টেম্পু পাশা : নাইট শিফট- পর্ব ১২

ড. রাজুব ভৌমিক
ড. রাজুব ভৌমিক ড. রাজুব ভৌমিক , কবি ও লেখক
প্রকাশিত: ০১:৩৭ পিএম, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

যেই ভাবা সেই কাজ। পাশা লিলিয়ানা ও সিয়ারার মাংসবিহীন লাশ দুটি বস্তায় ভরে ট্রাকের এক কোণায় রাখে। বস্তার উপরে লেগে থাকা সব রক্ত পরিষ্কার করে। ট্রাকের ভেতরে দেয়ালে এবং মেঝেতে লেগে থাকা রক্তও পরিষ্কার করে। লিলিয়ানা ও সিয়ারার দেহ থেকে কাটা মাংসের টুকরাগুলো একটি বড় পাত্রে মিশিয়ে রাখে। আগামীকাল সকালে সে এ মাংসের টুকরাগুলো গরু এবং খাসির মাংসের সাথে মেশাবে। তখন সন্ধ্যা প্রায় সাতটা বাজে। পাশা আগেই তিন্নীকে ফোন করে বলেছে যে, আজ বাড়িতে যেতে তার দেরি হবে। পাশা এবার তার ট্রাক থেকে বাহিরে আসে। নিউইয়র্কের সন্ধ্যা বাতাস তার মুখে লাগামাত্র পাশা যেন স্বর্গের সুখ-স্পর্শ পায়। আজ বহুদিন পর তার মগজের বুঝি ক্ষুধা নিবারণ হলো। পাশার মনে এখন শান্তির হাওয়া বইছে। অবশেষে যেন পাশা নিজেকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে। মগজের ক্ষুধা পাশাকে মানসিকভাবে যথেষ্ট যন্ত্রণা দেয়। তখন পাশা যেন নিজের প্রতি তার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

এবার পাশা ট্রাকের ভেতর থেকে লিলিয়ানা ও সিয়ারার মাংসবিহীন বস্তাভর্তি লাশগুলো এনে লিলিয়ানার গাড়ির ট্র্যাংকে রাখল। এরপর পাশা লিলিয়ানার গাড়িটি চালু করে রুজভেল্ট আইল্যান্ডের দিকে যাত্রা শুরু করে। পথে সে লং আইল্যান্ড সিটির একটি গ্যাস ফিলিং স্টেশন থেকে গাড়ির জন্য জ্বালানি নেয়। যদিও গাড়িতে যথেষ্ট পরিমাণ জ্বালানি ছিল। তারপরও পাশা গাড়িতে অতিরিক্ত জ্বালানি নেয়। কেননা গাড়িটি পরে ধ্বংস করতে অতিরিক্ত জ্বালানি কাজে লাগতে পারে। জ্বালানি নেওয়া শেষ হলে পাশা রুজভেল্ট আইল্যান্ডের দিকে আবার যাত্রা শুরু করে। লং আইল্যান্ড সিটি কুইন্সের একটি অংশ। এখান থেকে রুজভেল্ট আইল্যান্ডে যেতে পাঁচ বা দশ মিনিট সময় লাগে। রুজভেল্ট আইল্যান্ড ছোট্ট একটি দ্বীপ। যেটি ম্যানহাটন এবং কুইন্সের মধ্যে অবস্থিত। দিনের বেলায় যদিও এখানে বহু মানুষের সমাগম হয় কিন্তু রাতের বেলায় হয় ঠিক তার বিপরীত।

রাত তখন প্রায় আটটা বাজে। পাশা রুজভেল্ট আইল্যান্ডে এসে পৌঁছল। পুরো দ্বীপ যেন মানুষ শূন্য। আশেপাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। পাশার তখন মনে পড়ে যে পরের দিন মঙ্গলবার। নিউইয়র্কের মানুষদের খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হবে। স্কুলপড়ুয়াদের খুব ভোরে উঠে স্কুলে যেতে হবে। আবার চাকরিজীবীদের ভোরে যার যার কর্মক্ষেত্রে যেতে হবে। তাই অধিকাংশ নিউইয়র্কবাসী এখন খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশা পুরো দ্বীপটিতে জনশূন্য দেখে মনে মনে খুব খুশি হয়। সে রুজভেল্ট আইল্যান্ডের দক্ষিণ দিকে এক কোণায় লিলিয়ানার গাড়িটি পার্ক করে। এরপর গাড়ির ট্র্যাংক খুলে লিলিয়ানা ও সিয়ারার লাশ দুটি বের করে। পাশা লিলিয়ানার মাংসবিহীন লাশটি চালকের আসনে বসায় এবং সিয়ারার লাশটি সামনের যাত্রীর আসনে বসায়। লাশ দুটোর উপর সিট বেল্ট দিয়ে আটকে দেয়। পাশা এবার লিলিয়ানার গাড়ির জ্বালানি ট্যাংক থেকে একটি পাইপ দিয়ে সব জ্বালানি একটি কন্টেইনারে রাখে। এরপর সেই কন্টেইনার থেকে সব জ্বালানি গাড়ির ভেতরে ও বাহিরে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঢেলে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। গাড়িতে আগুন ধরিয়ে পাশা দূরে চলে যায়। সেখান থেকে পাশা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে গাড়িটি পুরোপুরি ভস্ম হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর নিউইয়র্কের ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ট্রাক আসে। কিন্তু ততক্ষণে গাড়িটি ভস্ম হয়ে তার আগুন এমনিতে নিভে যায়। তারপরও দমকলকর্মীরা ভস্মীভূত গাড়ির উপরে যথেষ্ট পরিমাণে পানি ঢেলে দেয়। এরপর নিউইয়র্ক পুলিশের কয়েকটি গাড়ি আসে। তারা গাড়ির চারদিকে ক্রাইম সিনের টেপ দিয়ে এলাকা বন্ধ করে দেয়। পাশা সেখান থেকে হেঁটে চলে যায়। রুজভেল্ট আইল্যান্ড থেকে ট্রেনে করে তার বাড়িতে ফিরে আসে।

‘তোমার আজ এত দেরি কেন?’ তিন্নী পাশাকে জিজ্ঞেস করল। ‘সারাদিন ট্রাকের ইঞ্জিনের সমস্যা ছিল। এরপর মেকানিক শপে ট্রাকটি নিয়ে যাই সমস্যাগুলো ঠিক করার জন্য। মেকানিক শপের কর্মচারীরা ট্রাকের তেমন কোন ত্রুটি খুঁজে পায়নি। সেখানে অযথা দেরি হয়ে যায়। এদিকে সবাই তাদের ডেলিভারির জন্য আমাকে ফোন দিচ্ছে। তাই আমাকে সব ডেলিভারি শেষ করেই আসতে হয়েছে।’ পাশা তিন্নীকে বোঝাল। পাশা তিন্নীকে আরও বলল যে, সে আজ রাতে ক্যাব চালাতে ম্যানহাটনে যাবে না। সে এখন অনেক ক্লান্ত। সারারাত সে বিশ্রাম নেবে। ‘তিন্নী, আজ আমি গোসল সেরে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ব।’ পাশা বলল। খাওয়ার কথা বলতেই হঠাৎ পাশার মনে পড়ল যে, সে লিলিয়ানা ও সিয়ারার কলিজা, ফুসফুস ও লিভারের টুকরার থলেটি ভুলে ট্রাকে ফেলে এসেছে। পাশার ট্রাকটি যেখানে পার্ক করা আছে, সে জায়গাটি বেশি দূরে নয়। কুইন্সের জ্যাকসন হাইটসের ত্রিশ নম্বর এভিনিউতে পাশার বাড়ি। আর পাশা এখন তার ট্রাকটি পার্ক করে রাখে সেন্ট মাইকেল সেমিটারি বা কবরস্থানের পাশের রাস্তার ওপর। পাশার বাড়ি থেকে সেখানে হেঁটে যেতে দশ মিনিট সময় লাগে। কিন্তু পাশা আজ অনেক ক্লান্ত। সে মনে মনে ঠিক করে কাল সকালে মাংসের ডেলিভারি শুরু করার আগে বাড়িতে এসে তিন্নীকে মাংসের থলেটি দিয়ে যাবে। তাহলে পাশা দুপুরে বাড়িতে এসে মাংস খেতে পারবে। পাশার গোসল করা শেষ। তিন্নী পাশার জন্য খাবার প্রস্তুত করে বসে আছে। পাশা খাবারের টেবিলে বসে খেতে শুরু করে। ‘তিন্নী তুমি কি কিছু বলবে?’ পাশা বলল। ‘তুমি কী করে বুঝলে যে, আমি কিছু বলতে চাইছি?’ তিন্নী বলল। ‘অনুমান করলাম মাত্র, আর কিছু না। কী বলবে বলে ফেল।’ পাশা বলল। তিন্নী তখন পাশাকে বলল সে গর্ভবতী। কাল সকালে ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে নিশ্চিত হয়ে আসবে। পাশা বাবা হবে এ খুশিতে পুরোদমে আত্মহারা। সে তিন্নীকে সাথে সাথে বুকে জড়িয়ে ধরে। পাশা বলল, ‘আজ আমি অনেক খুশি তিন্নী। এমন একটা সুখবরের জন্য তোমাকে অশেষ ধন্যবাদ।’

রাতের খাবার শেষ করে পাশা ঘুমাতে যায়। সকালে খুব ভোরে পাশা ঘুম থেকে ওঠে। সকালের নাস্তা শেষ করে পাশা তার ট্রাকের দিকে যায়। ট্রাকটি চালিয়ে পাশা তার বাড়ির সামনে পার্ক করে। এরপর ট্রাকের ভেতর থেকে মাংসের থলেটি হাতে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। রান্না ঘরে তিন্নী কি জানি করছে। ‘তিন্নী, মাংসগুলো নিয়ে যাও। গতকাল মাংসগুলো কিনেছি কিন্তু বাড়িতে আনতে ভুলে গেলাম। তুমি ডাক্তারের চেম্বার থেকে এসে মাংস রান্না করিও। তাহলে দুপুরে এসে খেতে পারব। এখন এগুলো ফ্রিজে রেখে দাও।’ বলে পাশা হাতের মাংসের থলেটি তিন্নীর হাতে তুলে দেয়। পাশা এরপর তার ট্রাকটি নিয়ে চলে যায়। পাশা কসাইখানার দিকে যাত্রা শুরু করে। কসাইখানা থেকে মাংস নিয়ে আজ কুইন্সের বিভিন্ন জায়গায় ডেলিভারি দেবে। পাশা কসাইখানা থেকে ট্রাকভর্তি মাংস নেয়। এবার সে মাংস ডেলিভারি দিতে জ্যাকসন হাইটসের দিকে যাত্রা শুরু করে। জ্যাকসন হাইটসে পৌঁছার আগে রাস্তার পাশে ট্রাকটি থামায়। এরপর পাশা আগের দিনের সিয়ারা ও লিলিয়ানার মাংসের টুকরাগুলো আজকের কসাইখানা থেকে নেওয়া গরু ও খাসির মাংসের টুকরার সাথে মিশিয়ে নেয়। মাংস মেশানো শেষ হলে পাশা ডেলিভারি দিতে শুরু করে। এরপর পাশা পাঁচটি বাঙালি গ্রোসারিতে মাংসের ডেলিভারি দেয়।

দুপুর প্রায় একটা বাজে। পাশা আজকের মাংসের সব ডেলিভারি শেষ করে বাড়ি ফিরে যায়। বাড়ি পৌঁছলে তিন্নী তার সুখবরের সংবাদটি নিশ্চিত করে। ‘ডাক্তারের চেম্বারে আজ নানা ধরনের পরীক্ষা করেছে। পরীক্ষা করার শেষে ডাক্তার বলল আমি তিন মাসের গর্ভবতী। আমাদের বাচ্চটি ভালো আছে।’ তিন্নী পাশাকে মনের আনন্দে কথাটি বলল। তিন্নীর কথা শুনে পাশা ভীষণ খুশি হয়। পাশা ফোন করে তার সব বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজনকে খুশির সংবাদটি দেয়। ‘তুমি গোসল করে এসো। তোমার মাংসের রান্না প্রায় শেষ। তোমার গোসল করতে করতে মাংসের রান্না শেষ হয়ে যাবে।’ তিন্নী পাশাকে বলল। পাশা গোসল করতে চলে যায়। গোসল শেষ করে পাশা খাবার টেবিলে খেতে আসে। তিন্নী একে একে খাবার টেবিলে সব খাবার নিয়ে আসে। পাশা খেতে শুরু করে। তিন্নী মাংস নিয়ে এলে পাশার চোখ দুটো যেন জ্বলজ্বল করতে থাকে। পাশা মাংস খেতে শুরু করে কিন্তু বুঝতে পারেনি যে, কোনটি লিলিয়ানার মাংস বা কোনটি সিয়ারার মাংস। বুঝতে পারলে পাশার অনেক সানন্দ অনুভব হতো। তাই পাশা একটু হতাশ হয়ে পড়ে। এরপর পাশা মনে মনে ঠিক করে যে, দুই জনের মাংস সে কখনো আর মিশিয়ে আনবে না বা দুইজনকে কখনো একসাথে খুন করবে না।

এভাবে মাসখানেক চলে যায়। এরমধ্যে পাশা তার জিইডি প্রোগ্রামটি শেষ করে। তিন্নী পাশাকে নিয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রিতে ভর্তি করার জন্য জন জে কলেজে যায়। তিন্নী আমেরিকায় তার স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেছে। তাই কলেজে ভর্তি সম্পর্কিত প্রচুর অভিজ্ঞতা আছে। তিন্নী পাশার সব সার্টিফিকেট সাথে নিয়ে যায়। জিইডি সার্টিফিকেটও নিয়ে যায়। জন জে কলেজে পাশা তার সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্যের বিবরণ দেয়। ওইদিন পাশাকে জন জে কলেজে কয়েকটি ভর্তির ইন্টারভিউ দিতে হয়। সবশেষে পাশা জন জে কলেজে অপরাধবিদ্যায় ভর্তি হয়। ভর্তি শেষ করে তিন্নীর সাথে পাশা ট্রেনে করে বাড়ি ফিরছে। ট্রেনে বসে পাশা ঝিমাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর তিন্নী পাশাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, কেন তুমি অপরাধবিদ্যা পড়তে চাইলে সেটা তো বললে না।’ পাশা চোখ খুলল। ‘তোমাকে বোধ হয় আগে বলেছি। আসলে আমেরিকায় আসার পর থেকে গণ্ডমূর্খের মত খাটছি। এখানকার কিছুই জানি না। না জানার কারণে মাঝে মাঝে অনেক বিপদের সম্মুখীন হতে হয়। ডিটেক্টিভ সমরবাবুর কাছে শুনেছি, জন জে কলেজ পৃথিবীর বিখ্যাত একটি কলেজ। এখানে আইন ও অপরাধবিদ্যা পড়ার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে বহু শিক্ষার্থী আসে। তাই মনে মনে আমারও ইচ্ছা ছিল এ কলেজে একদিন পড়বো। আজ আমার জীবনের স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। তার জন্য তোমার অবদান অনেক বেশি। তুমি যদি আমাকে সাহায্য না করতে তাহলে আমি এ কলেজে কখনো ভর্তি হতে পারতাম না।’ পাশা তিন্নীকে বলল। তিন্নী পাশার কথা শুনে আবেগাপ্লুত হয়।

পরদিন সমরবাবু পাশাকে ফোন করে। ‘পাশা, আমি খুব কষ্টের মধ্যে আছি, বন্ধু। একটি দুঃসংবাদ আমার জীবন ছাড়খাড় করে দিলো।’ সমরবাবু বলল। পাশা কিছু না জানার ভান করে বলল, ‘সব ঠিক আছে তো, সমরবাবু?’ সমরবাবু কান্নার সুরে বলল, ‘না বন্ধু, আমার স্ত্রী সিয়ারাকে হত্যা করা হয়েছে। কী করব বুঝতে পারছি না। বাড়িতে সবাই কান্নাকাটি করছে। আমার মনটা ভীষণ খারাপ। খুব হতাশ হয়ে গেছি।’ পাশা ভাবল, সমরবাবুকে জিজ্ঞেস করে সবকিছু জেনে নেওয়ার এখনই সময়, ‘আপনার কথা শুনে আমার মনটাও খারাপ হয়ে গেল। কে বা কারা আপনার স্ত্রীকে খুন করেছে?’ সমরবাবু একটি দীর্ঘশ্বাস নিলো। ‘আমার স্ত্রী সিয়ারা গত একমাস ধরে নিখোঁজ ছিল। তাকে অনেক খুঁজেছি কিন্তু কোথাও পাইনি। একমাস আগে দুটি লাশ পোড়া অবস্থায় রুজভেল্ড আইল্যান্ডে পাওয়া গেছে। সে তদন্তের ভার আমার ছিল। হত্যার স্থান থেকে ডিএনএ নমুনা নিয়ে পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছিলাম। আজ ডিএনএ রিপোর্ট পেয়ে নিশ্চিত হলাম যে, দুটি লাশের একজন আমার স্ত্রী সিয়ারা এবং আরেকজন সিরিয়াল কিলার লিলিয়ানা। তুমি হয়তো জানো না বা জানার কথা না যে, লিলিয়ানা ছিল একজন দুর্ধর্ষ সিরিয়াল কিলার। তদন্ত করে জেনেছি যে, সে প্রায় শতাধিক মানুষ হত্যা করেছে। ভার্জেনিয়ায় বেশিরভাগ মানুষকে হত্যা করেছে। ভার্জেনিয়ার পুলিশ তাকে খোঁজার জন্য একটি বিশেষ বাহিনী পর্যন্ত গঠন করেছে কিন্তু সে নিউইয়র্কে থাকার কারণে তারা তাকে খুঁজে পায়নি। নিউইয়র্কে এসে সিরিয়াল কিলার লিলিয়ানা অনেকদিন গা ঢাকা দিয়ে ছিল। তদন্ত করে আরও জেনেছি যে, লিলিয়ানা আমার স্ত্রী সিয়ারাকে আমার বাড়ির পাশ থেকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যায়। সম্ভবত সিয়ারাকে হত্যা করতে ব্যর্থ হয়ে লিলিয়ানা তার গাড়িতে আগুন লাগিয়ে সিয়ারাকে হত্যার চেষ্টা করে এবং সিয়ারা লিলিয়ানাকে সম্ভবত ধস্তাধস্তি করে গাড়ির ভেতরে আটকে রাখে। এতে দুজনেরই মৃত্যু হয়।’ সমরবাবু বলল। ফায়ার সার্ভিস যখন গাড়িতে আগুন নেভানোর জন্য রুজভেল্ট আইল্যান্ড গিয়েছে; তখন তারা পানি দিয়ে গাড়ির ভেতরের অবশিষ্ট সবকিছু ছত্রভঙ্গ করে ফেলেছে। এ জন্য পুলিশ ঠিকমতো কিছু বলতে পারছে না যে, কিভাবে সিয়ারাকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ বুঝে নেয় যে, এ সবই লিলিয়ানার কাণ্ড।

পাশা সমরবাবুকে যথেষ্ট সান্ত্বনা দেয় এবং সবসময় তার পাশে থাকার অঙ্গীকার করে। ‘সমরবাবু, আপনার সব ব্যথা আমি বুঝি। আপনি একটু ধৈর্য ধরুন। বিপদে হতাশ হলে হবে না। আপনাকে এখন ভাবির পরিবারের সবাইকে সান্ত্বনা দিতে হবে। আপনার মন শান্ত করুন। আপনার কোন কিছু দরকার হলে আমাকে অবশ্যই জানাবেন। যতটুকু সম্ভব আপনার পাশে থাকার চেষ্টা করব।’ পাশা বলল। পাশার কথা শুনে ডিটেক্টিভ সমরবাবু হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। ‘আমি সিয়ারাকে ছাড়া বাঁচব না। আমি তার শোকে একদম ভেঙে পড়েছি। কী করব এখন বুঝতে পারছি না।’ সমরবাবু বলল। পাশা সমরবাবুর মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে বলল, ‘আমি এখন আপনার বাড়িতে আসছি। কোন চিন্তা করবেন না, সমরবাবু। সময় একদিন সবকিছু ঠিক করে দেবে।’ বলে পাশা সমরবাবুর বাড়ির দিকে তার ট্রাকটি নিয়ে যাত্রা শুরু করে। সমরবাবু যখন পাশাকে ফোন দেয়; তখন পাশা মাত্র তার সে দিনের মাংস ডেলিভারি শেষ করে। পাশা তিন্নীকে ফোন করে সব খুলে বলল। তিন্নীও পাশার সাথে যেতে চাইল কিন্তু পাশা বলল তিন্নীকে পরে সমরবাবুদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য।

বিকেল তখন তিনটা। পাশা সমরবাবুদের বাড়িতে অনেক খাবার ও ফল নিয়ে যায়। সমরবাবুদের বাড়িতে সাধারণ মানুষের যেন ঢল নেমেছে। সবার কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরপর দশ বা পনেরো জন পুলিশ সদস্য সমরবাবুর বাড়িতে ঢুকল। এরপর ধীরে ধীরে পুলিশ সদস্যে তার বাড়িতে যেন তিল ধারনের ক্ষমতা নেই। মুহূর্তের মধ্যে কয়েকশ পুলিশ সদস্য সমরবাবুর বাড়িতে এসে হাজির। এদের সবাই ডিটেক্টিভ সমরবাবুর সহকর্মী। পাশা একে একে সবার খেদমত এবং দেখাশোনা করতে লাগল। পাশার আন্তরিক প্রচেষ্টা দেখে সমরবাবু খুব খুশি হয়। সমরবাবু পাশাকে বন্ধু হিসেবে সব পুলিশ অফিসারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। পাশা এবার সমরবাবুর বাড়ির পাশে দোকানটিতে যায়। সে দোকান থেকে প্রচুর ঠান্ডা পানীয় এবং নাস্তার জন্য প্রচুর খাবার কিনে আনে। সমরবাবুর বাড়িতে আসা সবাইকে পাশা অনেক আপ্যায়ন করে। এভাবে প্রায় মধ্যরাত হয়ে যায়। সমরবাবু পাশাকে তার বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম করার জন্য অনুরোধ করে। ‘পাশা, তুমি আজ আমার জন্য যা করেছে সে ঋণ আমি কখনো শোধ করতে পারব না। সত্যি তোমার মত বন্ধু পাওয়া আমার খুব সৌভাগ্য বটে। এখন তুমি এক কাজ কর। বাড়িতে চলে যাও। সারাদিন তোমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। এখানে থাকলে তোমার বিশ্রাম হবে না।’ সমরবাবু বলল। ‘না আপনাকে এভাবে ছেড়ে যেতে পারি না। আপনার এ বিপদে সাহায্য করা আমার কর্তব্য। আমার কিছু হলে আপনি অবশ্য এটাই করতেন। কোন সমস্যা নেই। আমার ঘুম আসলে আমি আপনার সোফায় ঘুমিয়ে পড়ব। আমাকে নিয়ে আপনার চিন্তা করতে হবে না।’ পাশা বলল।

চলবে...

এসইউ/এমকেএইচ