টেম্পু পাশা : নাইট শিফট- পর্ব ০৮

ড. রাজুব ভৌমিক
ড. রাজুব ভৌমিক ড. রাজুব ভৌমিক , কবি ও লেখক
প্রকাশিত: ০৬:১১ পিএম, ৩১ জুলাই ২০১৯

‘ঠিক আছে। সোমাদের বাড়ি থেকে ফিরে আমি তোমার সঙ্গে গিয়ে নিউইয়র্কে একটি জিইডি প্রোগ্রামে ভর্তি হব।’ পাশা বলল। কিন্তু পাশা আবার ভাবছে, নিউইয়র্কের পুলিশ যদি তাকে এরিকার নিখোঁজ অথবা হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত করতে সক্ষম হয়, তাহলে পাশাকে তিন্নীসহ অন্যত্র চলে যেতে হবে। কয়েক ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর পাশা ও তিন্নী ভার্জিনিয়ায় সোমাদের বাড়ি গিয়ে পৌঁছায়।

পাশা ও তিন্নী সোমাদের বাড়ির দরজায় নক করে। তিন্নী ও পাশাকে দেখে সোমার আনন্দের অন্ত নেই। ‘কিরে তিন্নী, তোদের কতদিন দেখি না। হঠাৎ কী মনে করে? আমাদের তো তোরা একদম ভুলে গেলি।’ সোমা তার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল। ‘না রে, পাশার ব্যস্ততার জন্য আসলে কোথাও যাবার সময় পাই না। পাশা আমাকে গতকাল বলল যে, এ সপ্তাহে সে একটু ফ্রি আছে। তাই তোদের এখানে বেড়াতে আসা।’ তিন্নী বলল।

সোমা তিন্নী ও পাশাকে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে বলল। ‘যা তোরা দুজন বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আয়। একসাথে আমরা খাব।’ সোমা বলল।

দুপুর তিনটা বাজে। পাশা ও তিন্নী বাথরুম থেকে হাত-মুখ ধুয়ে ডাইনিং রুমে আসে। পাশা সোমার স্বামী শাহেদকে দেখতে পাচ্ছে না। ‘কী সোমা, তোমার হাজবেন্ড কই? তাকে দেখছি না যে।’ পাশা বলল। ‘এখনো ডিউটি শেষ করে ফেরেনি। আজ পাঁচটার মধ্যে ডিউটি শেষ করে চলে আসবে। শাহেদ আপনাদের তার জন্য অপেক্ষা করতে বারণ করেছে। আসুন তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন। অনেক দূর থেকে ড্রাইভিং করে এসেছেন।’ সোমা বলল। পাশা যদিও সোমাদের বাড়িতে এসেছে কিন্তু তার মন নিউইয়র্কে পড়ে আছে। পাশা খাবার টেবিলে বসে সোমাদের টিভি অন করে বিকেল চারটায় নিউইয়র্কের এবিসি নিউজ দেখছে। এবিসি নিউজ নিউইয়র্কের প্রায় সব খবর প্রচার করে। তাই পাশার এবিসি নিউজ চ্যানেলটি অতি প্রিয়। পাশা সবসময় এমনিতে এবিসি নিউজ চ্যানেলটি দেখে নিউইয়র্কের সব খবরাখবর রাখার জন্য। আজ সে এবিসি নিউজ চ্যানেলটি দেখছে তার মনের ভেতর এক গভীর শঙ্কা দূর করার জন্য। যে শঙ্কাটি বাস্তবে পরিণত হলে পাশার জীবনের সব অঙ্ক উল্টে যাবে।

পাশা খাবার শেষ করে সোফায় বসে টিভি দেখছে। টিভি দেখতে দেখতে প্রায় বিকেল হয়ে যায়। কিন্তু পাশা টিভিতে এরিকার কোন খবর পেল না। মনে মনে পাশা অনেক খুশি হয়। কিছুক্ষণ পর সোমার স্বামী শাহেদ বাড়িতে আসে। শাহেদ একজন বড় ডাক্তার। সে ভার্জেনিয়া হাসপাতালে জরুরি বিভাগে সার্জন হিসেবে কর্মরত। প্রায় দশ বছর ধরে শাহেদ এ হাসপাতালে চিকিৎসা করছে। শাহেদ পাশা ও তিন্নীকে দেখে অনেক খুশি হয়। ‘তোমাদের দেখা পাওয়া কত ভাগ্যের ব্যাপার।’ শাহেদ কৌতুক করে বলল। ‘চলো আজ রাতে আমরা সবাই একটি ভালো রেস্তোরাঁতে গিয়ে খেয়ে আসি। আমার কালকে ডিউটি নেই। আমি মোটামুটি ফ্রি আছি।’ শাহেদ বলল। ‘এ তো খুশির খবর। সোমা প্রায় বলে আপনি হাসপাতালে রোগী নিয়ে সবসময় অনেক ব্যস্ত থাকেন। আপনাকে ফ্রি পাব আশা করিনি। অনেক মজা হবে এবার তাহলে।’ তিন্নী বলল। সন্ধ্যার পরে সবাই মিলে আর্লিংটনের এক রেস্তোরাঁয় সবাই খেতে যায়। সবাই মিলে সেখানে অনেক মজা করে।

পরদিন সকালে সবাই নাস্তা খাওয়া শেষ হলে শাহেদ সবাইকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়। প্রথমে তারা হোয়াইট হাউস দেখতে যায়। সবাই মিলে হোয়াইট হাউসের সামনে অনেক ছবি তোলে। দুপুরে একটি আমেরিকান রেস্তোরাঁয় সবাই মজা করে খায়। খাওয়া শেষ হলে শাহেদ বলে, ‘চলুন আপনাদের নিয়ে আমার হাসপাতাল দেখিয়ে আনি। আমি কোথায় কাজ করি দেখতে পারবেন।’ শাহেদের কথায় সবাই রাজী হয়ে যায়। অন্যমনস্ক হয়ে পাশা বারবার তার ফোনে নিউইয়র্কের ডেইলি নিউজ, নিউইয়র্ক পোস্টসহ বিভিন্ন পত্রিকা পড়ছে। এখন পর্যন্ত এরিকাকে নিয়ে কোন খবর ছাপা হয়নি। শাহেদ তিন্নী, পাশা এবং সোমাকে নিয়ে তার হাসপাতালের অফিসে আসে। তার অনেক বড় অফিস দেখে পাশা অবাক। এদিকে সোমা তিন্নীকে নিয়ে হাসপাতালের আশেপাশে দেখাচ্ছে আর ছবি তুলছে। আর পাশা শাহেদের অফিসে বসে কফি খাচ্ছে। হঠাৎ আরেকজন ডাক্তার শাহেদের অফিসে এসে বলে, ‘ডক্টর শাহেদ, আই নো ইটস ইউর ডে অফ বাট কেন ইউ হেল্প মি উইথ এ পেসেন্ট প্লিজ। পেসেন্ট নিডস ইমারজেন্সি সার্জারি ডান সুন।’ শাহেদ কোন উপায় না বুঝতে পেরে পাশাকে বলল, ‘পাশা ভাই, এ হাসপাতালে একটি জটিল সার্জারি হচ্ছে এখন। আমাকে একটু হেল্প করতে হবে। কিছু মনে করবেন না। সার্জারি শেষ করেই চলে আসব।’

‘ঠিক আছে শাহেদ ভাই। কোন সমস্যা নেই। আপনার কাজ করে আসেন।’ পাশা বলল। শাহেদ সার্জারিতে ওই ডাক্তারকে সাহায্য করার জন্য অফিস থেকে চলে যায়। পাশা শাহেদের অফিসে বসে কফি পান করছে আর মুঠোফোনে নানা খবর পড়ছে। কিছুক্ষণ পর পাশার চোখ শাহেদের অফিসের চারিদিকে যায়। পাশা দেখে শাহেদের অফিসে নানা ধরনের ওষুধ এলোমেলো অবস্থায় পড়ে আছে। পাশা তার চেয়ার থেকে উঠে ওষুধগুলো কৌতূহলে দেখতে থাকে। সার্জারির বিভিন্ন ওষুধের মাঝে পাশা অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ দেখতে পায়। পাশা এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ তার পকেটে নিয়ে নেয়। ‘হয়তো কোন একদিন এ ঘুমের ওষুধগুলো কাজে লাগতে পারে।’ পাশা ভাবল। কিছুক্ষণ পর তিন্নী ও সোমা শাহেদের অফিসে ঢোকে। পাশা তাদের বলে যে, শাহেদ এখন একটি সার্জারিতে সাহায্য করছে। সে কিছুক্ষণ পরে চলে আসবে। সবাই এখন অফিসে বসে শাহেদের জন্য অপেক্ষা করছে। ঘণ্টাখানেক পরে শাহেদ তার অফিসে আসে। এরপর সবাইকে নিয়ে বাড়িতে চলে যায়।

এভাবে প্রায় আটদিন চলে যায়। পাশা টেলিভিশনে নিয়মিত খবর দেখছে। প্রতিদিন মুঠোফোনে প্রায় সব পত্রিকা পড়ছে। কিন্তু এরিকাকে নিয়ে কোন খবর নেই। পাশা ভাবল হয়তো পুলিশ এরিকার নিখোঁজ রিপোর্ট নিয়ে তেমন ভালো করে তদন্ত করেনি। পাশার মনে আছে নিউইয়র্কের ডিটেক্টিভ সমর বাবুর কথা। সমর বাবু বলেছে, এ দেশে প্রতিনিয়ত বয়স্ক ছেলেমেয়েরা আঠারো বছর অতিক্রম করলে তাদের বাবা-মাকে ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। এটি এখানে বৈধ। তাই পুলিশ বয়স্কের নিখোঁজ রিপোর্ট তেমন ভালো করে তদন্ত করে না। কিন্তু পাশার এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া চাই। তাই পাশা ভাবল সোমাদের এখানে আরও কয়েকদিন থেকে যাবে। তাতে আরও ভালোভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

সোমাদের বাড়ি একেবারে একটি গ্রাম্য এলাকায়। বহুদূর কোন বাড়ি-ঘর দেখা যায় না। আশেপাশে অনেক জঙ্গল। বাড়ির সামনের রাস্তাগুলো জঙ্গলের মধ্য দিয়ে গেছে। চারিদিকে জঙ্গল এত বেশি যে, মাঝে মাঝে সোমাদের বাড়ির সামনে কিছু হরিণ-শাবক দেখা যায়। একদিন বিকেলে পাশা সোমাদের বাড়ির উঠানের কোণায় একটি চেয়ারে বসে আছে। হঠাৎ পাশা চার-পাঁচটি হরিণ-শাবক সোমাদের বাড়ির সামনে ঘাস খেতে দেখে। পাশা জীবনে কখনো হরিণ-শাবক দেখেনি। পাশা হরিণ-শাবকগুলো দেখে উৎফুল্ল। পাশার মনে আছে বাংলাদেশে হরিণের মাংসের কত চাহিদা ছিল। অনেক জনপ্রিয়ও বটে। অবৈধ এবং অনেক দামি বলে পাশার হরিণের মাংস কখনো খাওয়া হয়নি। পাশা সোমাকে ডাকে। সোমা বাড়ির সামনে এলে পাশা তাকে জিজ্ঞেস করে হরিণ সম্পর্কিত নানা কথা। সোমা পাশাকে বলে, ‘এখন হরিণ মারার সিজন। এখানে হরিণ মারা এবং খাওয়া দুই-ই বৈধ। মাঝে মাঝে শাহেদ দু-একটা হরিণ শিকার করে নিয়ে আসে। এতে আমাদের সারা বছর চলে যায়। এ বছর শাহেদ এখনো হরিণ শিকার করতে যায়নি। না হলে আপনাকে হরিণের মাংস রান্না করে খেতে দিতাম।’ পাশা সোমার কথা শুনে অবাক। সোমা পাশাকে তাদের বাড়ির বেজমেন্টে হরিণ শিকার করার বন্ধুক, ধনুক এবং মাংস কাটার সব ছুরি দেখাতে দেখাতে বলে, ‘শাহেদ সাধারণত বন্ধুক দিয়ে হরিণ শিকার করতে পছন্দ করে। আপনিও ইচ্ছে করলে শাহেদের বন্ধুক ব্যবহার করে হরিণ শিকার করতে পারেন। অনেক মজা পাবেন।’ সোমা বলল।

পাশা বন্ধুক চালাতে জানে না। তাছাড়া পাশা বন্ধুককে কেন জানি ভয় পায়। পাশা শাহেদের ধনুকটি হাতে নেয়। ছোটবেলায় বাংলাদেশে পাশা তীর-ধনুক দিয়ে কত খেলা করেছে। পাশার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। কিন্তু শাহেদের ধনুকটি পাশার ছোটবেলার ধনুকের মত নয়। এ ধনুক দিয়ে মানুষ সাধারণত বন্যপ্রাণি শিকার করে। পাশা ধনুকটির গায়ে হাত বুলিয়ে দেখে। পাশার আত্মবিশ্বাস, সে ধনুকটি চালাতে পারবে। ‘সোমা, আমি কখনো বন্ধুক চালাইনি। তবে ধনুকটি দিয়ে হরিণ শিকারের চেষ্টা করতে পারি।’ পাশা বলল। ‘ঠিক আছে, চেষ্টা করে দেখেন।’ সোমা বলল। পাশা তার হাতে শাহেদের শিকারের ধনুকটি নেয়। সাথে কয়েকটি তীর ও ছুরি নেয়। বেজমেন্ট থেকে বেরিয়ে পাশা দেখতে পায় হরিণ-শাবকগুলো চলে গেছে। পাশা তখন হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পাশের জঙ্গলের ভেতরে যায়। জঙ্গলের ভেতর অনেক দূর চলে যায়। একটু পর পাশা দূরে একটি হরিণ-শাবককে দেখতে পায়। তাড়াতাড়ি সে তার ধনুকটি হাতে নেয়। সঙ্গে সঙ্গে তীর নিক্ষেপ করে কিন্তু তীরটি হরিণের গায়ে লাগেনি। এভাবে পাশা কয়েকবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু হরিণের গায়ে একটি তীরও লাগাতে পারেনি। অবশেষে পাশা সোমাদের বাড়িতে শূন্য হাতে চলে যায়।

পরের দিন দুপুরের খাবার শেষ হওয়ার পর পাশা সোমাদের উঠানের এক কোণার চেয়ারে বসে হরিণ দেখার জন্য অপেক্ষা করছে। মনে মনে ভাবছে আজ হরিণ শিকার না করতে পারলে সে দোকান থেকে হরিণের মাংস কিনে আনবে। হঠাৎ পাশা দেখতে পায় সোমাদের বাড়ির সামনের পথচারীর রাস্তা দিয়ে কেউ একজন হুইলচেয়ার চালিয়ে যাচ্ছে। হুইলচেয়ারটি আরও কাছে এলে পাশা বিস্মিত হয়। হুইলচেয়ারে বসে যাচ্ছে এক সুন্দরী লাতিন আমেরিকার মেয়ে। দেখতে হুবহু সেলিনার মত। মেয়েটির উচ্চতাও সেলিনার মত। ওজন প্রায় ৫০ কেজির মত। মাথার চুলগুলো অনেক কালো। ফর্সা তার গায়ের রং। কিন্তু মেয়েটি হুইলচেয়ারে করে কেন যাচ্ছে? পাশার মনে হচ্ছে সম্প্রতি কোন দুর্ঘটনা থেকে মেয়েটির বর্তমান অবস্থা এমন। পাশা ভাবল মেয়েটির সাথে একটু কথা বলবে। তিন্নী ও সোমা দুপুরের খাবার খেয়ে এখন ঘুমাচ্ছে। আর শাহেদ হাসপাতালে ডিউটি করছে।

‘হাই, আই অ্যাম সরি! ইট সিমস লাইক ইউ আর স্ট্রাগলিং উইথ ইউর হুইলচেয়ার। আই থট আই শুড হেল্প ইউ।’ পাশা মেয়েটিকে বলল। মেয়েটি পাশার কথা শুনে হেসে ফেলে। কিছুক্ষণ কথা বলার পরে পাশা জানতে পারে মেয়েটির নাম লিলিয়ানা। তার জন্ম কলম্বিয়ায়। মাস তিনেক আগে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় লিলিয়ানা তার ডান পা হারায়। লিলিয়ানা পাশাকে জানায়, সে প্রতিদিন এ রাস্তা দিয়ে শারীরিক থেরাপি দিতে ডাক্তারের চেম্বারে যায়। আজও সে থেরাপি শেষ করে বাড়িতে যাচ্ছে। লিলিয়ানা আরও বলে যে, তার বাড়িতে কেউ থাকে না। সে একাই থাকে। দুর্ঘটনার আগে সে একটি ব্যাংকে কাজ করত। তার পরিবারের সবাই কলম্বিয়ায় মাদকের সম্রাটের হাতে নিহত হয়। লিলিয়ানা তখন ছিল আমেরিকায়। তখন সে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। মাদক কার্টেলের হাতে তার পরিবারের সব সদস্যের নিহত হওয়ার খবর শুনে লিলিয়ানা আর কলম্বিয়ায় ফিরে যায়নি। সে এখানে থেকে যায়। পাশার সাথে অনেকক্ষণ কথা বলার পর ‘পরে আবার দেখা হবে’ বলে লিলিয়ানা তার বাড়ির দিকে চলে যায়।

লিলিয়ানার জীবন কাহিনি শুনে পাশার মন প্রথমে অনেক খারাপ হয়ে যায়। এদিক-ওদিক হেঁটে কিছুক্ষণ পর পাশা তার চেয়ারে আবার বসে পড়ে। বসে বসে অর্ধজাগ্রত অবস্থায় লিলিয়ানাকে খুন করার নানা স্বপ্ন দেখতে থাকে। পাশা স্বপ্নে দেখছে লিলিয়ানার চিৎকার আর আর্তনাদ। চারিদিকে রক্ত আর রক্ত। এদিকে পাশা দিনের বেলা স্বপ্ন দেখছে আর বসে বসে মুচকি হাসি দিচ্ছে। অন্যদিকে তিন্নী ঘুম থেকে উঠে ঘরের বাইরে আসে। ঘরের বাইরে এসে তিন্নী দেখে পাশা ঘরের উঠানের এক কোণায় বসে আছে। আর কী জানি চিন্তা করতে করতে মুচকি হাসি দিচ্ছে। ‘কী হলো? তোমাকে আজ অনেক খুশি খুশি মনে হচ্ছে।’ তিন্নী বলল। পাশার অর্ধজাগ্রত অবস্থায় স্বপ্ন দেখা ভেঙে যায়। ‘না, দেখ তিন্নী বাইরে কী সুন্দর বাতাস বইছে। শান্ত কেমন প্রকৃতি। চারিদিকে পশু-পাখিরা কেমন আনন্দে খেলা করছে। এবার তুমিই বলো আনন্দিত না হয়ে কি পারা যায়?’ পাশা তিন্নীকে বলল। তিন্নী তো পাশার এমন কবি কবি ভাব দেখে বিস্মিত। পাশা তিন্নীকে বলল, ‘চলো এই সুন্দর বিকেলে আমরা একটু বাহির থেকে ঘুরে আসি। অনেক দিন আমরা একসাথে ঘুরি না।’ বলে পাশা তিন্নীকে নিয়ে সোমাদের বাড়ির আশেপাশে ঘুরতে যায়।

তিন্নীর সাথে হাঁটতে হাঁটতে পাশা লিলিয়ানার বাড়ি অতিক্রম করে যায়। লিলিয়ানার বাড়ির দিকে পাশা বারবার তাকিয়ে দেখে। পাশার যখন লিলিয়ানার কথা মনে পড়ে; তখন পাশার সারা শরীরে যেন উত্তেজনার ঝড় বয়ে যায়। পাশা লক্ষ্য করে সোমাদের বাড়ির সামনের রাস্তাটি জঙ্গলের মধ্য দিয়ে গেছে। সোমাদের বাড়ি থেকে লিলিয়ানার বাড়ি পর্যন্ত হেঁটে যেতে পনেরো মিনিট সময় লাগে। তিন্নীর সাথে হাঁটতে হাঁটতে পাশা ঠিক করে আগামীকাল বিকেলে লিলিয়ানা তার শারীরিক থেরাপি দিয়ে সোমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় জঙ্গলের মধ্যে তাকে খুন করবে। পাশা ঠিক করে নেয়, দুপুরের খাবার শেষ হওয়ার পর যখন তিন্নী ও সোমা ঘুমাবে- এই ফাঁকে পাশা শাহেদের শিকারের সরঞ্জাম নিয়ে বের হবে। সোমা বা কেউ যদি দেখে যায়, তাহলে পাশা বলবে সে হরিণ শিকার করতে যাচ্ছে।

পরের দিন সোমা পাশার জন্য হাঁসের মাংস রান্না করছে। তিন্নী সোমাকে আগের দিন বলেছে যে, পাশার হাঁসের মাংস অনেক প্রিয়। কিন্তু তারা তো জানে না যে, পাশার কাছে এখন শুধু মানুষের কলিজা, ফুসফুস ও লিভার শুধু প্রিয়। রান্না শেষে সবাই খেতে খাবার টেবিলে বসে। খেতে খেতে পাশা বলল, ‘সোমা তোমার কোন ধরনের মাংস বেশি প্রিয়?’ সোমা বলে, ‘আমি হাঁসের মাংস এত পছন্দ করি না। গরুর মাংস আমার অনেক পছন্দ।’ সোমাদের বাড়ি থেকে মাইল খানেক দূরে পাশা ওইদিন হোয়াইট হাউস দেখতে যাওয়ার সময় একটি জীবিত পোল্ট্রি ফার্ম দেখেছে। পাশা তখন বলল, ‘সোমা, আমি ওইদিন একটি জীবিত পোল্ট্রি ফার্ম দেখেছি। তোমাদের বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে না। বিকেলে যদি হরিণ শিকার করতে গিয়ে খালি হাতে ফিরে আসি, তাহলে ওই ফার্ম থেকে তোমার জন্য গরুর মাংস কিনে আনব।’ পাশার কথা শুনে সোমা অনেক খুশি হয়ে যায়।

দুপুরের খাওয়া শেষ করে সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। পাশা আগের দিনের মত বাড়ির উঠানের এক কোণায় চেয়ারে বসে লিলিয়ানার জন্য অপেক্ষা করছে। পাশা শিকারের অজুহাতে একটি ব্যাগে কয়েকটি ছুরি, তীর ও ধনুক নিয়ে রাখে। পাশার কাছে শাহেদের হাসপাতাল থেকে চুরি করে নেওয়া ঘুমের ওষুধও আছে। কিন্তু ঘুমের ওষুধ কিভাবে লিলিয়ানাকে খাওয়াবে? পাশা ভীষণ চিন্তায় পড়ে যায়। কিছুক্ষণ পর পাশার মনে পড়ে, একদিন তিন্নী তাকে বলেছিল যে, সব মেয়েদের স্ট্রবেরি ফল খেতে পছন্দ। তাই পাশা তাড়াতাড়ি ঘরে ডুকে সোমাদের ফ্রিজ থেকে কয়েকটি স্ট্রবেরি নিয়ে আসে। এরমধ্যে একটি স্ট্রবেরিতে পাশা ঘুমের ওষুধ মেশায়। তারপর পাশা লিলিয়ানার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।

কিছুক্ষণ পর পাশা লিলিয়ানাকে দূরে দেখতে পায়। দূর থেকে লিলিয়ানা পাশার উদ্দেশে হাত উঠায়। পাশাও দূর থেকে তার হাত উঠায়। এবার পাশা তার হাতের ব্যাগটি কাঁধে নিয়ে একটি কাগজের প্লেটে করে স্ট্রবেরি খেতে খেতে লিলিয়ানার সামনে যায়। ‘হাই, হাউ আর ইউ ফিলিং টুডে?’ পাশা বলল। ‘আই অ্যাম ডুয়িং মাচ বেটার টুডে, থ্যাংস।’ লিলিয়ানা বলল। ‘দিজ স্ট্রবেরিজ আর ভেরি টেস্টি। ডু ইউ ওয়ান্ট টু ট্রাই ওয়ান।’ পাশা লিলিয়ানাকে স্ট্রবেরি খেতে খেতে বলল। স্ট্রবেরির কথা শুনে লিলিয়ানা আর লোভ সামলাতে পারল না। লিলিয়ানা বলল, ‘সিওর, আই উইল ট্রাই ওয়ান।’ এ কথা বলার পর পাশা লিলিয়ানাকে ঘুমের ওষুধ মেশানো স্ট্রবেরিটি খেতে দেয়।

চলবে...

এসইউ/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :