাই করা ছায়া, কমলবনে, বিদায়ী চুমুু, মুক্তিযুদ্ধের কবিতা পাঠকের ভালোবাসা অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

তিনি কবিতার পাশাপাশি গদ্যও রচনা করেছেন। এর মধ্যে মিশ্র চিত্রপট, নিরুদ্দেশ, হাওয়ায় হাওয়ায়, স্ফূলিঙ্গ থেকে দাবানল, ডুমুর পাতার আবরণ, রোজনামা : বল্লাল সেনের বকলমে, লাকসাম দাদা, গ্রেট হ্যারি এস, সুন্দরবন সোঁদরবন ও রবীন্দ্রনাথ। তিনি অনুবাদ করেছেন মৃত্যুর কাড়ানাড়া, অ্যান্ডোরা, জলের মধ্যে চাঁদ ও অন্যান্য জাপানি গল্প, তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি ১ম, ২য় ও ৩য় খণ্ড। লিখেছেন ভ্রমণকথা ও শিশুসাহিত্য। পত্রিকায় চাকরির পাশাপাশি সম্পাদনাও করেছেন বিভিন্ন স্মারকগ্রন্থ। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, নীহাররঞ্জন পুরস্কার, আবুজাফর ওবায়দুল্লাহ পুরস্কার প্রভৃতি।

১৯৩৮ সালের ১২ নভেম্বর জন্ম নেওয়া কবি জীবনের অনিবার্য নিয়মকে স্বাগত জানিয়ে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে ২৪ এপ্রিলা পাড়ি জমান পরপারে। কবি বেলাল চৌধুরীর প্রয়াণে রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা।

এসইউ/জেআইএম