টেম্পু পাশা : নাইট শিফট- পর্ব ১৩

ড. রাজুব ভৌমিক
ড. রাজুব ভৌমিক ড. রাজুব ভৌমিক , কবি ও লেখক
প্রকাশিত: ০৪:১১ পিএম, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

গভীর রাতে পাশা ডিটেক্টিভ সমরবাবুর সোফায় ঘুমিয়ে পড়ে। পরের দিন সকালে পাশা তার বাড়ি ফিরে যায়। আবার দুপুরে তিন্নীসহ সমরবাবুর বাড়িতে আসে। আসার সময় খাবারের দোকান থেকে অনেক খাবার নিয়ে আসে। এভাবে প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত সমরবাবুর বাড়িতে আসা-যাওয়া করে। এই দুঃসময়ে সমরবাবুসহ তার পুরো পরিবারের খোঁজ-খবর পাশা রেখেছে। ইতোমধ্যে পাশার সাথে শত শত নিউইয়র্ক পুলিশ অফিসারের সাথে সমরবাবুদের বাড়িতে পরিচয় হয়। সবাই পাশাকে সমরবাবুর আত্মীয় বা খুব নিকটের কেউ হিসেবে জানে। এদিকে সমরবাবু পাশার প্রতি অত্যন্ত খুশি। সে পাশাকে তার এই দুঃসময়ে সাহায্য করার জন্য অনেক ধন্যবাদ জানায়। ‘পাশা, তোমাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করব না ভাই। তুমি আমার এবং আমার পরিবারের জন্য গত কয়েক দিনে যা করেছ, তার ঋণ কখনো শোধ করতে পারব না। তোমার কোনদিন কোন সমস্যা হলে আমাকে সরাসরি ফোন দেবে, প্লিজ। আমি সব ছেড়ে তোমাকে সাহায্য করতে চলে আসব। কথা দিলাম বন্ধু।’ সমরবাবু বলল। পাশা সমরবাবুকে বুকে টেনে নিয়ে আলিঙ্গন করে। ‘তোমাকে সাহায্য করছি বলে নয়। তুমি আমার বন্ধু। তাই আমার বিপদে অবশ্যই তোমাকে জানাব।’ পাশা বলল।

কিছুদিন পর পাশার মগজের ক্ষুধা পুনরায় ফিরে আসে। ধীরে ধীরে পাশার এই ক্ষুধা তাকে জ্বালাতে থাকে। পাশা ভাবল তার এই ক্ষুধা নিবারণে তাকে শীঘ্র শিকারে বের হতে হবে। অনেক দিন পাশা সমরবাবুদের বাড়িতে আসা-যাওয়ার কারণে ঠিকমতো নাইট শিফটে ক্যাব চালাতে পারেনি। পাশা ঠিক করে যে, তাকে এখন থেকে নিয়মিত নাইট শিফটে ক্যাব চালাতে হবে। তার শিকারকে শীঘ্র খুঁজে বের করতে হবে। তাই পাশা সন্ধ্যাবেলায় তার ক্যাব নিয়ে ম্যানহাটনে যায়। পাশা সারারাত ক্যাব চালায় কিন্তু তার পছন্দের শিকার খুঁজে পায় না। এভাবে এক মাস চলে যায়, পাশা তার পছন্দের শিকার খুঁজে পায় না। পাশা প্রায় পাগলের মত হয়ে যায়। পাশা ঠিকমতো খেতে পারে না। পাশার ঠিকমতো ঘুম হয় না। ‘কী হলো তোমার? গত এক মাস তুমি ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছ না। আবার ঘুমও তোমার ঠিকমতো হচ্ছে না।’ তিন্নী একদিন সকালে পাশাকে নাস্তা দেবার সময় বলল। পাশা তিন্নীকে কিছু না বলে নাস্তা শেষ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।

আজ পাশা মাংসের ডেলিভারি না দিয়ে সারাদিন সারারাত ক্যাব চালাবে বলে মন স্থির করে। পাশা সারাদিন ক্যাব চালায় কিন্তু তার পছন্দের শিকার খুঁজে পায়নি। বেলা পড়ে সন্ধ্যা হয়ে আসল। ম্যানহাটন থেকে একজন যাত্রী নিয়ে পাশা জ্যাকসন হাইটসে আসে। এরপর পাশা তার যাত্রীকে জ্যাকসন হাইটসে নামিয়ে ম্যানহাটনে ফিরে যাবে। হঠাৎ পাশা বাহিরে উচ্চ শব্দে বাংলা সংগীত শুনতে পায়। পাশা তার ক্যাব নিয়ে আওয়াজের দিকে কৌতূহল বশে যায়। পাশা তখন দেখে জ্যাকসন হাইটসের একটি রাস্তার উপরে বাংলাদেশিদের কনসার্ট হচ্ছে। সারাদিন ক্যাব চালিয়ে পাশা এখন একটু ক্লান্ত এবং ক্ষুধার্ত। সে ঠিক করে রাস্তার একপাশে তার ক্যাবটি পার্ক করে কনসার্টটি একটু দেখে আসবে এবং সেখান থেকে কিছু খেয়ে নেবে। পাশা তার ক্যাবটি রাস্তার একপাশে পার্ক করে নেয়। এরপর হেঁটে হেঁটে কনসার্টের মনোরম আয়োজন দেখতে থাকে। কনসার্টটি সবার জন্য উন্মুক্ত। পাশা দেখে বাংলাদেশ থেকে আসা নামিদামি অনেক বড় শিল্পীরা কনসার্টে গান ও নাচ করছে। এরমধ্যে পাশা কনসার্টের ভেতর অবস্থিত একটি খাবারের দোকান থেকে কিছু খেয়ে নেয়।

সন্ধ্যা তখন প্রায় আটটা বাজে। পাশা ঠিক করে সে কনসার্ট থেকে ম্যানহাটনে চলে যাবে। ম্যানহাটনে গিয়ে সারারাত ক্যাব চালাবে এবং তার মগজের ক্ষুধা মিটাতে শিকার করবে। পাশা তার ক্যাবের দিকে যাচ্ছে। ক্যাবের দুয়ারটি খুলে সবেমাত্র পাশা বসল। হঠাৎ পাশা বুঝতে পারে তার ক্যাবের পেছনের দুয়ার খুলে কেউ একজন বসল। ‘হিক্সভিলে যাব। একটু তাড়াতাড়ি নিয়ে যান।’ এক ভদ্রমহিলা বলল। এরপর ভদ্রমহিলাটি পাশাকে তার বাসার ঠিকানাটি দেয়। পাশা তার ঠিকানাটি জিপিএসে ঢুকিয়ে নেয়। এরপর হিক্সভিলের দিকে ক্যাব নিয়ে যাত্রা শুরু করে। হিক্সভিল এলাকাটি নিউইয়র্কের লং-আইল্যান্ডে অবস্থিত। গাড়িতে জ্যাকসন হাইটস থেকে যেতে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় লাগে।

পাশা এদিকে মগজের ক্ষুধার জ্বালায় প্রায় অস্থির হয়ে পড়ছে। কোন কিছুতেই যেন তার মন বসছে না। কিছুক্ষণ পর ভদ্রমহিলাটি পাশাকে বলল, ‘আপনাদের দেশের বাড়ি কোথায়?’ ভদ্রমহিলাটি বাংলাদেশি তা পাশা অনেক আগেই বুঝতে পারে। কেননা মহিলাটি পাশাকে বাংলায় তার বাসার ঠিকানা দেয়। পাশা প্রথমে ভদ্রমহিলার সাথে তেমন কোন কথা বলেনি। শুধু হ্যাঁ-না করে চালিয়ে যায়। কারণ ভদ্রমহিলাটি দেখতে সিয়ারা বা এরিকা বা লিলিয়ানার মত নয়। পাশার মনে শুধু আজ একটাই চিন্তা কাজ করছে। আজ পাশার মনে হচ্ছে সে খুন করতে না পারলে সত্যি সত্যি পাগল হয়ে যাবে। মগজের লালসার ক্ষুধার কাছে পাশা যেন জিম্মি একজন। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও পাশা বাংলাদেশি ভদ্রমহিলাটির সাথে কথা বলতে শুরু করে।

পাশা বাংলাদেশি ভদ্রমহিলাটির সাথে কথা বলে জানতে পারে যে, ভদ্রমহিলাটির নাম মুন্নি আক্তার। তার বয়স ছাব্বিশ। বাবা-মায়ের সাথে লং-আইল্যান্ডের হিক্সভিলের বাড়িতে থাকে। সে বর্তমানে কুইন্স কলেজে ব্যবসা বিষয়ে পড়াশোনা করছে। মুন্নি দেখতে কিছুটা শ্যাম বর্ণের, উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি এবং শরীরের গঠন একটু চিকন। মুন্নি তার বান্ধবীদের নিয়ে আজ দুপুরে কনসার্ট দেখতে জ্যাকসন হাইটসে আসে। তার বান্ধবীরা মুন্নিকে ছেড়ে অনেক আগেই বাড়িতে চলে যায়। মুন্নি কনসার্ট পুরোটি দেখার জন্য থেকে যায়। মু্ন্নি ছোটবেলায় তার বাবা-মার সাথে আমেরিকায় আসে। কুইন্সে মুন্নির বাবার একটি গ্রোসারি দোকান আছে। গ্রোসারি দোকানের নাম বলাতে পাশা মুন্নির বাবাকে চিনতে পারে। পাশা মাঝে মাঝে সে দোকানে মাংস ডেলিভারি দেয়।

মুন্নির সাথে কথা বলতে বলতে অনেক সময় পেরিয়ে যায়। রাত তখন প্রায় সাড়ে নয়টা। পাশার মগজের লালসা পাশাকে প্রতিনিয়ত জ্বালাতন করছে। পাশা প্রায় মুন্নিদের হিক্সভিলের বাড়িতে পৌঁছে যায়। তখন পাশা ঠিক করল, সে মুন্নিদের বাড়ির আশেপাশে গাড়ি চালিয়ে দেখবে কোন সিসিটিভি আছে কি-না। না হলে আজ সে মুন্নিকে হত্যা করবে। পাশা ধীরে ধীরে মুন্নির বাড়ি সামনের রাস্তা পেরিয়ে যায় এবং আশেপাশে সিসিটিভি আছে কি-না তা দেখে। ‘আমাদের বাড়িটি পেছনে ছিল। আপনি কোন দিকে যাচ্ছেন?’ মুন্নি বলল। ‘সরি ভুল হয়ে গেছে। এই তো ঘুরিয়ে নিচ্ছি।’ এই বলে পাশা মুন্নিদের বাড়ির আশেপাশের রাস্তাতে চালিয়ে সিসিটিভি আছে কি-না তা ভালো করে দেখে। পাশা মুন্নিদের বাড়ির সামনে কোন সিসিটিভি দেখতে পায়নি। তাছাড়া আশেপাশেও তেমন কোন সিসিটিভি দেখতে পায়নি।

মুন্নিদের বাড়িটি একটি নির্জন এলাকায় অবস্থিত। পাশা বুঝতে পারে সে মুন্নিকে হত্যা করলে কেউ বুঝতে পারবে না যে এ হত্যার সাথে পাশা জড়িত আছে। কারণ যদিও কোনভাবে পুলিশ বুঝতে পারে যে মুন্নি একটি ক্যাবে উঠেছিল কিন্তু ক্যাবের রেকর্ড চেক করলে বুঝতে পারবে যে ক্যাবটি মুন্নিকে তার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়েছে। আর যেহেতু বাড়ির সামনে ক্যামেরা নেই। সেহেতু মুন্নি প্রকৃতপক্ষে ক্যাব থেকে বেরিয়েছে কি-না তা খতিয়ে দেখা মুশকিল। যদি মুন্নির মৃতদেহ না পাওয়া যায়। তাহলে পুলিশ ভাববে যে, মুন্নি হয়তো বাসা ছেড়ে অন্যত্র পালিয়েছে। মুন্নি একজন প্রাপ্তবয়স্ক। তাই নিখোঁজ মামলায় তেমন পুলিশি তদন্ত হবে না। ডিটেক্টিভ সমরবাবু একথা একদিন পাশাকে জানিয়েছে।

পাশা আশেপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা না দেখার পর ইচ্ছে করে একটু দূরে চলে যায়। এরপর সে স্ট্রবেরি খেতে শুরু করে এবং সাথে ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত স্ট্রবেরিটাও রাখে। এতক্ষণ কিছু বলেনি কিন্তু এবার মুন্নির মেজাজ গরম হয়ে যায়। ‘এই যে ভাই, আপনি কোন দিকে যাচ্ছেন? আমার বাড়ি তো পেছনের দিকে!’ মুন্নি বলল। ‘সরি আপা, এদিকে কখনো কোন দিন আসিনি। তাই ভুল হয়ে যাচ্ছে। চিন্তা করবেন না। আপনার কাছে আমি ভাড়া অনেক কম রাখবো। এই ভুলটা আসলেই আমার। নেন একটা স্ট্রবেরি খান।’ পাশা বিনয় করে বলল। পাশার কথা শুনে মুন্নির মন সহজেই গলে যায়। মনে মনে সে পাশার জন্য খারাপ বোধ করে এবং পাশার হাত থেকে ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত স্ট্রবেরিটা নেয়। এরপর মুন্নি সে স্ট্রবেরিটা খেয়ে নেয়।

মুন্নি যে স্ট্রবেরিটা খেয়ে নিয়েছে তা পাশা দেখেনি। তাই মুন্নি ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত স্ট্রবেরিটা খেয়েছে কি-না নিশ্চিত হতে পাশা বলল, ‘আপা, স্ট্রবেরিটা খেতে কেমন লাগল? অনেক সুস্বাদু না?’ পাশা কয়েক বার বলল কিন্তু মুন্নির কোন সাড়া না পেয়ে পাশা তার গাড়ির পেছনে তাকায়। পাশা দেখতে পায় মুন্নি অজ্ঞান হয়ে ক্যাবের পেছনের সিটে পড়ে আছে। পাশা তখন বুঝতে পারে মুন্নি তার ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত স্ট্রবেরিটি খেয়েছে।

পাশা তখন আর দেরি না করে সেখান থেকে কুইন্সের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। পাশা মুন্নিকে তার ট্রাকের কাছে নিয়ে যাবে। তারপর মুন্নিকে ট্রাকের ভেতরে পাশা তার ধারালো ছুরি দিয়ে হত্যা করবে। পাশার ট্রাকটি যেখানে পার্ক করা আছে। সে জায়গাটিতে হিক্সভিল থেকে যেতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। কুইন্সের জ্যাকসন হাইটসের ত্রিশ নম্বর এভিনিউতে পাশার বাড়িটি অবস্থিত। আর পাশা এখন তার ট্রাকটি পার্ক করে রেখেছে সেন্ট মাইকেল সেমিটারির বা কবরস্থানের পাশের রাস্তাটির উপর। হিক্সভিল থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ মাইলের দূরত্ব। পাশার যেন আর তর সইছে না। পাশা হিক্সভিল এলাকা থেকে দ্রুত বেরিয়ে যায়। এরপর হাইওয়েতে ওঠার পর আরও দ্রুত তার ক্যাব চালাতে থাকে।

হঠাৎ মুন্নির জ্ঞান ফিরে আসে। মুন্নি তখন বুঝতে পারে যে তার সর্বনাশ হতে চলছে। মুন্নির হাত-পা তখন বাঁধা ছিল না। পাশা তাড়াহুড়া করতে গিয়ে মুন্নির হাত-পা বাঁধতে ভুলে যায়। মুন্নি অজ্ঞানের ভান করে আস্তে আস্তে ক্যাবের দরজা খোলার চেষ্টা করে। কিন্তু গাড়ির দরজা খোলা যাচ্ছে না। মুন্নি গাড়ির জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে দেখে। সে বুঝতে পারে এখন গাড়ির দরজা খুললেও কোন লাভ হবে না কারণ পাশা তার গাড়িটি মধ্যম লেনে দ্রুত চালাচ্ছে। তাছাড়া হাইওয়েতে অনেক গাড়ি চলছে। মুন্নি যদি গাড়ি থেকে ঝাপ দিয়ে নামার চেষ্টা করে তাহলে হাইওয়েতে চলা গাড়ির নিচে পিষ্ট হয়ে তার নির্ঘাত মৃত্যু হবে। তাই মুন্নি ঠিক করে পাশাকে সে পেছন থেকে আঘাত করার চেষ্টা করবে। কিন্তু ক্যাবের মধ্যখানে পার্টিশন থাকার কারণে তা-ও সম্ভব হচ্ছে না। কী করবে মুন্নি ভেবে পাচ্ছে না। তার কাছে মুঠোফোনটিও নেই যে, সে পুলিশকে ফোন করবে। কনসার্টে যাওয়া তার এক বান্ধবী ভুলে মুন্নির ফোনটি নিয়ে যায়। মুন্নি তার সে বান্ধবীকে তার ফোনটি দেয় তার কয়েকটি ছবি তোলার জন্য কিন্তু পরে মুন্নি তার ফোনটি বান্ধবীর থেকে ফেরত নিতে ভুলে যায়। মনে মনে মুন্নি নিজেকে অনেক গালি দিচ্ছে।

এদিকে পাশা তার ক্যাবটি দ্রুত চালিয়ে যাচ্ছে। মুন্নি যে জাগ্রত সে এখনো জানে না। মুন্নি চুপিচুপি ক্যাবের পেছনে আত্মরক্ষার জন্য কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছে। হঠাৎ পাশা তার ক্যাবের পেছনে তাকায় এবং দেখে মুন্নি কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছে। পাশা ভয় পেয়ে যায়। পাশা জানে ক্যাবের পেছনে তাকে আঘাত করার জন্য তেমন কোন কিছু নেই। কারণ সে তার ক্যাবকে সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখে। এরপর পাশা ঠিক করে মুন্নিকে কিছুতেই বুঝতে দেওয়া যাবে না যে, মুন্নি জাগ্রত তা পাশা জেনে ফেলেছে। তাহলে সে চিৎকার দেওয়া শুরু করবে। যদিও হাইওয়েতে চিৎকার করলে কেউ তা শুনবে না। কারণ সব গাড়ি গড়ে ৬৫ মাইল গতিতে চলছে। তারপরও পাশা এ ঝুঁকি নিতে চাইছে না। তাই পাশা না জানার ভান করে তার ক্যাব দ্রুত চালাচ্ছে। পাশার উদ্দেশ্য, সে সুযোগ বুঝে হাইওয়ের একপাশে তার ক্যাবটি থামাবে। তারপর গাড়ি থেকে নেমে মুন্নির হাত-পা শক্ত করে বেঁধে দেবে।

রাত তখন প্রায় দশটা। হাইওয়ের দুইপাশে কোন লোক-বসতি নেই। হাইওয়েতে গাড়ির সংখ্যাও কম মনে হচ্ছে। পাশা ভাবল সুযোগটি মিস করা যাবে না। সাথে সাথে পাশা তার ক্যাবটি হাইওয়ের একপাশে থামায়। এদিকে মুন্নি বুঝতে পারে যে, পাশা জানে সে জাগ্রত। তাই মুন্নি পাশাকে আঘাত করার জন্য প্রস্তুত থাকে। বাহিরে অনেক অন্ধকার। পাশা তার নিজের হাত দুটো স্পষ্ট দেখতে পারছে না। গাড়ি থামিয়ে পাশা পেছনের দরজা খুলতে গেলে মুন্নি তাকে সজোরে এক লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দেয়। এরপর মুন্নি হাইওয়ের পাশে জঙ্গলের ভেতরের দিকে দ্রুত পালিয়ে যায়। পাশা মুন্নির লাথি খেয়ে মাটিতে পড়ে প্রচণ্ড ব্যথা পায়। একটু পর পাশা উঠে বসে। পাশা ঠিক করে মুন্নিকে কিছুতে বাঁচতে দেওয়া যাবে না। কারণ সে পালিয়ে গিয়ে পুলিশকে সব বলে দিলে পাশার সর্বনাশ হয়ে যাবে। তাই পাশা বহুকষ্টে মাটির উপরে বসে। এরপর মুন্নি পেছনে দৌড়ায়। পাশা কোন দিকে দৌড়াচ্ছে তা সে নিজেও জানে না। চারিদিকে শুধু অন্ধকার। পাশা ভাবল যে, মুন্নি এই অন্ধকার জঙ্গলে বেশি দূর যাবার কথা নয়। তাই পাশা মুন্নিকে নিয়ে এতটা চিন্তা করছে না।

পাশা জঙ্গলের ভেতর মুন্নির খোঁজে ধীরে ধীরে হাঁটছে। পাশা হাঁটার সময় জঙ্গলে পড়ে থাকা শুকনো পাতাগুলো তার পায়ের চাপে মচমচ শব্দ করছে। পাশার মাথায় একটি বুদ্ধি আসে। কিছুক্ষণ পর পাশা মাটিতে বসে পড়ে। পাশা মুন্নির পায়ের শব্দ শুনতে চেষ্টা করছে। অনেকক্ষণ পাশা গভীর জঙ্গলের মধ্যে বসে থাকে কিন্তু সে কিছু শুনতে পাচ্ছে না। পাশার বুকে একটা কামড় দিয়ে ওঠে। ‘মুন্নি কি তাহলে পালিয়ে গেছে? এখন কী হবে? আমি তো শেষ।’ পাশা ভাবল। এদিকে মুন্নি পাশার ঠিক পেছনে প্রায় দশ ফুট দূরে একটি গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। শুকনো পাতার শব্দ হচ্ছে বলে মুন্নিও জঙ্গলে হাঁটা বন্ধ করে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। মুন্নি ভাবল কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর পাশা হয়তো চলে যাবে। কিন্তু পাশা সহজে হারতে রাজি নয়। পাশা বসে বসে চিন্তা করে কিভাবে সে মুন্নিকে সহজে ধরতে পারবে। অনেকক্ষণ ধরে পাশা ভাবছে কিন্তু কোন উপায় বের করতে পারছে না। পাশার গাড়ির চাবি তার কাছে তাই সে জানে মুন্নি তার গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যেতে পারবে না। আর জঙ্গলের মধ্যে যে অন্ধকার এতে সে বেশি দূর যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।

এভাবে মধ্যরাত হয়ে যায়। পাশা জঙ্গলে চুপচাপ বসে আছে। অন্যদিকে মুন্নিও গাছের আড়ালে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মুন্নি ভাবছে পাশা কেন এখনো যাচ্ছে না। হয়তো সে প্রচণ্ড ব্যথা পেয়ে মাটিতে বসে আছে। মুন্নি একবার দৌড় দিয়ে হাইওয়ের কাছে চলে যেতে প্রস্তুত হয়। পরে ভাবল পাশা যদি তাকে দৌড় দিয়ে ধরে ফেলে তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। তাই গভীর অন্ধকারে তার ভয় হলেও ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সে পাশাকে অন্ধকারের মধ্যেও সামান্য দেখতে পারছে। মাঝে মাঝে মুন্নি অস্পষ্টভাবে লক্ষ্য করছে যে, পাশা এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। মুন্নি ঠিক করল যতক্ষণ লাগুক সে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবে।

রাত প্রায় একটা। পাশা আজ সারাদিন ক্যাব চালিয়ে খুব ক্লান্ত। তারপর মুন্নির আঘাতে মাটিতে পড়ে তার সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা করছে। পাশার প্রচুর ঘুমও পাচ্ছে। পাশা উভয় সংকটে পড়ে। মুন্নি যদি কোনমতে বেঁচে যায় তাহলে পাশাকে সহজেই পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে। সারাজীবন তাকে কারাগারে কাটাতে হবে। জীবনে সে আর কোন দিন পৃথিবীর আলো দেখবে না। আবার জঙ্গলে বসে প্রচুর মশার কামড় তাকে খেতে হচ্ছে। পাশা অন্ধকারে কিছু দেখতে পারছে না। এদিকে মুন্নিরও কোন সাড়া-শব্দ নেই।

পাশার মাথায় আরেকটি বুদ্ধি আসে। পাশা বুঝতে পারে, হয়তো মুন্নি তার আশেপাশে আছে, না হয় সে অনেক আগেই জঙ্গল থেকে পালিয়ে গেছে। যেহেতু জঙ্গলের ভেতর গভীর অন্ধকার। তাই পাশার ধারণা মুন্নি পালিয়ে যেতে পারেনি। সে তার আশেপাশেই আছে। উপরন্তু, এত রাতে গভীর জঙ্গলে একটি মেয়ে নির্ভয়ে থাকা সম্ভব না। তাই পাশা বুঝতে পারে মুন্নি নিশ্চয় তার আশেপাশে লুকিয়ে আছে। তা না হলে মুন্নি একাকী নিঃশব্দে জঙ্গলে থাকতে পারত না। পাশা তার আশেপাশে থাকার কারণে মুন্নি প্রকৃতির ভয় করছে না। পাশা একটি ছোট পাথর খণ্ড তার হাতে নেয়। এরপর সে উঠে দাঁড়ায়। এরপর পাশা যেদিক থেকে জঙ্গলে প্রবেশ করেছে, সেদিকে হাঁটতে থাকে। প্রায় বিশ ফুট দূরত্ব হাঁটার পর পাশা একটি গাছের আড়ালে লুকায়। মুন্নি অস্পষ্টভাবে দেখতে পায় যে, পাশা চলে যাচ্ছে। কিন্তু পাশা যে গাছের পেছনে লুকিয়েছিল তা সে দেখতে পায়নি। এরপর পাশা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে তার হাতে পাথর খণ্ডটি এমনভাবে মাটির উপরে গড়িয়ে ছুঁড়ে মারে। যাতে মুন্নির কাছে মনে হয় পাশা হেটে চলে যাচ্ছে। মুন্নি শুকনো পাতার মচমচ শব্দ দূর থেকে শুনতে পায় এবং বুঝতে পারে পাশা চলে গেছে। তারপরও মুন্নি নিশ্চিত হওয়ার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবে বলে ঠিক করে। প্রায় দশ-পনেরো মিনিট এভাবে চলে যায়। পাশা মুন্নির জন্য গাছের আড়ালে জঙ্গলের ভেতর অপেক্ষা করছে। এদিকে গভীর জঙ্গলে মুন্নির একা একা প্রচণ্ড ভয় হচ্ছে।

চলবে...

এসইউ/জেআইএম