রবীন্দ্রনাথ কেন দার্শনিক?

সিদ্ধার্থ শংকর জোয়ার্দ্দার
সিদ্ধার্থ শংকর জোয়ার্দ্দার সিদ্ধার্থ শংকর জোয়ার্দ্দার , লেখক
প্রকাশিত: ১২:১৮ পিএম, ০৮ মে ২০১৯

১৩১৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ বাবু অজিত কুমার চক্রবর্তী রবীন্দ্রনাথের ৫০তম জন্মতিথিতে শান্তিনিকেতনে একটা বক্তৃতা দেন। বক্তৃতার শুরুতে তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রবাবুর জীবনে এবং কাব্যে এতো বিচিত্র ভাবের সমাবেশ আছে যে তাহার নানান মহালায় প্রবেশদ্বারের চাবি সকল সময়ে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না।’ এ বক্তৃতার পর রবীন্দ্রনাথ বেঁচে ছিলেন আরও ত্রিশ বছর। বলাই বাহুল্য শেষের বাকি জীবনে তিনি আরও পরিণত, আরও বিশ্বাভিমুখী এবং সন্দেহাতীতভাবে আরও দুর্বোধ্য। কেন তিনি দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছেন সে কথা পরে বলি। রবীন্দ্রনাথের জীবন সামনের দিকে যত অতিবাহিত হয়েছে; ততই তিনি বিশ্বমানব হয়ে উঠেছেন, নিজেকে নিজেই ছাড়িয়ে গেছেন। পণ্ডিত রবি শংকর তাঁর রাগমালা-তে লিখেছেন, ‘যদি তিনি পশ্চিমা দেশে জন্মাতেন তাহলে শেক্সপিয়র কিম্বা গ্যাটের মতই পশ্চিম দেশে শ্রদ্ধা পেতেন’। আরেক বাঙালি অমর্ত্য সেন ‘টেগোর অ্যান্ড হিজ ইন্ডিয়া’য় লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের যে কেউ যদি তাঁর সুবৃহৎ ও ক্রম বিকাশমান ধারার পরিচয় পান তাহলে অবশ্যই মুগ্ধ হবেন’। তবে এটা ঠিক, রবীন্দ্রনাথের বিপুল সৃষ্টিসম্ভার ভারতীয় চিন্তা ও দর্শনকে যেভাবে প্রতিফলিত করেছে, তার নির্মোহ দার্শনিক বিশ্লেষণ বড্ড অপ্রতুল। এর কারণ দু’টো: একপক্ষ তাঁর স্তুতিতে ঢেকে ফেলেছেন কাব্যিক ও দার্শনিক বিচারবোধ; অন্যদিকে তাঁর সমালোচকরা ক্রোধান্বিত হয়ে ছোট করতে চেয়েছেন সব সৃষ্টিকর্মকে। এর প্রমাণ ইতিহাসের নানা অংশে।

যা-ই হোক, রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বিশেষ করে তাঁর দার্শনিক চিন্তামানসকে নিয়ে গদ্য রচনা করার আগে অজিত চক্রবর্তী মহাশয়ের উপলব্ধির আরও কিছু অংশ যোগ করা দরকার। তিনি লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের জীবনী সম্বন্ধে এই একটি কথা মনে রাখিতে হইবে যে, তিনি বরাবর নিজের স্বভাবের অন্তর্নিহিত পথ অনুসরণ করিয়া চলিয়াছেন, সেই তাঁহার স্বভাবের মধ্যেই তাঁহার কবিপ্রকৃতি, তপস্বী-প্রকৃতি, ত্যাগী প্রকৃতি, ভোগী প্রকৃতি পরস্পর ঠেলাঠেলি করিতে করিতে ক্রমশই পরস্পরের মধ্যে সামঞ্জস্য করিয়া লইতেছে। সেই প্রকৃতিটির মধ্যে অনুভূতি যতই তীব্র হউক, ভোগ প্রবৃত্তি যতই প্রবল হউক, তাহারি মধ্যে কোন বিশেষ একটি দিকে সমস্ত প্রকৃতিকে আবদ্ধ করিবার বিরুদ্ধে ভিতর হইতে বরাবর একটা ঠেলা ছিল। সেইজন্য নদীর বাঁকের মতো ক্রমাগত একটা হইতে অন্যটায়, এক রস হইতে অন্য রসে তাঁহার স্বভাব আপনার সার্থকতাকে খুঁজিয়া বেড়াইয়াছে এবং অবশেষে ধর্মের মধ্যে আপনার সমস্ত দ্বন্দ্ব ও বিরোধের সামঞ্জস্য লাভ করিয়াছে বলিয়া আপনারই ভিতর হইতে ভারতবর্ষের চিরন্তন সমন্বাদর্শকে সে আবিষ্কার করিয়াছে।’

অজিত চক্রবর্তী রবীন্দ্রমানসের স্বরূপ নির্ণয়ে যে কথাগুলো সেদিন শান্তিনিকেতনে বলেছিলেন তার যথার্থতা নিরূপিত হয়েছে আরও পরে। সম্ভবত জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর ভাবনার অনুষঙ্গকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ শেষে আরেক ভারতীয় দার্শনিক সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান লিখেছেন, ‘প্রাচীন ভারতীয় আত্মার মর্মবাণী প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর চিন্তায়, তাঁর ভাববাদ ভারতীয় প্রাচীন ইতিহাসেরই সন্তান। এবং তাঁর দর্শন উৎস ও প্রকরণে সমগ্রভাবে ভারতীয়।’ ড. কুমারস্বামী যেমনটি বলছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের কাজ অনিবার্যভাবে ভারতীয় অনুভূতি ও আকারের সাথে সুসামঞ্জস্য।’ কাজেই রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক অনুভূতি বিচার করতে প্রয়োজন হবে তাঁর চিন্তার গভীর অনুষঙ্গের বিস্তারিত ব্যাখ্যা। সম্ভবত তার পরেই আমরা তাঁর চিন্তার এক নির্মোহ আকার দিতে পারবো। এই নিবন্ধ সে প্রচেষ্টার অংশ।

রবীন্দ্রনাথ দার্শনিক কি-না সে প্রশ্ন অবতারণার যথেষ্ট কারণ রয়ে গেছে এবং কিছুটা বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে তিনি নিজেই এই প্রশ্ন উত্থাপনের জন্য দায়ী। দার্শনিকের কর্মভার এবং জগত নিয়ে তাদের উপলব্ধির সাথে রবীন্দ্রনাথের বিস্তর ফারাক আছে। দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়, দার্শনিকরা জগতকে যেভাবে ছিঁড়েছুটে খণ্ড খণ্ড করে বিভাজন করতে পছন্দ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠিক তার উল্টো। একটা অখণ্ড বিশ্ববোধ এবং সামগ্রিক দৃষ্টির প্রলম্বিত অবিভাজন থেকে তিনি জগতকে অনুভব করেছেন, উপলব্ধি করেছেন এবং প্রকাশ করেছেন অনির্বচনীয় রূপে। দার্শনিকরা যে বস্তু সত্যের পেছনে পুলিশি পাহারা লাগিয়েছেন, সেখানে রবীন্দ্রনাথ বসিয়েছেন কাব্যসত্যের এক নিরন্তর অভিযাত্রা। দার্শনিকের ওকালতি ও যুক্তির ম্যারপ্যাচ কিছুতেই কবির পছন্দ নয়। সত্যকে উপলব্ধির জন্য চেতনাকে যে কাব্য রসে সিক্ত করতে হয় সেটা বুঝেছিলেন তিনি, ব্যক্ত করেছেন অবলীলায়। তিনি বলছেন, ‘শেষ কথা হচ্ছে; Truth is beauty। কাব্যে এই ট্রুথ রূপের ট্রুথ, তথ্যের নয়। কাব্যের রূপ যদি ট্রুথ-রূপে অত্যন্ত প্রতীতিযোগ্য না হয় তাহলে তথ্যের আদালতে সে অনিন্দনীয় প্রমাণিত হলেও কাব্যের দরবারে সে নিন্দিত হবে (সাহিত্যের স্বরূপ)।’ বিশ্বকে উপলব্ধি করার ব্যাকুল বাসনা কবিকে তাড়িত করেছে নিরন্তর; যে জগত কবির কাছে ইন্দ্রিয়ের কর্ষণে আপন হয়ে ওঠে সেটা নিছক আবভাস মাত্র; সেটাতে তিনি খুশি নন। আপন অন্তরের আলোকে শতধা বিচ্ছুরিত বর্ণ রশ্মিচ্ছটায় জগত যেভাবে হাজির হয় নিজের কাছে সেটাই বিশ্বরূপ বলে কবি মনে করেন।

এই মূলগত পার্থক্যের কারণেই দার্শনিকরা রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে দূরে সরে গেছেন। তৈরি হয়েছে ব্যক্তিক-নৈর্ব্যক্তিক সীমার এক দুঃসহ বিভাজন। যা সাদা চোখে ধরা দেয় তা বাস্তব নয়, বাস্তবতা কোথায়? কবি রায় দিয়েছেন, ‘বাস্তবতা জ্ঞানে নয়, স্বীকৃতিতে’। হীরক সামান্য বস্তু মাত্র, নিছক একটা পদার্থ। কিন্তু এর থেকে যে দ্যুতি বেরোয় তা অপদার্থ। তার মহিমা হৃদয়কে বিগলিত করে, প্রাণের মাঝে তুফান তোলে, যার অরূপ চেহারা বুঝতে গেলে এক ধরনের বন্ধুত্ব তৈরির প্রয়োজন পড়ে। ঋগ্বেদ বলছে, ‘অভ্রাতৃব্যো অনাত্বমনাপিরিন্দ্র জনুষা সনাদসি। যুধেদাপিত্বমিচ্ছসে’। অর্থাৎ ‘হে ইন্দ্র, তোমার শত্রু নেই, তোমার নায়ক নেই, তোমার বন্ধু নেই, তবু প্রকাশ হবার কালে যোগের দ্বারা বন্ধুত্ব ইচ্ছা কর।’ কবি আরও লিখেছেন, যত বড়ো ক্ষমতাশালী হোন-না কেন, সত্যভাব প্রকাশ পেতে হলে বন্ধুত্ব চাই, আপনাকে ভালো লাগানো চাই। ভালো লাগানোর জন্য নিখিল বিশ্বে তাই তো এত অসংখ্য আয়োজন। তাহলে সাহিত্য বা কাব্যে যে সত্যের কথা কবি বলছেন, তা নিশ্চিতভাবে বিজ্ঞানের নয়। আর বিজ্ঞানের যেহেতু নয়, কাজেই দর্শনেরও নয়। তাঁর মতে, ‘সত্যকে যখন শুধু আমরা চোখে দেখি, বুদ্ধিতে পাই তখন নয়, কিন্তু যখন তাহাকে হৃদয় দিয়া পাই তখন তাহাকে সাহিত্যে প্রকাশ করতে পারি।’

অন্যদিকে রাসেল বলছেন, কথা সত্য হবে নাকি মিথ্যা হবে তা নির্ভর করছে ঘটনার সাথে তা কতটুকু সামঞ্জস্য তার ওপর। অর্থাৎ ঘটনার অনুরূপ না হলে কোন কথা সত্য নয়। এ যেন নিতান্ত কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ঠুকিয়ে ঠুকিয়ে সত্যকে বের করে ঘরে তোলার মতো ব্যাপার; যেমন করে আসামির কাছ থেকে জেরা করে আইনজ্ঞরা সত্য বের করেন। যুক্তি আর কথার নিদারুণ দরকষাকষিতে যে সত্য মেলে তা নিরাভরণ ও নিষ্ঠুর। জগতে সত্যের সঙ্গে আমাদের যোগ তিন প্রকারের: বুদ্ধির যোগ, প্রয়োজনের যোগ এবং আনন্দের যোগ। বুদ্ধির যোগ এক ধরনের প্রতিযোগিতা; ব্যাধের সঙ্গে যেমন থাকে শিকারের সম্পর্ক। আবার প্রয়োজনের যোগটাও নিতান্ত আটপৌরে। গরজের সঙ্গে সত্য মিশে সে আমাদের আরও বেশি কাছে আসে। কাজের ভেতর আমাদের শক্তির একটা সহযোগিতা জন্মায়। কিন্তু শেষমেষ আনন্দের মাঝ দিয়ে সত্য মূর্ত হয়ে ওঠে। ‘আনন্দ লোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর’। প্রসঙ্গত তিনি বলেন, বুদ্ধির যোগ আমাদের ইস্কুল, প্রয়োজনের যোগ আমাদের আপিস, আনন্দের যোগ আমাদের ঘর। আনন্দ যেখানে নেই সম্ভবত সে সত্য যত তথ্যেরই হোক তার মানে নেই জীবনে। নিখিল বিশ্বের ভেতর একটা অভিন্ন সুর বয়ে চলেছে বিশ্ব বীণার তারে। যে সুর আদি থেকে অন্ত অবধি প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে এক অকৃত্রিম সুরধ্বনিতে; সেই সুর উপলব্ধি করার জন্য দরকার সুর রসিক। আনন্দের ভেতর দিয়ে তার মর্ম বাণীকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারলেই তখন তা সত্য হয়ে ওঠে। তাই সত্য কোনভাবেই ঘটনা বা তথ্যের ওপর নয় বরং ভাবের ওপর নির্মিত। আর আনন্দের ভেতর দিয়ে সে ভাব জেগে ওঠে। ঈশ উপনিষদের বাণী কবিকে মুগ্ধ করে: ‘ইশাবাশ্য মিদং সর্বং যৎ কিঞ্চ জগত্যাং জগত’। বিশ্ব জগত ঈশ্বর পরিব্যাপ্ত। বিশ্ব প্রকৃতিকে অবলোকন করেছেন তিনি এক সর্বজাত মহাশক্তির অংশ হিসেবে। প্রকৃতির চিন্ময় রূপে মুগ্ধ কবি তাই সত্যকে বিচ্ছিন্ন ভাবে দেখতে অপছন্দ করেছেন।

রবীন্দ্রনাথের কাব্যিক বোধ কতটা দার্শনিক ভাবনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটার মূল্যায়ন করতে গিয়ে কয়েকটা জরুরি বিষয়কে কাছে আনা দরকার। রবীন্দ্রনাথ বস্তুজগতকে কোন সত্যের নিরিখে মাপতে চেয়েছেন? সত্যের মাপন যন্ত্রটা কী? এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ না রেখেই বলা প্রয়োজন, এ সত্যের মাপকাঠি ‘ভাব’ ‘তথ্য’ নয়। মানব মনে যে বিচিত্র ভাবের সম্মিলন ঘটে তার একটা ঐক্য আছে; সেই ঐক্যের সাথে বহির্বিশ্বের ঐক্যের যখন মিলন ঘটে তখন মানব হৃদয়ে আনন্দ স্পষ্ট হয়। সব কিছু আনন্দময় হয়ে ওঠে। কীট্স যেমনটি বলেন, ‘Thou silent form, dost tease us out of thought, As doth eternity’. অর্থাৎ ‘হে নীরব মূর্তি, তুমি আমাদের মনকে ব্যাকুল করে সকল চিন্তার বাইরে নিয়ে যাও, যেমন নিয়ে যায় অসীম।’ সত্য রবীন্দ্রনাথের কাছে নৈর্ব্যক্তিক নয়, ব্যক্তিক গণ্ডির ডেরায় এসে যখন সে ধরা দেয়, তখন সে সত্য মূর্ত হয়ে ওঠে। ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নয়’। সত্য কিছুতেই মানব মনের বাইরে নিরপেক্ষ হয়ে উঠতে পারেনি, কাজেই তা সাপেক্ষ এবং ব্যক্তির অন্তর্জাত। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের সত্য কিছুতেই কবির কাছে আপন হয়ে উঠতে পারেনি। আপন হয়নি দার্শনিকের সত্যও। আদতে রবীন্দ্রনাথের কবিত্বের মহারণে যুক্তির প্রাধান্য বড্ড ম্রিয়মান। তাঁর ‘কবি-মানস এই সমন্বয়-প্রবণতা অনেক সময় তাঁর দার্শনিক মতবাদের যুক্তিনিষ্ঠাকে অবহেলা করেছে। দার্শনিক রবীন্দ্রনাথের মতবাদ তাই অনেক ক্ষেত্রেই ন্যায়শাস্ত্রয়ানুগ হয়নি’। সুধীর নন্দী আরও বলেন, ‘দার্শনিক এবং কবি এরা দুজনেই রবীন্দ্রনাথের মনোলোকে অতি নিকট প্রতিবেশী। দুজনের মিলন কখনই পূর্ণ হয়নি। এঁরা পরস্পরকে প্রভাবিত করেছে আবার আত্মগত আত্যন্তিক বিরোধটুকুকেও মাঝে মাঝে প্রকাশ করে ফেলেছে। কবি যে কথা বলল হয়তো দার্শনিক তাঁর প্রতিবাদ করে বসল আবার দার্শনিক যে তত্ত্বকথা শোনাল ঠিক তাঁর উল্টো কথাটা হয়তো শুনিয়ে দিয়ে গেল রবীন্দ্রনাথের অন্তরশায়ী কবি-সত্ত্বা’।

তাহলে সেই প্রশ্নটাই এসে থমকে দাঁড়ালো, রবীন্দ্রনাথ কেন দার্শনিক? যদি দার্শনিক হবেন তাহলে কী ধরনের দার্শনিক? সুধীর কুমার নন্দী লিখছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ হলেন সমন্বয়ের কবি। কাব্য এবং দর্শন, কারো কারো মতে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে দ্বিস্রোততা না হয়ে একই ধারায় অব্যাহত বহমানতার নূপুর নিক্বণে উপলব্যথিত পথকে সঙ্গীতময় ক’রে তুলেছে’। দর্শন মানুষের বিস্ময় থেকে উদ্গীরিত; জগতকে জানার এক ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টার নাম দর্শন। দর্শনের নানাবিধ ধারার মাঝে বৈপরীত্য লক্ষ্যণীয়, কেউ ভাববাদী, কেউ বস্তুবাদী আবার কেউবা এ দুয়ের মাঝে একটা সমন্বয়ে সচেষ্ট। রবীন্দ্রনাথ এগুলোর মাঝে বিশেষ একটা ধারার অনুসারি। এবং সংশয়হীনভাবে তিনি ছিলেন একজন ভাববাদী। আরও বিশেষভাবে বলতে গেলে, তিনি ছিলেন উপনিষদিক একত্ববাদী দর্শনের মাঝে একজন নৈর্ব্যক্তিক সর্বেশ্বরবাদী। তাঁর জীবন দেবতা পরম সত্যের এক ব্যক্তিক প্রকাশ। উপনিষদ দ্বারা প্রভাবিত কবি ভারতীয় আধ্যাত্মবাদকে ধারণ করেছেন, প্রকাশ করেছেন তাঁর গানে, কবিতায়, প্রবন্ধে এমনকি ছোটগল্পে। রিলিজিয়ান অব ম্যান-এ তিনি মনুষ্য জীবনের এক অপরিবর্তনীয় বিশ্বভাবের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।

মানুষের দুটি ভাব আছে—জীবভাব ও বিশ্বভাব। জীব আছে তার আপন অস্তিত্বকে আঁকড়ে ধরে, জীবের ভাবের মাঝে মানুষকে চেনা যায় না। কারণ ওটা অন্যান্য পশু থেকে তাকে আলাদা করে না। তাহলে আলাদা কোথায়? ঋগ্বেদ বলছে, ‘পদোহস্য বিশ্বা ভূতানি ত্রিপাদস্যা মৃতং দিবি’। মানুষের কিছু অংশ আছে জীবভাবের মধ্যে বাকি অংশ আছে ঊর্ধ্বলোকে, অমৃতলোকে। এই অমৃতলোকের সন্ধান মেলে হৃদয়কে প্রসারিত করলে। সেখানে সে মৃত্যুহীন, ‘কোথা বিচ্ছেদ নাই’। জীবের নিয়ত পরিবর্তন হয়, জীব কোষের মৃত্যু হয়, নিরন্তর এই ভাঙাগড়ার খেলার মাঝ দিয়ে জীবের অগ্রগতি। ‘কিন্তু তাদের মধ্যে যে সত্তা সমস্ত দেহের আয়ুর অন্তর্গত, অর্থাৎ যে তাদের স্বদৈহিক নয়, বিশ্বদৈহিক, সেই সত্তা সমস্ত দেহের জীবন প্রবাহে থেকে যায়’। যে একক সত্তা, বিশ্বাভিমুখী পরম সত্য আদি থেকে অন্ত অবধি নিখিল বিশ্বের টানে এগিয়ে চলেছে সেটাকে হৃদয়ে ধারণ করাটাই মানুষের ধর্ম। মানুষ গভীরভাবে অনুভব করেছে যে সে ব্যক্তিগত মানুষ নয়, ব্যক্তিক সীমানার ছোট্ট দেয়ালের মাঝে সে বন্দী নয়, সে বিশ্বগত মানুষের মাঝে খোঁজে নিজের স্বার্থকতা। সেখানে ‘অবিভক্তঞ্চ ভূতেসু বিভক্তমিব চ স্থিতম’। প্লেটো ঠিক একই কথা বলেছেন, ব্যক্তিক মানুষ দিয়ে সত্তার মানুষকে চেনা যায় না। যে মানুষ সব মানুষের মাঝে লুকিয়ে থাকে সে তার ‘ধারণা’। সে ধারণা সামগ্রিক, সে ধারণা ভূমি থেকে ভূমার দিকে প্রসারিত। সব মানুষ বিলুপ্ত হলেও তার মৃত্যু নেই, সে চিরন্তন, অক্ষয় আর কালোতীর্ণ। বোধকরি প্লেটোর ভাববাদের সাথে কবির অখণ্ড বিশ্বাত্মার কোন ভেদ নেই। নেই কোন মূলগত তফাৎ।

রবীন্দ্রনাথের অধিবিদ্যা প্রত্যক্ষতত্ত্বের সাথে বিরাট ভাবে সাংঘর্ষিক, যদিও তিনি ছিলেন আত্মগত ভাববাদী। রাজা প্রবাহনের সামনে দুই ব্রাহ্মণ তর্ক করছেন, সামগানের মাঝে যে রহস্য আছে তার মূল জায়গা কোথায়? দালভ্য বললেন, এই দৃশ্যমানতার মধ্যে। স্থুল প্রত্যক্ষের মাঝে দালভ্য খুঁজেছিলেন এর রহস্য। প্রবাহন বললেন, তাহলে তো সত্য এসে ঠেকে গেল সীমার কিনারায়। সত্য যে অসীম সেটা বোধকরি দালভ্য ভুলে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ ভৌতিক বিশ্বসভার মাঝে সত্য খোঁজ করেননি; করেছেন জগতের পেছনে যে অনন্ত ও অমোঘ সত্য লুকিয়ে আছে সেখানে। তবে লক্ষ্যণীয় যে, অরূপ ও রূপের মাঝে যে চিরন্তন দ্বন্দ্ব আছে কবির কাছে সেটা ধরা দিয়েছে বড্ড বাস্তবরূপে। রবীন্দ্রনাথ অন্যান্য আধ্যাত্মবাদী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এই জন্য যে তিনি অরূপকে রূপের মাঝে দেখেছেন। তাই তো লিখছেন, ‘বারে বারে পেয়েছি যে তারে/ চেনায় চেনায় অচেনারে।।/ যারে দেখা গেল তারি মাঝে না-দেখারই কোন বাঁশি বাজে,/ যে আছে বুকের কাছে কাছে চলেছি তাহারি অভিসারে।।/ অপরূপ সে যে রূপে রূপে কী খেলা খেলিছে চুপে চুপে/কানে কানে কথা উঠে পুরে কোন সুদূরের সুরে সুরে/ চোখে চোখে চাওয়া নিয়ে চলে কোন অজানারই পথ পারে।’

তবে লক্ষ্যণীয় এই যে, রবীন্দ্রনাথ তত্ত্ববিদ্যক প্রত্যক্ষবাদী না হলেও জ্ঞানতাত্ত্বিক অভিজ্ঞতাবাদী হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করেছেন নিঃসঙ্কোচে। যে কারণে রবীন্দ্রনাথ একজন আত্মগত ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ভাববাদী তার মর্ম মূলে আছে কিছু একান্ত বোধ—নিজের চেতনার কাছে সব জ্ঞানের সমর্পণ। সব জ্ঞান সৃষ্টি হয় আপন চেতনার সাথে বস্তু সবার নিতান্ত মিথস্ক্রিয়ায়। রাবীন্দ্রিক ভাবনার ষোলকলা পূর্ণ হয়েছে এমনি কিছু কবিতায়। ‘আমি’ কবিতায় তিনি বলছেন, ‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,/ চুনি উঠল রাঙা হয়ে। আমি চোখ মেললুম আকাশে—/ জ্বলে উঠল আলো/ পুবে পশ্চিমে। গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম ‘সুন্দর’—/ সুন্দর হল সে’। ‘তুমি সুন্দর’, ‘আমি ভালোবাসি’ এসব বাক্য নিষ্কলঙ্ক, কারণ এগুলো দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে ব্যক্তির আপন প্রাণের অভিব্যক্তি। গোলাপ সুন্দর কী অসুন্দর সেটা মূল কথা নয়, বরং বলা দরকার গোলাপ সুন্দরও নয়, অসুন্দরও নয়। আমি গোলাপকে সুন্দর বলি, তাই সে সুন্দর। আইরিশ দার্শনিক বিশপ বাকলি প্রথম ঘোষণা করেছিলেন, ‘বস্তুর অস্তিত্ব নির্ভর করছে আমার দৃষ্টির ওপর’। আমরা যা প্রত্যক্ষ করি না তা কিছুতেই অস্তিত্বশীল হতে পারে না। বিষয়টা বেশ খানিকটা অস্বাভাবিকের মতো শোনালেও দর্শনের প্রধানতম একটা আলোচ্য বিষয় যে প্রত্যক্ষবাদ, সেটা এই বিশেষ কথাটার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে।

রবীন্দ্রনাথ প্রায় একরকম করেই বলতে চেয়েছেন, যে সত্য আমি রচনা করি সেটাই সত্য, যা ঘটে তা সব সময় সত্য নয়। ১৯৩০ সালের জুলাই মাসে আইনস্টাইনের সাথে রবীন্দ্রনাথের সত্য ও সৌন্দর্য নিয়ে যে বিতর্ক হয় তার মূল বিষয় ছিল বিষয় ও বিষয়ীর দ্বন্দ্ব। আইনস্টাইন বিজ্ঞানী হিসেবে যে সত্যকে গ্রহণ করেছেন তা নৈর্ব্যক্তিক এবং মনুষ্য নিরপেক্ষ। কবি বললেন ঠিক তার উল্টো। মানুষের ভেতর যে অসীম ব্যক্তি নিশানা আছে তা বিশ্বজগতকে অনুধাবন করে এবং সম্ভবত এই বিশ্ব জগতে এমন কিছুই নেই যা ব্যক্তিক সীমানার বাইরে। সুতরাং বিশ্ব সত্য মানেই মানব সত্য। বাইরের অসীম আলোকে যে বিশ্বালোক বিস্তৃত তার সুরের সাথে ব্যক্তির যখন অখণ্ড মিলন ঘটে তখন আমরা সত্য জানি আর সেই সত্যিই সৌন্দর্য। আইনস্টাইনের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মানুষ যদি পৃথিবীতে না থাকতো তাহলে ‘এপেলো অব বেল্ডেভার’র সৌন্দর্যও থাকতো না। কারণ মানুষই হল সব কিছুর কেন্দ্রে। রবীন্দ্রনাথ এই বিতর্কের ভেতর দিয়ে নিজেকে একজন জ্ঞানতাত্ত্বিক ভাববাদী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

অন্যদিকে তিনি রাসেলীয় বস্তু প্রত্যক্ষণবাদের মতই বলেছেন, বস্তু আসলে কিছুই নয় কিছু ইন্দ্রিয় উপাত্তের অখণ্ড সমাবেশ। আর এই ইন্দ্রিয় উপাত্তগুলো ব্যক্তি মন নিরপেক্ষ নয়। কাজেই যে বস্তু আমার কাছে হাজির হয় তা আমার মনের সাজানো বাগান। তাঁর নিজের কথায়, ‘বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে টেবিল একটা সুনির্দিষ্ট বস্তু হিসেবে অবভাসিক, কাজেই মানুষের মন সেটাকে টেবিল হিসেবে প্রত্যক্ষ করে এবং মন না থাকলে টেবিলকে প্রত্যক্ষ করার কেউ থাকবে না। একই সাথে এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, চূড়ান্তভাবে বস্তুর অস্তিত্ব বলে কিছু নেই। যা আছে তা হল অগণিত বৈদুত্যিক কণার নিরন্তর অভিঘাত এবং সেটা মনের মাঝেও আছে। সত্যের কথা বলতে গেলে বুঝতে হবে বিশ্বাত্মার সাথে ব্যক্তিক আত্মার চলছে নিরন্তর সংঘাত এবং সেই বিশ্বাত্মা ব্যক্তিক আত্মার মাঝেই অবরুদ্ধ। এ দু’য়ের সম্মিলন ঘটেছে বিজ্ঞানে, দর্শনে আর আমাদের নীতিবিজ্ঞানে। কাজেই যদি তেমন কোন সত্য চিন্তা করা যায় যা সম্পূর্ণভাবে মানুষ বিবর্জিত তেমন সত্যের কোন জায়গায় নেই।’ (Science has proved that the table as a solid object is an appearance and therefore that which the human mind perceives as a table would not exist if that mind were naught. At the same time it must be admitted that the fact, that the ultimate physical reality is nothing but a multitude of separate revolving centres of electric force, also belongs to the human mind. In the apprehension of Truth there is an eternal conflict between the universal human mind and the same mind confined in the individual. The perpetual process of reconciliation is being carried on in our science, philosophy, in our ethics. In any case, if there be any Truth absolutely unrelated to humanity then for us it is absolutely non-existing.)

আগেই বলেছি, রবীন্দ্রনাথ পরিণত হতে হতে হয়তো বা বেশ খানিকটা দুর্বোধ্য হয়ে গেছেন সাধারণের কাছে। তাঁকে পুরোপুরি বোঝার জন্য যে একাগ্রতা দরকার সেটা অতি সাধারণের ছিল না। কারণ এতো বিপুল সৃষ্টি সম্ভার তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে যে তার একটা সরল ও ঋজু রেখা খুঁজে পাওয়া বড্ড দুস্কর। যেমন জন্ম, মৃত্যু, ঈশ্বর, জীবন এসব নিয়ে তাঁর ভাবনার অনুষঙ্গ যেভাবে এগিয়েছে তা এককথায় বিচিত্র। কোন সময় মৃত্যুকে ভয় পেয়েছেন, কোন সময় জয় করেছেন, কোন সময় আলিঙ্গন করেছেন বন্ধু রূপে আবার কোন সময় দূর থেকে তার ভ্রুকুটি অবলোকন করেছেন মাত্র দর্শক হিসেবে। তবে প্রথম দিকের চিন্তার সাথে তাঁর শেষের চিন্তার একটা নিশ্চিত ফারাক লক্ষ্য করা যায়। জীবন শেষে তাঁর চিন্তার দুর্বোধ্যতার খবর অনেকেই বিশ্লেষণ করেছেন। আবু সাইদ আইয়ুব ‘আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে কবির ‘শেষ লেখা’র নানা কবিতা নিয়ে ভীষণভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, সেখানে সংশয় কবিকে কীভাবে আচ্ছাদন করেছে তার অনুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। প্রথম দিনের সূর্য যে প্রশ্ন করেছিল সত্তার নতুন আবির্ভাবে, কে তুমি? তার উত্তর মেলেনি। আবার দিন শেষে সেই একই প্রশ্ন উঠে আসলো, কে তুমি? তার উত্তরও মেলেনি। কোন প্রশ্নের উত্তর মেলেনি?

অনুমান করা যায়, এ প্রশ্নটা হয় জ্ঞানতাত্ত্বিক না হয় তত্ত্ববিদ্যক। জ্ঞানের শুরু কোথায়? কবে শুরু হয়েছে মনুষ্য অভিযাত্রা? কেউ বলতে পারবে না। আবার অন্যদিকে জগতের শুরু নিয়ে মানুষের আমৃত্যু ভাবনারও কোন পরিসমাপ্তি হয়নি, হয়তো হবে না। জানা না জানার এই চির দ্বিরথ মীমাংসাহীন; রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত এই অমীমাংসিত চির দ্বন্দ্বের মাঝে সংশয়ী হয়ে উঠেছিলেন। ‘জীবন পবিত্র জানি অভাব্য স্বরূপ তার’—জীবন সম্পর্কে কবির ভাবনা হয়তো একটু হোচট খেয়েছিল শেষ পাদে। জীবনের স্বরূপ যে অভাব্য এটা জীবন সয়ানে তিনি বুঝেছিলেন। জীবনের স্বরূপ, বিবর্তন, অগ্রগতি এবং এর পরিণতি নিয়ে কবির সরল অনুভূতি ভয়ানকভাবে কবিকে চিন্তিত করে তুলেছিল। কিন্তু প্রথম ভাগে তিনি উপনিষদিক ভাবনার সঙ্গী ছিলেন, ছিলেন অকৌতূহলি এক নিশ্চিত ভক্ত-পরিব্রাজক। সৃষ্টির পথ আকীর্ণ করে এক ছলনাময়ী যে খেলা খেলে চলেছেন, সেটা কবিকে শেষ মুহূর্তে হয়তো পীড়া দিয়েছে। বার বার জানতে চেয়েছেন, এ পথের শেষ কোথায়।

দর্শনের সৌন্দর্য হল সংশয়। সংশয় ছাড়া জ্ঞান সম্ভব হয়েছে এমন নজির পৃথিবীতে নেই। সেই প্রাচীন ভারত থেকে এই বিতর্ক ও সংশয়ের শুরু। জগত সৃষ্টি, এর বিবর্তন, এর কাঠামো, আমাদের জীবন, বেড়ে ওঠা পরিণতি, এবং আবশ্যিকভাবে জগতের সাথে জীবনের নিবিড় একাত্মতা, সুনীতি, মূল্য ও শ্রেয়বোধ নিয়ে অন্যান্য দার্শনিকের মতো রবীন্দ্রনাথও ভেবেছেন নিরন্তর। হয়তো সে ভাবনা কারো সাথে মিলেছে কারো সাথে নয়। ভাবনার মিল প্রত্যাশা করা হয়তো সম্ভব কিন্তু দর্শনে এর বিপরীত চিত্র খুবই সাধারণ। রবীন্দ্রনাথ তাই অন্যদের মতই এমন এক দার্শনিক যার ছিল চিন্তার নানামুখী পরিক্রমা। কখনো এই জগত সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন, কখনো হয়েছেন সংশয়ী আবার কখনো এ দুয়ের অপূর্ব মেলবন্ধনে তৈরি করেছেন নিজেকে এক অসাধারণ জ্ঞানযোগী।

লেখক: অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যলয়, ঢাকা।

এসইউ/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :