স্বপ্নভঙ্গ

মিজানুর রহমান মিথুন
মিজানুর রহমান মিথুন মিজানুর রহমান মিথুন , লেখক ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৫:৫০ পিএম, ২৭ মে ২০১৯

হজরত আলী শান্তশিষ্ট ভদ্র প্রকৃতির। অফিসে সবাই তাকে ‘হজরত’ বলে ডাকে। তবে তিনি সবাইকে ‘আলী’ নামে ডাকতে বলেছেন। অ্যাকাউন্সের আতিক সাহেব তাকে ‘হজরত’ নামে এই অফিসে চাকরির শুরু থেকে ডাকছেন বলে সবাই তাকে এ নামেই এখন ডাকে।

হজরত একজন ভীষণ স্বপ্নবাজ যুবক। জীবনে তাকে বড় একটা কিছু করতেই হবে—এমন চিন্তায় সব সময় নিমগ্ন থাকেন তিনি। হয়তো অর্থ বিত্ত বৈভবে অনেক বড়; নয়তো এমন কোনো কাজ করতে হবে যাতে দেশের মানুষ তাকে একনামে চিনতে পারে। কিন্তু কীভাবে হবে তার এ স্বপ্ন পূরণ, তার কোনো পথ এখন আর খুঁজে পাচ্ছেন না হযরত আলী।

ভালো চাকরি করে জীবন বদলাতে চেয়েছিলেন হজরত আলী। অনেক চেষ্টা করেছেন সরকারি-বেসরকারি ভালো চাকরির জন্য। তবে বড় কোনো চাকরি জোটাতে পারেননি। চাকরির পরীক্ষা দিতে দিতে হজরত আলী বুঝেছেন—বড় চাকরি আসলেই সোনার হরিণ, তা সহজে ধরা দেয় না।

অবশেষে অনেক চেষ্টা তদবীর করে একটি বেসরকারি চাকরি জুটিয়েছেন হজরত আলী।

যে চাকরি করে জীবন বদলাতে চেয়েছিলেন, এখন সেই চাকরিই যেন তার সব সম্ভাবনার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। হজরত আলীর ভাষায়, তিনি এখন জীবনের মাইনকা চিপায় আটকে পড়েছেন। এই চাকরিতে তিনি মোটেই সন্তুষ্ট নন।

হজরত আলীর স্বপ্ন ছিলো—তিনি অনেক বড় চাকরি করে গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য একটি হাসপাতাল নির্মাণ করবেন। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের জন্য একটি উন্নত পাঠাগার গড়ে তুলবেন, গ্রামে যাতে আলোকিত মানুষ তৈরি হয়—এরকম আরও কত কত স্বপ্ন হজরত আলীর দুচোখজুড়ে। কিন্তু যে বেতনে হযরত আলী চাকরি করছেন, তাতে তার ঢাকার শহরে নিজের খাই-খরচেই চলে যায়। ফলে দিন দিন তার দুচোখের স্বপ্ন ম্লান হতে থাকে। তবুও হজরত আলী স্বপ্ন দেখতে চান।

হজরত আলী ‘দৈনিক সুসময়’ নামের একটি জাতীয় দৈনিকের প্রেস ম্যানেজারের পদে চাকরি করছেন। ঢাকার মতিঝিলে তার পত্রিকার অফিস। হজরত আলী অনেক গুণধর মানুষ। তার গানের গলা অনেক সুন্দর, সেই সঙ্গে নিজে গানও লেখেন, অভিনয় করতে পারেন, আবৃত্তিতেও পারদর্শী। প্রায়ই কাজের ফাঁকে রুম বন্ধ করে দরাজ কণ্ঠে গান শুরু করেন। প্রেসের কাজের চাপে তার সকাল সন্ধ্যা রাত অবধি ব্যস্ত থাকতে হয়। মাঝে মধ্যে প্রেসের শ্রমিকদের ভালোভাবে কাজ বুঝিয়ে দিতে নিজের হাতে ধুলো ময়লা কালি মাখতে হয়ে। অনেক সময় গা গতরেও ময়লা কালি লেগে যায়। হজরত আলী প্রায়ই তার অফিস রুমে বসে ভাবেন আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন—এই জীবন তো আমি চাইনি।

চাওয়া না পাওয়া আর প্রত্যাশা অপূরণের এই যাপিত জীবনের হতাশা গ্লানি সব কিছু ভেতরে ভেতরে মেনে নিয়েছেন হজরত আলী। তিনি একজন আত্মপ্রত্যয়ী ও স্বপ্নবাজ মানুষ হলেও এখন তার মনে প্রায়ই হতাশা ও বিষণ্ন তা ভর করে। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এবং দেশের জন্য কিছু করার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে না পারার দুশ্চিন্তায় এখন প্রায়ই তার ঘুম হয় না। সেই সঙ্গে সম্প্রতি তার প্রেমিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদের বিরহ-বেদনাও হজরত আলীকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। তার প্রেমিকা বিয়ের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু হজরত আলীর বড় চাকরি না হওয়ায় প্রেমিকা অন্যের ঘর বেঁধেছে। হজরত আলী এমন নানা বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে দিনে দিনে বুঝতে পারছেন, পৃথিবীতে অর্থ-বিত্তই হচ্ছে মানুষের কাছে একমাত্র কাম্য বস্তু। প্রেম ভালোবাসা মিছে কল্পনা। টাকা না থাকলে প্রেম ভালো হৃদয়টাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। দুচোখের সুখনিদ্রা নিষ্ঠুরভাবে কেড়ে নেয়।

গত রাতে হজরত আলী স্বপ্ন দেখেছেন, তিনি ‘দৈনিক সুসময়’ পত্রিকার প্রেস ম্যানেজারের দায়িত্ব ছেড়ে এই পত্রিকার বিনোদন বিভাগে সাংবাদিকতা শুরু করেছেন। এমন স্বপ্ন দেখে হজরত আলীর ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর আবার ঘুমানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কিছুতেই আর চোখে ঘুম আসেনি। হজরত আলী বুঝতে পেরেছেন শত চেষ্টা করেও আর ঘুম আসবে না। মোবাইল টিপে দেখেন রাত সাড়ে চারটা বাজে।

রাত আর বেশি নেই ভেবে বিছানা ছেড়ে উঠে যান হজরত আলী। ঘুম থেকে উঠে হজরত আলী ফ্রেশ হয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। শেষ রাতে আকাশ দ্যাখে, বাহ! কী সুন্দর আকাশ! আর কোনোদিন যেন হজরত আলী এত মনোলোভা নয়নসুখকর বিস্তীর্ণ আকাশ দেখেননি। এদিকে মিষ্টি বাতাসও বইছে, গ্রীষ্মের শেষ রাতে যে এমন হালকা শীতল হাওয়া বইতে পারে তা ভেবে হজরত আলীর মন চনমনিয়ে ওঠে। এমন মনোমুগ্ধকর পরিবেশে হজরত আলীর গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছে করছে। গান শুরু করলেও মুহূর্তেই থেমে যান তিনি। কারণ এখনও আশপাশের ফ্লাটের সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, এখন গান গাইলে মানুষ পাগল বলবে।

ব্যালকনি থেকে রুমে এসে হজরত আলী লাইট জ্বালিয়ে কাগজ কলম নিয়ে গান লেখার জন্য বসে যান। গতকাল একটা গান মাথায় আসছিলো, সেই গানটা লেখার চেষ্টা করছেন। লিখছেন আর কাটছেন, কিছুতেই সেই গানটা লিখতে পারছেন না। তাই গান লেখা বাদ দিয়ে আবার বিছানায় শুয়ে পড়লেন হজরত আলী। শুয়ে শুয়ে হজরত আলী ভাবছেন, ‘আমার মনের ভেতর এতদিন পুষে রাখা ইচ্ছেটাই আজ স্বপ্নে দেখলাম। যাক ভালো হয়েছে। এমন ভাবতে ভাবতে হজরত আলীর মনের আকাশে আনন্দ বর্ষণ হচ্ছে, মন সমুদ্রে খুশির ঢেউ লেগেছে। হজরত আলীর মনটা ভীষণ ফুরফুরে লাগছে।

হজরত আলী সিদ্ধান্ত নেয়, আজই অফিসে গিয়ে বিনোদন বিভাগের সহ-সম্পাদক অপূর্ব ভাইয়ের কাছে গিয়ে বলবেন। তিনি নিশ্চয়ই বিনোদন বিভাগে কাজ করার একটা ব্যবস্থা করে দেবেন। অপূর্ব ‘বিনোদন দুনিয়া’ পত্রিকা থেকে গত মাসে ‘দৈনিক সুসময়’ পত্রিকায় যোগদান করেছেন। অপূর্ব দেশের অন্যতম খ্যাতিমান বিনোদন সাংবাদিক। দেশের বড় বড় তারকার সঙ্গে তার ভীষণ ঘনিষ্ঠতা ও সখ্য রয়েছে। ফেসবুকে কয়দিন পরপরই নায়ক-নায়িকা, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে তোলা ছবি আপলোড করেন। এই ছবি দেখে হজরত আলীর মনে বিনোদন সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্ন আরও প্রবলভাবে দানা বাঁধে।

প্রতিদিন দশটার সময় হজরত আলী অফিসে আসেন। রাতে স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় আজ সকাল হতেই তার মন অস্থির। বাসায় মন টিকছে না। সকাল ৮টায় অফিসে এসেছেন আজ। অফিসের কাজেও মন দিতে পারছেন না। রাতের স্বপ্ন তাকে তাড়া করে ফিরছে। বিনোদন সাংবাদিক হতে পারলে দেশের সেরা সেরা নায়ক-নায়িকার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি হবে। নিজে যেমন খ্যাতিমান সাংবাদিক হতে পারবেন, তেমনি এসব নায়ক-নায়িকা, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দিয়ে নাটক সিনেমা বানিয়ে রাতারাতি খ্যাতি ও অর্থ দুটোই কামানো যাবে বলে মনে করছেন। সেই সঙ্গে নিজেও দুয়েকটা সিনেমা নাটকে অভিনয় করে জনপ্রিয় হতে পারবেন বলে হজরত আলীর ধারণা। কারণ দেশের এরকম কয়েকজন সাংবাদিকদের নামও জানেন তিনি, যারা একই সঙ্গে সাংবাদিকতা, নাটক-সিনেমা নির্মাণ, অভিনয় করে তারকা খ্যাতি, গান লিখে ও গেয়ে শিল্পী হিসেবেও ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছেন।

এছাড়াও হজরত আলীর আরও ধারণা, তিনি যে প্রেস ম্যানেজারের চাকরিটা করছেন এটা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কিন্তু সে তুলনায় কম বেতনের কাজ। অন্যদিক বিনোদন সাংবাদিকতা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ ও আনন্দময় কাজের একটি। দেশের সব সুন্দরী সুন্দরী নায়িকাদের সঙ্গে যে কোনো সময় কথা বলে নির্মল আনন্দ লাভ করা যায়। নায়ক-নায়িকারা তাদের বিভিন্ন কাজের সংবাদ প্রকাশের জন্য বিনোদন সাংবাদিকদের নানা ধরনের উপহার-উপঢৌকন দেয়।

বিনোদন সাংবাদিকতা নিয়ে হজরত আলীর এমন ধারণা ভুল প্রমাণিত করলেন বিনোদন সাংবাদিক অপূর্ব। আজ সকাল সকাল অফিসে এসে কাজে মন না বসায় বিনোদন বিভাগে চলে যান হজরত আলী। এসে দ্যাখেন অপূর্ব কম্পিউটারে হেড ফোন লাগিয়ে হালকা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে কী যেন লিখছেন। এই অফিসে আসার অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই হজরত আলীর সঙ্গে অপূর্বর ভালো হৃদ্যতা জমে গেছে। তাছাড়া ‘দৈনিক সুসময়’ পত্রিকার অন্য সাংবাদিকের চেয়ে আগে যে রাহিম নামের বিনোদন সাংবাদিক ছিলেন তার সঙ্গেও হজরত আলীর হৃদ্যতা বেশি ছিলো। বিনোদন সাংবাদিকদের প্রতি হজরত আলীর বরাবরই দুর্বলতা বেশি। অপূর্বর ডেস্কের কাছে এসে সালাম দেয় হজরত আলী। অপূর্ব লেখার কাজে ব্যস্ত থাকায় হজরত আলীর সালাম শুনতে পাননি। হজরত আলী বুঝতে পারেন অপূর্ব জরুরি কিছু লিখছেন। তাই তার সালাম শুনতে পাননি। হজরত আলী কিছুক্ষণ অপূর্বর ডেস্কের কাছে দাঁড়িয়ে রইলো। অপূর্বর কাজ শেষ হচ্ছে না। কিন্তু স্বপ্নের বিষয়টা অপূর্বর সঙ্গে আলাপ করার জন্য হজরত আলীর মন উসখুস করছে। তাই হজরত আলী অপূর্বর ডেস্কের একদম কাছে গিয়ে অপূর্বর পিঠে হাত রেখে বললেন—
অপূর্ব ভাই, এত গভীর মনোযোগে কী লিখছেন? এত কাজ করে কী হবে ভাই? চলেন নিচে গিয়ে চা-বিড়ি খাই।
এবার অপূর্ব হজরত আলীর দিকে তাকিয়ে বলেন—
ওহ! হজরত ভাই এসেছেন! বসেন ভাই, বসেন, আর ৫টা মিনিট অপেক্ষা করেন, আমি নিউজটা শেষ করে নিই। গুরুত্বপূর্ণ একটা নিউজে হাত দিয়েছে। তাড়াতাড়ি ছাড়তে হবে।
এই বলে পাশের চেয়ারটা টান দিয়ে বলেন—
বসেন ভাই, ৫টা মিনিট লাগবে।
অফিসের নিচেই ফারুকের চায়ের টং দোকান। দোকানে এসে চা খেতে খেতে দুজন বিনোদন দুনিয়ার নানা বিষয় নিয়ে কথা বলা শুরু করেন। হজরত আলী কথার মধ্যে সুযোগ খুঁজতে থাকেন কোন ফাঁকে তার স্বপ্নের কথাটা বলবেন। একপর্যায়ে হজরত আলী সুযোগও পেয়ে যান।
হজরত আলীর স্বপ্নের কথা অপূর্ব মনোযোগ সহকারে শুনলেন। শুনে বললেন—
ভাই আপনি যে সেকশনে আছেন, ভালোই আছেন। বিনোদন সেকশনে আইসেন না। বড় পেইনের মধ্যে আছি। নায়ক-নায়িকারা সহজে কথা কইতে চায় না। সময় দিতে চায় না। অনেককে হাজারবার ফোন দিলেও রিসিভ করে না। কোনো তারকা তো মাসের পর মাস ফোন বন্ধ কইরা রাখেন। অথচ আমাদের সম্পাদক সাহেব তাদের নিউজ না পাইলে অন্য নিউজ দিলে নিউজ ফেলে দেয়। প্রতিদিন পাতা করতে যে ঝক্কি-ঝামেলা ও কষ্ট পোহাতে হয়। সেই কষ্ট করলে এক সপ্তাহে মঙ্গলগ্রহে যাওয়া যায়।
এ কথা শোনার পর হজরত আলী দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। তিনি মনে মনে বলেন, ‘নুতন কিছু করতে চাইলে সবাই এমনই বলে’। কিছুক্ষণ চুপ থেকে হজরত আলী বলেন—
ভাই যা-ই বলেন না কেন, আমাকে জাস্ট একবার চান্স দেন। আমাকে মাত্র একবার সুযোগ দেন। প্রেসের কাজ আমার আর ভালো লাগে না। এ থেকে আমি মুক্তি চাই।
ভাই বিনোদন সাংবাদিকতা শুরু করার, শেখার একটা বয়স আছে ভাই। অলরেডি আপনি সেই বয়স অতিক্রম করে এসেছেন।
ভাই শেখার কোনো বয়স নেই। আমি না হয় নতুন করে আর একটা জীবন শুরু করবো।
হজরত আলীর বিনোদন সাংবাদিকতার প্রতি দুর্বার আগ্রহ দেখে অপূর্ব তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তাকে যে কোনো একটা পত্রিকায় কন্ট্রিবিউটর হিসেবে প্রাথমিকভাবে কাজ করার সুযোগ করে দেবে।
আচ্ছা হজরত ভাই, আপনি তো জানেনই আমাদের সম্পাদক সাহেব খুব কড়া স্বভাবের মানুষ। আপনি যদি আমাদের অফিসের বিনোদন বিভাগে এসে কাজ শুরু করেন, তাহলে সম্পাদক সাহেব আমাদের দুজনার উপরেই ক্ষ্যাপবো। তাছাড়া আমাদের বিনোদন চিফ সুজন ভাই বিষয়টা ভালোভাবে দেখবেন না, আইমিন সে-ও নিষেধ করবেন।
হুম, অপূর্ব ভাই ঠিক বলেছেন। সম্পাদকে আমিও ভীষণ ভয় পাই। তাকে আমি একদম এড়িয়ে চলি। ব্যাটায় একটা আস্তো খাচ্চোর। খুব প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া আমি তার সামনে পড়ি না। সে সব কিছুতেই খুত ধরে। তাহলে কী করন যায়? বলেন তো?
আপনি এক কাজ করেন, ‘দৈনিক শতকাল’ পত্রিকায় আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু শিহাব আছেন। উনি বিনোদন বিভাগের হেড। আমি বলে দিলে সে আপনাকে কাজের সুযোগ করে দেবেন।
অনেক খুশি হইলাম অপূর্ব ভাই। প্লিজ অপূর্ব ভাই, আমার জন্য একটু চেষ্টা করবেন। আমাকে শুধু একবার চান্স দেন ভাই। একটা সুযোগ দেন ভাই।

দুদিন পরে হজরত আলী ‘দৈনিক শতকাল’ পত্রিকায় এসে কাজ শুরু করেন। এখানে এসে শিহাবের কথা-বার্তা, আচার আচরণে ভীষণ মুগ্ধ হয়ে যান। এখানে বিনোদন বিভাগে মালিহা নামের এক তরুণী কাজ করছেন। তার সঙ্গেও হজরত আলীর স্বল্প সময়ের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। এখানে কাজ করতে এসে আশান্বিত হন। তার অফিসের প্রেস ম্যানেজারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ‘দৈনিক শতকাল’ পত্রিকায় বিনোদন পাতায় কাজ করবেন বলে হযরত আলী পাকাপাকি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।

শিহাব প্রথম দিনে হালকা কিছু কাজ দিলেন হজরত আলীকে। তিনি যে কাজগুলো হজরত আলীকে দিয়েছিলেন তা যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে পারেননি। কয়েকটি প্রেস রিলিজ দিয়েছিলো তা নিউজ আকারে সাজানোর জন্য। কিন্তু সে কাজ হজরত আলীর পছন্দ হয়নি। তার ইচ্ছা নায়ক-নায়িকাদের সঙ্গে কথা বলবে, তাদের নিউজ করবে। শিহাব হজরত আলীর এই ইচ্ছেটাকে বুঝতে পারলেন। কারণ নতুন কেউ কাজ করতে আসলে শোবিজ তারকাদের প্রতি সবার একটা আকর্ষণ থাকে। এবার শিহাব হজরত আলীকে একটা টেলিফোন গাইড দিয়ে বর্তমান সময়ের বেশ কয়েকজন তারকার ফোন নাম্বার দেখিয়ে দিয়ে বললেন—
হজরত ভাই এই নাম্বারগুলোতে ফোন দিয়ে কথা বলেন। তাদের খোঁজ-খবর নিয়ে দ্যাখেন। কোনো নিউজ করতে পারেন কি-না।

নায়ক-নায়িকাদের ফোন নাম্বারের টেলিফোন গাইড পেয়ে তো হজরত আলী খুশিতে আত্মহারা। তিনি মনে মনে বলেন, ‘আহারে! এবার আমার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ হবে।’ টেলিফোন গাইডের পাতা উল্টায় আর আর আনন্দে চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। এরই সঙ্গে হজরত আলীর আগের ধারণা আরও কিছুটা পাল্টে যায়। নায়ক-নায়িকা, অভিনেতা-অভিনেত্রীরা আসলে সহজে কাজের খোঁজ-খবর দেন না। তাদের কাছ থেকে ফোন দিয়ে কিংবা শুটিং স্পটে গিয়ে বিনোদনের খবর সংগ্রহ করতে হয়। ফোন দিয়ে নামি তারকারা নিউজ দেয় না।

শিহাবের দেয়া নির্দেশনা মত হজরত আলী নায়িকা রুহিনাকে ফোন দেন। হজরত আলীর মনে ভীষণ উত্তেজনা কাজ করছে। কারণ জীবনে এই প্রথম কোনো নায়িকার সঙ্গে কথা বলতে যাচ্ছেন। ফোন বেজে যাচ্ছে, রুহিনা ফোন ধরছেন না। আবার ফোন দেয় হজরত আলী। কিন্তু এবারও ফোন ধরলেন না নায়িকা রুহিনা। এতে হজরত আলীর মনের উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হলো। রুহিনা ফোন না ধরায় তিনি কিছুটা বিরক্তও বোধ করছেন। শিহাবের কাছে গিয়ে হজরত আলী কিছুটা অভিযোগের সুরে বললেন—
ভাই রুহিনা তো ফোন ধরে না। বেশ কয়েকবার ফোন দিলাম। একবার ফোন কেটে দিয়েছে। তারপর আবার ফোন দিলাম। তখন দেখি ফোন বন্ধ করে রেখেছেন।
হজরত আলীর এই কথা শুনে শিহাব বললেন—
ভাই তারকারা সব সময় শুটিং নিয়ে মহাব্যস্ত থাকে। উনি মনে হয় শুটিংয়ে আছেন, নয় তো অন্য কোনো জরুরি কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। আপনি একটা এসএমএস দিয়ে রাখেন। ফ্রি হলে রুহিনাই আপনাকে ফোন দেবেন। এখন বরং আপনি অন্য কাউকে ফোন দেন।

এবার হজরত আলী দ্রুত একটা এসএমএস লিখে রুহিনাকে সেন্ড করলো। আবার নতুন উত্তেজনায় শিহাবের দেখানো ফোন নাম্বার দেখে নায়িকা আলিনা ফারাহকে ফোন দিলেন। ফারাহ সঙ্গে সঙ্গে ফোন রিসিভ করে বললেন—
আমি এখন মেকাপ নিচ্ছি। একটা বিজ্ঞাপনের শুটিং নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত আছি ভাই। রাত দশটার পর ফোন দিয়েন।

নায়িকা আলিনা ফারাহ রাতে ফোন দিতে বলেছেন, এই কথা শোনার পরে হজরত আলী আবারও বেশ আনন্দিত ও উত্তেজিত বোধ করছেন। তার মনের মধ্যে সুখের সুবাতাস বইছে। এদিকে কিছুক্ষণ পরেই নায়িকা রুহিনা ফোন ব্যাক করেছেন। তার ফোন দেখে হজরত আলী যেন আরও শতগুণ উত্তেজনায় ফেটে পড়েছেন। হজরত আলী প্রায় চিৎকার করেই শিহাবের কাছে গিয়ে বললেন—
ভাই রুহিনা আপা ফোন ব্যাক করেছেন।
হজরত আলীর এমন উত্তেজনাপূর্ণ কথা শুনে শিহাব বললেন—
ভাই আস্তে কথা বলেন। অফিসে অন্যান্য বিভাগের সবাই কাজ করতেছেন। জোরে কথা বললে তাদের লিখতে সমস্যা হয়। আপনি আবার রুহিনার ফোন রিসিভ কইরেন না। ওর কল শেষ হওয়ার পরে আপনি ফোন ব্যাক করেন।
রুহিনার কল কেটে যাওয়ার পর হজরত আলী ফোন ব্যাক করলেন। এবারও ধরলেন না। হজরত আলী কিছুটা হতাশ হয়ে পড়লেন এতে। আবার শিহাবকে বললেন—
ভাই রুহিনা তো আবার ফোন ধরে না।
আরে ভাই হতাশ হইয়েন না।
হজরত আলী এমন করায় তাকে নিয়ে শিহাব কিছুটা বিড়ম্বনায় পড়েছেন। কিন্তু কিছু বলতেও পারছেন না, কারণ তার বন্ধু অপূর্ব হজরত আলীকে পাঠিয়েছে।
হজরত আলী আবার ফোন দেয়। এবার রুহিনা ফোন রিসিভ করেছেন—
আপা, আমি ‘দৈনিক শতকাল’ পত্রিকা থেকে হজরত আলী বলছিলাম। আপনাকে নিয়ে নিউজ করবো। এখন পর্যন্ত আপনি কী কী কাজ করেছেন। প্লিজ একটু বলুন।
রুহিনা ফোনের অপর প্রান্ত থেকে বললো—
আপনি কাকে ফোন দিয়েছেন? আপনি মনে হয় আমাকে চেনেন না। আপনি যেভাবে আমাকে প্রশ্ন করেছেন তাতে মনে হচ্ছে আমি বুঝি ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন এসেছি। আমার সুপার ডুপার হিট কাজ সম্পর্কে আবার নতুন করে বলার কী আছে? আমার সম্পর্কে জেনে-শুনে পড়াশোনা করে ফোন দিয়েন, ওকে! নতুন কিছু কথা বলা উচিত।
এই বলে নায়িকা রুহিনা ফোন কেটে দিলেন। এতে হজরত আলীর রুহিনাকে অত্যন্ত নির্দয় মনে হলো। তিনি বিমর্ষ চিত্তে টেবিলে ফোন রাখলেন। বিষয়টা কাজের ফাঁকে শিহাব লক্ষ্য করেছেন। তিনি হজরত আলীর সঙ্গে রুহিনার ফোনে কথা বলার স্টাইল দেখে বুঝতে পেরেছেন, রুহিনা হজরত আলীকে ঝারি দিয়েছেন। এসি রুমের মধ্যে বসেও হজরত আলী দরদর করে ঘামছেন। নায়িকা রুহিনার কথায় সে ভীষণ অপমানিত বোধ করছেন। এবার ফোনটা পকেটে নিয়ে হজরত আলী ‘দৈনিক শতকাল’ পত্রিকা থেকে বেরিয়ে যান। ফোন বন্ধ করে তার নিজের ‘দৈনিক সুসময়’ অফিসে এসে প্রেসের কাজে মন দেন।

এদিকে অনেক সময় পেরিয়ে যায়। হজরত আলীর খোঁজ না পেয়ে শিহাব তাকে ফোন দেয়। কিন্তু তার ফোন বন্ধ পান। এরপর শিহাব অপূর্বকে ফোন দেয়। অপূর্ব কিছুক্ষণ পর শিহাবকে জানায়—
আমিও তো হজরতের ফোন বন্ধ পাচ্ছি। আচ্ছা আমি অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখছি। সে অফিসে আসছে কি-না। অফিস সহকারী রতনকে হজরত আলীর রুমে পাঠালেন অপূর্ব। রতন এসে জানালো—
হযরত আলী ভাই কাজে ব্যস্ত, আপনার সঙ্গে পরে দেখা করবেন বলেছেন।

আজ রাতে হজরত আলী নায়িকা ফারাহকে ফোন দেয়। ফারাহ রাত ১০টার পরে ফোন দিতে বলেছিলেন। ফোন দেয়ার পর ফারাহ জানালেন—
আমি এই মুহূর্তে একটু ব্যস্ত আছি ভাই। ৫ মিনিট পরে আমি আপনাকে ফোন ব্যাক করবো। হজরত আলী আশায় বুক বাঁধলো। নায়িকা ফারাহ তার সঙ্গে কথা বলবেন, এটা ভাবতে তার মনের ভেতর একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। তার রুমমেটদের জানালেন, নায়িকা ফারাহ তাকে ৫ মিনিট পরে ফোন ব্যাক করবেন। সব রুমমেট হজরত আলীকে ঘিরে বসে আছেন। সবার চোখে-মুখে কৌতূহল। এক রুমমেট বলছেন—
হজরত আলী ভাই, নায়িকা ফারাহর সঙ্গে কথা বলার সময় আপনি লাউড স্পিকারে দেবেন। আমরা সবাই তার কণ্ঠ ফোনে শুনবো।
এই কথা শুনে রুমমেট বাকের বলে—
আহা কী মজা, কী আনন্দ, হজরত আলী ভাই নায়িকার লগে কথা কইবো!

নায়িকা ফারাহর দেয়া ৫ মিনিট পেরিয়ে ১০ মিনিটে পড়েছে। কিন্তু সে ফোন করছেন না। এবার হজরত আলী নিজেই ফোন দেয়। ফারাহ তার ফোন রিসিভ করলে হজরত আলী বলেন—
আপা বাসায় ফিরেছেন কখন?
এই তো কিছুক্ষণ আগে।
রাতে ভাত খেয়েছেন? ঘুমাবেন কখন?
হজরত আলীর এই কথা শুনে নায়িকা ফারাহ তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। ফারাহ বললেন—
এই রাতে আপনি আমার সাথে ফাজলামি শুরু করেছেন মিয়া? আমি খেয়েছি কী না, ঘুমিয়েছি কী না, তা দিয়ে আপনি কী করবেন। দুইদিন পরপর নতুন সাংবাদিক আসে কোত্থেকে। কথা বলা শিখে তারপর আইসেন। এই বলে নায়িকা ফারাহ, নায়িকা রুহিনার মত একই স্টাইলে ফোন কেটে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে যেন হজরত আলীর হৃদয়টা ভেঙে খান খান হয়ে যায়।

হজরত আলী রুমমেটদের মাঝে ফারাহর এমন কথায় চরম অপমানিত বোধ করছেন। তিনি ভীষণ লজ্জা পেলেন। রুমমেট সবুজ ও রাহাত তো হাসিতে ফেটে পড়লেন। অন্যরা কেউ কেউ হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে হজরত আলীর মরে যেতে ইচ্ছে করছে। এমন চরম অপমান ও লজ্জায় হজরত আলী সিদ্ধান্ত নেয়, সে আর বিনোদন সাংবাদিকতা করবে না। এর মধ্য দিয়ে হজরত আলীর জীবনের আরও একটি স্বপ্নের যবনিকাপাত ঘটলো।

এসইউ/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :