একাত্তরের এক রাত

ইমদাদুল হক মিলন
ইমদাদুল হক মিলন ইমদাদুল হক মিলন
প্রকাশিত: ০৪:১৩ পিএম, ১৭ জুন ২০১৯

তারিখটা আমার মনে আছে মায়া। পরিষ্কার মনে আছে। জানুয়ারির ৩০ তারিখ। সেদিন একটা বড় ঘটনা ঘটেছিল। দুজন কাশ্মীরী যুবক একটা ভারতীয় ফকার বিমান হাইজ্যাক করেছিল। একজনের নাম হাসেম কোরেশী আরেকজনের নাম আশরাফ। ওরা ছিল জম্মু ও কাশ্মীর মুক্তফ্রন্টের সদস্য। ভারতীয় বিমানটির নাম ছিল গঙ্গা। শ্রীনগর থেকে দিল্লিতে যাচ্ছিল। ওই দুই যুবক পাইলটকে বাধ্য করলো গঙ্গার গতিপথ পরিবর্তন করতে। দিলি­তে যেতে দেওয়া হলো না বিমানটিকে। লাহোর বিমান বন্দরে নিয়ে যাওয়া হলো, সেখানে ল্যান্ড করতে বাধ্য করা হলো।

জুলফিকার আলী ভুট্টো রাওয়ালপিন্ডি যাচ্ছিলেন। ঘটনা শুনে লাহোরে যাত্রা বিরতি করলেন, হাইজ্যাকার যুবক দুজনকে জাতীয় বীর বলে আখ্যায়িত করলেন। তারপর রাওয়ালপিন্ডি গেলেন।

ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে ভুট্টো আবার লাহোর এয়ারপোর্টে হাইজ্যাকার দুজনের সঙ্গে মিলিত হলেন। হাইজ্যাকাররা গঙ্গার সব যাত্রী, বিমানকর্মী, পাইলট সবাইকে নামিয়ে দেয় কিন্তু বিমানটি তাদের দখলে রাখে। তাদের দাবি ছিল ভারতে বন্দী কাশ্মীরীদের মুক্তি। ভারত সরকার তাতে রাজি না হওয়ায় ওই রাতেই হাইজ্যাকাররা আনুষ্ঠানিকভাবে, টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে বিস্ফোরক দিয়ে বিমানটি উড়িয়ে দিল।

বিমানটির নিরাপত্তার জন্য পাকিস্তান সরকারের উদাসীনতা এবং বিমানটি যখন ধ্বংস করা হচ্ছে তখন নিরাপত্তারক্ষীদের নীরব দর্শকের ভূমিকা দেখে সারা পৃথিবী বিস্মিত হয়েছিল। কিন্তু ভুট্টোসহ পাকিস্তানের বেশ কয়েকজন নেতা বিমান ধ্বংস করে দেওয়ার ঘটনা সমর্থন করলেন।

তুমি সেদিন, যে সন্ধ্যায় আমাকে আমার সন্তান আগমনের কথা বললে, সারাদিন ভারতীয় বিমানের হাইজ্যাক হওয়া নিয়ে যে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলাম, মুহূর্তে ভুলে গেলাম সেকথা। তোমাকে পাঁজাকোলে নিয়ে ঘুরপাক খেতে লাগলাম লিচুতলায়।

জানুয়ারির শুরু থেকেই ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছিলাম আমরা। আমাদের উদ্বেগ বাড়ছিল, উৎকণ্ঠা বাড়ছিল। পাকিস্তানিরা কি বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা ছাড়বে? বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে দেবে? ছয় দফার ভিত্তিতে কি পরিচালিত করতে দেবে দেশ?

বুকে চাপ ধরেছিল এইসব প্রশ্ন। সেই সন্ধ্যায় সব ভুলে গেলাম।

১২ নভেম্বরের সাইক্লোনে দশলক্ষ মানুষ হারিয়ে যে দিশেহারা ভাব হয়েছিল সাতকোটি বাঙালির, ৭ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় ছিনিয়ে সেই বেদনা অনেকখানি কমিয়ে দিয়েছিল। তারপর থেকে পাকিস্তানিদের নানারকম ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেয়ে মনের ভিতর জমতে শুরু করেছিল উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা।
কী হবে?
কী হবে?
সেই সন্ধ্যায় সব ভুলে গেলাম।
পরের ঘটনা শোনো। ভারতীয় বিমান হাইজ্যাক এবং ধ্বংসের ঘটনায় ভারতও চুপ করে বসে থাকলো না। ভারতের আকাশসীমায় পাকিস্তানি বিমান চলাচল নিষিদ্ধ করলো। ফলে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে, ঢাকায় আসতে হতো শ্রীলংকার কলম্বো হয়ে।

গঙ্গা নামের ফকার বিমানটি ছিনতাই এবং সেটা ধ্বংস করার ঘটনাটি যে অসৎ এবং ষড়যন্ত্রমূলক, বঙ্গবন্ধু পরিষ্কার তা বুঝতে পারলেন। শান্তিপূর্ণ উপায়ে জনগণের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের অন্তরায় সৃষ্টির জন্য যে এই ঘটনা ঘটিয়েছে পাকিস্তানিরা, এ যে ইচ্ছাকৃত ভাবে সাজানো নাটক, সবই তিনি বুঝলেন। ঘটনাটিকে অবাঞ্চিত ঘটনা বলে উলে­খ করলেন।
অন্যদিকে ভুট্টো এই ঘটনার প্রতি সমর্থন জানালেন। হাইজ্যাকারদের সব ধরনের সাহায্য সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলেন।
দেখো মায়া, সেই ঘটনার কথাই বলতে ভুলে গেছি।
মাথা ঠিক নেই।
এলোমেলো, সব এলোমেলো।
ওই যে জুন মাসের ১৩ তারিখের ঘটনা। সৈয়দপুরের ঘটনা। ভয়াবহ এক গণহত্যার ঘটনা। গোলাহাটি রেল কারখানার শেষ প্রান্তে ট্রেনের ভিতর ঘটেছিল এই হত্যাকাণ্ড। দ্বারকাপ্রসাদ সিংহানীয়া নামের এক মাড়োয়ারি ব্যবসায়ি সেই হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। তাঁর মাধ্যমে খবর এসে পৌঁছায় আমাদের কাছে।

milon

মার্চ মাসের ২৭ তারিখ। ভোর সাড়ে চারটা পাঁচটা। মেজর ফতে খান, ক্যাপ্টেন গুল হাওয়ালদার সঙ্গে বেশ কিছু পাকসেনা, সৈয়দপুর শহরের বিহারী রুস্তম গুণ্ডার সঙ্গে কিছু চেনা লোকজন দ্বারকাপ্রসাদের বাড়ির সদর দরজা ভেঙে ভিতরে ঢোকে। ঢুকেই বাড়ির লোকজনকে বেদম মারধোর শুরু করে। মারতে মারতে দ্বারকাপ্রসাদ আর তাঁর ভাই সত্যনারায়ণের কাছে সিন্দুকের চাবি চায়। তাঁদের ক্যাশিয়ার, ভোলাবাবু ছিলেন বাড়িতে। সিন্দুকের চাবি থাকে তাঁর কাছে। সত্যনারায়ণ তাঁর কাছ থেকে চাবি নিয়ে ক্যাপ্টেন গুলের হাতে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ে সিন্দুকের ওপর। সিন্দুকে ক্যাশ ষাট সত্তর হাজার টাকা ছিল, বাড়ির বউঝিদের গহনা ছিল প্রচুর। সব লুট করলো পাকিস্তানি আর ওদের সহযোগী বিহারী বাঙালি...গুলো।

এখানেই ঘটনা শেষ না। যাওয়ার সময় ওরা দ্বারকাপ্রসাদের বাবা হরিয়াল সিংহানীয়াকে ধরে নিয়ে গেল। সৈয়দপুরের হিন্দু মাড়োয়ারি, নিরীহ বহু বাঙালিকে ধরে নেওয়া হয় ওইভাবে। তাদের দিয়ে তাতগাঁও ব্রিজ আর এয়ারপোর্টের কাজ করাতে থাকে। একদিকে অমানুষিক কাজ অন্যদিকে ভয়াবহ নির্যাতন চলে সমানে।
দুমাসের ওপর চলে এই নির্যাতন।
তারপর জুন মাসের ৬ তারিখে ওসি জামাল, সুবেদার আসলাম, বেশ কিছু পাকিস্তানি সেপাই, তাদের সঙ্গে আছে স্থানীয় গুণ্ডারা, দ্বারকাপ্রসাদকে আর তিনভাইকে ধরে নিয়ে যায়। সঙ্গে বহু বাঙালি।
একটা বাসে তুলে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁদের। লাগানো হয় অমানুষিক কাজে।
এই কাজের ফাঁকে মেজর জাভেদ ইউনুস, ক্যাপ্টেন বখতিয়ার লাল, তাদের সঙ্গে আছে দুটো বাঙালি... বাচ্চা, একটির নাম কাইয়ুম সেক্রেটারি, আরেকটি সিভিল অ্যাডমিনিসট্রেটর রফিক আহম্মদ, সেই...গুলো দ্বারকাপ্রসাদকে সাদা কাগজে সই দিতে বলে আর ধর্মান্তরিত হওয়ার জন্য প্রচণ্ড মারধোর করতে থাকে।
মায়া, তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো?
আমার হাতের স্পর্শ কি তুমি অনুভব করছো?
এই যে চাঁদ ধীর পায়ে এক আকাশ থেকে এসেছে আরেক আকাশে, উঠানে তিনটি তাজা কবর, তোমার শ্বশুর শাশুড়ি ননদ শুয়ে আছে মাটির তলায়, পাশাপাশি, খানিকপর তুমি শোবে আরেক কবরে, তারপর শোবে আমার পুত্র, গাছপালা স্থির হয়ে আছে, হাওয়া বইছে কি বইছে না টের পাচ্ছি না, বর্ষার জলে ঘাই দেয় না মাছ, আকাশে ওড়ে না কোনও রাতপাখি, ডাকেও না, ডাকে শুধু ঝিঁঝিপোকা, তুমি যদি বেঁচে থাকতে এরকম পরিবেশে কেমন লাগতো তোমার?
মাঝে মাঝেই বাড়ির অন্য মানুষগুলোর কথা মনে হচ্ছে, মায়া।
কদম।
বারেকের মা।
পারুল।
এই তিনজন মানুষ কোথায় গেল?
গরুগুলো যে রাজাকাররা নিয়ে গেছে তাতে আমার কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু কালু কুকুরটা, বল্টু বিড়ালটা? কবুতরগুলো? হাঁস মুরগি!
শোনো মায়া, তারপর কী হলো!
বাংলাদেশের বহু জায়গার মতো সৈয়দপুরে এলো ভয়ঙ্কর একরাত।
রাত আড়াইটার দিকে দ্বারকাপ্রসাদদেরকে একটা বাসে তোলা হলো। নিয়ে আসা হলো সৈয়দপুর রেলস্টেশানে।
কী কারণ?
স্টেশানে একটা ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। ওই...বাচ্চারা বলল, এই ট্রেন তোমাদেরকে ইন্ডিয়ায় পৌঁছে দেবে। ভারতে চলে যাবে তোমরা। মাড়োয়ারি হিন্দুরা ভিতরে ভিতরে খুশি। যাক, বর্ডার ক্রশ করতে পারলেই তো বেঁচে যাবে!

দ্বারকাপ্রসাদ এসময় দেখেন তাঁর বউদি সীতাদেবী আর মেয়ে কাঞ্চনকুমারীকেও নিয়ে আসা হয়েছে। মাড়োয়ারি পট্টির বিষ্ণুকুমারসহ আরও অনেক মাড়োয়ারি, তাদের ছেলেমেয়ে স্ত্রী সবাইকে ট্রেনে চড়ানো হলো। বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হলো দরজায়।
ট্রেনের বগিতে ঢোকার পর দ্বারকাপ্রসাদ দেখেন সেখানে রাইফেল হাতে পাকিস্তানিরা দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি কামরাতেই এই অবস্থা।
যারা ভাবছিল সত্যি সত্যি তাদের ইন্ডিয়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে, তারা ততোক্ষণে চিন্তিত হয়ে গেছে। তারপরও ট্রেন যখন চলতে শুরু করলো, আশায় বুক বাঁধলো সবাই।
তখন ভোর পাঁচটা বা সাড়ে পাঁচটা। ট্রেন রওনা দিল চিলাহাটির দিকে।
কিন্তু...
কিন্তু গোলাহাটি রেল কারখানার শেষ মাথায় এসে ট্রেন থেমে গেল। শুরু হলো মানুষের চিৎকার, আর্তনাদ। দ্বারকাপ্রসাদ বাইরে তাকিয়ে কারখানার ম্লান আলোয় দেখেন, প্রচুর অবাঙালি পুলিশ, প্রচুর অবাঙালি গুণ্ডাসহ আরও অনেক চেনামুখ হাতে রামদা বল্লম তলোয়ার নিয়ে লাফিয়ে ট্রেনে উঠছে। তার আগেই দরজার তালাগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে।

দ্বারকাপ্রসাদ তাঁর চোখের সামনে দেখতে পেলেন রেলের এক কামরা থেকে হুমকি চাঁদাওয়ালা, বালিচাঁদ আগরওয়ালা, যুগলকিশোর আগরওয়ালা, তাঁর বউদি সীতাদেবীর সঙ্গে আরও কয়েকজনকে টেনে নিচে নামিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করলো... বাচ্চারা।
কী আশ্চর্য, মায়া!
কী আশ্চর্য।
দেখো, হুমকি চাঁদাওয়ালা, বালিচাঁদ আগরওয়ালা, যুগলকিশোর আগরওয়ালা, দ্বারকাপ্রসাদের বউদি সীতাদেবী, প্রত্যেকের নাম আমি মনে করতে পারছি।
একটা নামও ভুলিনি।
একটাও না।
আশ্চর্য ব্যাপার! এই পরিস্থিতিতে সৈয়দপুরের সেদিনকার সেই ঘটনায় যাঁরা মারা গেলেন তাঁদের অনেকের নাম আমি মনে রেখেছি। ওই এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের মুখ থেকে শোনা নাম একটাও ভুলিনি।
এই পরিস্থিতিতে কী করে তা সম্ভব?
সত্যি, মানুষের মনোজগৎ বিচিত্র! কত কী মনে থাকে তাদের! আবার কত কী ভুলে যায়।
৪০০জন মানুষকে তোলা হয়েছিল ওই ট্রেনে। তার মধ্যে ৩৩৮জনকেই হত্যা করা হলো।
দ্বারকাপ্রসাদ বেঁচে গেলেন অদ্ভুত ভাবে। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও প্রচণ্ড জোরে ট্রেনের জানালায় লাথি মারলেন। জানালা ভেঙে গেল। সেই ভাঙা জানালা দিয়ে লাফিয়ে নিচে পড়লেন ভদ্রলোক। তারপর দৌড়, দৌড়। কোনদিকে যাচ্ছেন জানেন না। জ্ঞান আছে কি নেই, জানেন না।
ছুটছেন।
ছুটছেন।
দ্বারকাপ্রসাদের মতো করে পালাচ্ছিলেন আরও কেউ কেউ। পিছন থেকে পুলিশ মিলিটারিরা গুলি চালাচ্ছে। কেউ কেউ লুটিয়ে পড়ছেন। দ্বারকাপ্রসাদ ছুটছেন...
ততোক্ষণে সকাল হয়ে গেছে। দ্বারকাপ্রসাদরা কয়েকজন ছুটতে ছুটতে এলেন হাবিবুল্লা মাস্টারের বাড়িতে। পরে সেখান থেকে তাঁরা ইন্ডিয়ায় চলে যান।
ভাবো তো!
এই হত্যাকাণ্ডের কথা ভাবো তো, মায়া!
আবারও বলছি, কী আশ্চর্য! আমাদের বাড়িতে আজ যে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তারপর থেকে আমার জীবনের ওপর দিয়ে যা বয়ে যাচ্ছে, এই অবস্থায় আমি বলছি অন্য হত্যাকাণ্ডের কথা!
আশ্চর্য না!
মানুষ কি এই রকমই হয়?

এইচআর/এমএস

‘সত্যি, মানুষের মনোজগৎ বিচিত্র! কত কী মনে থাকে তাদের! আবার কত কী ভুলে যায়। ৪০০জন মানুষকে তোলা হয়েছিল ওই ট্রেনে। তার মধ্যে ৩৩৮জনকেই হত্যা করা হলো। দ্বারকাপ্রসাদ বেঁচে গেলেন অদ্ভুত ভাবে। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও প্রচণ্ড জোরে ট্রেনের জানালায় লাথি মারলেন। জানালা ভেঙে গেল। সেই ভাঙা জানালা দিয়ে লাফিয়ে নিচে পড়লেন ভদ্রলোক। তারপর দৌড়, দৌড়। কোনদিকে যাচ্ছেন জানেন না। জ্ঞান আছে কি নেই, জানেন না।’

আপনার মতামত লিখুন :