রুদ্র-প্রচেতা : পর্ব ০৪

ড. রাজুব ভৌমিক
ড. রাজুব ভৌমিক ড. রাজুব ভৌমিক , কবি ও লেখক
প্রকাশিত: ০১:৩৫ পিএম, ২৭ নভেম্বর ২০১৯

বাড়িতে আসিয়া নিয়ে বেজায় এই মন, পাগলের মত ঘুরি—না নিয়া আসন। কতেক-দিন পূর্বে আমাদের বাড়ির পশ্চাদ্দিকে ছোট্ট একটি ঘর বানিয়েছিলাম—মূলতঃ সেখানে খেলাধুলা করার জন্য। অথচ অদ্য তাহারে না দেখিতে পারিয়া সেই ছোট্ট খেলার ঘরটিই হল আমার মতিস্থিরতার আশ্রম। কেননা গ্রামের বাড়িতে কভু একাকী সময় কাটানো দায়। ঘরের সবাই কিছু না কিছু কাজে সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকে—উপরন্তু পাশের বাড়ির ধোয়া বাড়ির দুলালের মার বিশাল কণ্ঠস্বরে মায়ের সহিত ঘণ্টার পর ঘণ্টা নানা বিষয়ে অন্তঃসারশূন্য আলোচনা। তাই আমি ভাবছিলুম বাড়ির পিছনের ছোট্ট খেলাঘরে কিছুক্ষণ বসিয়া তাহার স্মৃতির সাগরে ডুবিয়া থাকিব—এতে মা ভাববে আমি বাড়ির পশ্চাদ্দিকে খেলাধুলা করিতেছি আর আমারও একটু একাকী সময় পাওয়া যাবে।

ছোট্ট খেলার ঘরটির মধ্যে বসিয়া, দুই চক্ষু বন্ধ করিয়া, প্রচেতার স্মৃতি সাগরে জোরে এক ঝাঁপ দিলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ তাহার স্মৃতির সাগরে ডুবে রস আস্বাদন করিবার পর সেই সাগরটি শুকাইয়া মরুভূমি হইয়া গেল—কেন তা হইল তাহা তৎক্ষণাৎ বুঝিতে পারিলাম না। আজ একটু বুঝিতে পারিলাম। আসলে আমাদের স্মৃতির সাগর আর বাস্তব সাগরের মধ্যে শুধু একটি মুখ্য পার্থক্য—আর সেটি হইল বাস্তব সাগরে থাকে শুধু নোনা জল কিন্তু স্মৃতির সাগরে থাকে রসালো ছোলা আখের টুকরা। মানুষ যখনি কোন ভালো অভিজ্ঞতা তাহার স্মৃতিতে প্রবেশ করাইতে পারে তাহা তখন স্মৃতির সাগরে রসালো আখের টুকরা হয়ে জমা হয়। সেই জন্য পরক্ষণে যখন মানুষ স্মৃতির সাগরে ঝাঁপ দেয়; তখন সে একটি একটি করে সেই রসালো আখের টুকরা চিবায়। তাই যতবার মানুষ ভালো স্মৃতির সাগরে ঝাঁপ দেয়; ততবার সে আখের টুকরাগুলো চিবাতে থাকে এবং রস আস্বাদন করিতে থাকে। কিন্তু একসময় সেই রসালো আখের টুকরার রস আর থাকে না—শুধু অবশিষ্টটি স্মৃতির সাগের পড়িয়া থাকে, যা দেখিলে আমাদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে অশ্রুধারা বহিতে থাকে। রস থাকে না বলে সেই ভালো স্মৃতিগুলো খারাপ স্মৃতি হইয়া যায় তা না—বরং ঐ রসহীন ভালো স্মৃতিগুলো বুকের মধ্যে দীর্ঘশ্বাস জমাইয়া দুই চক্ষু দিয়া সেই দীর্ঘশ্বাসগুলো তরল অবস্থায় উৎক্ষাত হয়।

বৃষ্টির দিনে যেমন আখ রস ব্যবসায়ীর দুর্দিন সময় অতিবাহিত হয়; তেমনি দুই চোখে বৃষ্টির মত অশ্রুর ধারা বহিতে লাগিলে মানুষকে কঠিন সময় পার করিতে হয়। আজ তাহার স্মৃতির সাগরে ঝাঁপ দিয়া যখন ঠিকমতো রস আস্বাদন করিতে পারিলাম না; তখন উন্মাদ এই হৃদয়ের যেন তরল বিস্ফোরণ ঘটিতে লাগিল। সেই তরল বিস্ফোরণের সঙ্গী নয়ন-দুটি হইল। যদিও এই ব্যাপারে আমার নাসিকা মাঝেমধ্যে নাক গলাইতে চেষ্টা করিয়াছিল। তবে শেষ অবধি সে সফল হইতে পারিল না।

এভাবে একজন মুমূর্ষু রোগীর মত কয়েকটি দিন অতিবাহিত হইল—পার্থক্য শুধু এইটাই, আমি যে ধুঁকে ধুঁকে ভিতরে মরিতেছিলাম তাহা কেউ জানিত না। মনের চিতাতে আমি একাই জ্বলিতেছিলাম। মানুষ প্রতিনিয়ত আমাদের বাহ্যিক অবস্থা দেখিয়া সামগ্রিক স্বাস্থের অবস্থা বিচার করিয়া থাকে—কিন্তু আমাদের অন্তরের গহীনে যে কত যুদ্ধ প্রতিনিয়ত ঘটে যাইতেছে তাহার ধারণা কি কেউ করিতে পারে? সেই যুদ্ধের ঝরানো রক্ত আমাদের নিয়মিত অশ্রুধারায় নির্গত হয়—যা কখনো নীরবে বাহিত হয় আবার কখনো বাতাসে মিলিয়া যায়। কত দেখলুম গ্রামের ডাক্তার মশাইটি আমাদের পেট টিপে, মুখ হা করে, চোখে টর্চ লাইট দিয়া আমাদের শারীরিক অবস্থার কথা অনর্গল বলিতে—কিন্তু আমার প্রতিনিয়ত ডাক্তার মশাইকে কেন জানি সন্দেহ হইত। কিছুদিন পর আমার শরীরে ভীষণ জ্বর আসিল। মা তো আমার শরীরে কখনো জ্বর আসিলে পাগলের মত হইয়া যাইত। তাই তিনি তাড়াতাড়ি ডাক্তার মশাইকে খবর দিলেন। ডাক্তার মশাই বেলাশেষে আমাদের বাড়িতে আসিল। ‘কই দেখি! কী হইল রুদ্রের?’ এই বলিয়া ডাক্তার মশাই আমার পেট টিপতে লাগিল। আমি মনে মনে ভাবিলাম, ‘ডাক্তার মশাই, আপনি অন্যদিন সবাইকে ফাঁকি দিয়া পেট টিপিয়া, গাল দেখিয়া বা চোখে আলো দিয়ে টাকা নিয়া চলে যান—আজ দেখি আপনি আমার রোগ নির্ণয় ঠিকমতো করিতে পারেন কিনা। কারণ আজ আমি ডাক্তার না হলেও আমার রোগের কারণটি সঠিক জানি।’ কিছুক্ষণ পর ডাক্তার মশাই আমাকে দেখার পর মাকে কহিলেন, ‘না, তেমন কিছু হয়নি। গায়ে সামান্য জ্বর আছে। প্যারাসিটামল খেয়ে একটু বিশ্রাম নিলে এমনিতে সেরে যাবে।’ সেদিন ভাবিলুম, ‘ডাক্তার মশাই দেখি এক মস্ত-বড় ধোঁকাবাজ। ঠিক-মত রোগ নির্ণয় না করিয়া এসব তিনি কী বলিল।’ সেদিন ছিল না দরকার আমার প্যারাসিটামলের—প্রয়োজন ছিল তাহার ক্ষণিকের দর্শন। জ্বরের কাঁপুনিতে সেদিন ভাবিলাম, যদি এখন দৈবক্রমে তাহার ক্ষণিকের দেখা পাইতাম—যদি সে বসিত আমার মাথার পাশে—যদি ঢালিত সে জল আমার মাথার উপর—কতই না মধুর তাহা হইত।

জ্বর কভু না পারিত, আসিতে এ শরীর মন্দিরে,
ভাসিতাম পাতার মত, যদি সখির রূপ সাগরে;
সখির ছোঁয়ায় যাইত, আমার সব রোগ মরে,
লক্ষ্মীর পায়ের মত, যখন সে শোভা দিত মোর ছোট্ট কুটিরে।

সেদিন বুঝিলুম, মোর সকল অশান্তির কারণ সখি, যে সখি শান্তির কারণ। জ্বরের জ্বালা যখন বাড়িতেছিল, আমি তাহার কথা ভাবিতাম—বানাইতাম প্রচেতাকে নিয়ে আমার স্বপ্নের খেলার ঘর। যেই ঘর ভাঙিত মোর চক্ষু মেলিলে—এ যেন সখিহীন বাস্তবতা নরকের সমতুল্য। তাই জ্বরের মধ্যে সর্বক্ষণ চক্ষু বন্ধ করিয়া থাকিতাম। কষ্ট তাতে একটু কমই হইত। কিন্তু যতবার চক্ষু বন্ধ করিতাম, মায়ের চিন্তা ততই বাড়িত। সন্তান হারানোর সেই জ্বালা তাহার উপর ভর করিত। তথাপি আমি অযথা মায়ের কষ্ট বাড়াইতাম—সন্তান হিসেবে আমার কর্তব্য সম্পর্কে অবগত ছিলাম না। সবসময় একটু স্বার্থপরই ছিলাম বটে। সন্তানের কর্তব্য সম্পর্কে অবগত হইতে আমার কয়েক যুগ লেগেছিল। আচ্ছা যদি তাহারে ভবিষ্যতে সামনা সামনি দেখিবার পর্যন্ত আমার এই দুই চক্ষু বন্ধ করিয়া থাকিতে পারিতাম—তাহলে এ হৃদয়ের বর্তমান জ্বালা একটুখানি কমিত। শুধু কাটিত সময় মোর বানাইতে স্বপ্নের খেলাঘর—যে খেলা ঘরে আমি হইতাম রাজা, আর প্রচেতা রাণী। করিতাম রাম রাজত্ব, বিনে বনবাস ও রাবণ—নিশ্চয়। গড়িতাম সুখ-রাজ্য—নিয়ে প্রচেতার হাসি। কিন্তু যখনি এই দুচোখ মেলি, দেখি যাহা কিছু স্রষ্টার সৃষ্টি, বিনে সখির ছায়া। না পারিল করিতে মোরে আকৃষ্ট, প্রকৃতি ভুলিয়া যেন তাহার মায়া। স্রষ্টা এই জগতে, আপনমনে সৃষ্টির কতই না কিছু সৃষ্টি করিয়াছে—কিন্তু সৃষ্টির মায়ার চাবিটি দিয়েছে কেন মোর প্রচেতার হাতে? চোখের সামনে স্রষ্টার সৃষ্টিতে যদি তাহারে না দেখি তাহলে স্রষ্টার সৃষ্টি কেমন মলিন দেখাইত। যেমন দেখাইত স্বর্ণ-ভর্তি সিন্দুককে। মূল্যবান জিনিসের কারণে সিন্দুকের ভিতর দেখিতে যতই সুন্দর হোক না কেন বন্ধ সিন্দুককে সব সময়ই মলিন দেখায়। তেমনি সখী বিনে এই প্রকৃতি যেন তালাবদ্ধ এক সিন্দুক।

জ্বরের দ্বিতীয় দিন অতিবাহিত করিয়াছি। তৃতীয় দিন জ্বরের ব্যথাটি যেন একটুখানি বাড়িল। মনে হইতেছিল এই জ্বর আর শীঘ্রই থামবে না। তৃতীয় দিন অপরাহ্নকালীন এক মূহূর্তে মনে হইল—আর বুঝি বাঁচিব না। আমার জীবনে সেই দিন প্রথম মৃত্যুর ভয় লেগেছিল। আমার বয়সে ছেলেমেয়েদের সাধারণত মৃত্যুর ভয় থাকে না—তাই তো তারা বহু অসম্ভবকে সম্ভব করিতে পারে। কিন্তু সে দিন আমার হৃদয়ে মৃত্যুর শঙ্কা-বোধ করিয়াছি—তা প্রচেতারই জন্য। মৃত্যুর ভয়ে ভীত হইয়া ভাবিলাম—আহা, প্রচেতাকে বুঝি না দেখিয়া এই অধমের মৃত্যুস্বাদ একাকী গ্রহণ করিতে হইবে? এই ভাবনায় দুই চোখের অশ্রু অঝোর ধারায় বাহিত হতে লাগিল।

অশ্রু-সিক্ত পরানে তখন আরেকটি ভাবনার উদ্ভব হইল—আমি বিনে প্রচেতাকে রক্ষে কে করিবে? আপন মনকে শক্ত করিবার বহু চেষ্টা করিতেছিলাম—বাঁচতে যে আমাকে হবেই। এই পণ করিলাম। কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকা যে কত কঠিন সেটা একজন বৃদ্ধই বলিতে পারিবে। আমার ছোট্ট জীবনটি এগিয়ে নিতে আমার কতই না কষ্ট ভোগ করিতে হইতেছে। তাহলে বৃদ্ধরা কিভাবে এতদিন বাঁচিয়া আছে—আবার কোন সুখের লাগি তাহার বাঁচিয়া আছে। সবি আসলে মানুষের ইচ্ছাশক্তি। আমার বৈকুণ্ঠ-বাসী ঠাকুর দাদার একদা ভীষণ এক রোগ হইয়াছিল। ঠিক কী রোগ হইয়াছিল তাহা স্মরণাতীত। তবে ঐ রোগে ঠাকুর দাদার শরীর ভীষণ দুর্বল হইয়া পড়িয়াছিল। রোগে উনার শরীর ভীষণ দুর্বল হইয়া পড়িল, তাই ডাক্তার মশাই বলিলেন—ঠাকুর দাদাকে মাংস ও ডিম বেশি করিয়া খাইতে। ঠাকুর দাদা খুব ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন—তার জীবনে কোনদিন মাংস ও ডিম ছুঁইয়েও দেখেনি। কিন্তু ডাক্তারের পরামর্শে উনার জীবনের সময় বর্ধিত করিবার জন্য তিনি সঙ্গে সঙ্গে মাংস ও ডিম খেতে রাজী হইয়া যান। মানুষের জীবনের এত কষ্টের মাঝেও তাদের বাঁচার প্রবল ইচ্ছাশক্তির কারণ স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার কাছে ধাঁধার মতন লাগে। ধরাতে মানুষের জীবনটি জেলখানার মত—এখানে মানুষের জন্ম হয় তাহার পাপকর্মের ফল ভোগ করার জন্য এবং পুণ্যকর্ম করিয়া সৃষ্টিকর্তার সহিত মিলন হইবার জন্য। তাহলে যত কম সময় ধরাতে থাকা যায় তত ভালো হবার কথা—তাই না? তাহলে কেন মানুষের এত মৃত্যু-ভয়? এই বোধগম্য মোর এখনো হইল না। হয়তো সবাই আমার মত ধরাতে প্রিয়জনের সন্ধান পাইল—এবং সেই প্রিয়জন ছাড়িয়া ইহলোক ত্যাগ করিতে চায় না।

মানুষের জীবন আসলে বড়ই অদ্ভুত, মানুষের বাঁচার ইচ্ছার সহিত সমান কোন ইচ্ছা এই ধরাতে নাই। বাঁচার মত সমান ইচ্ছা যদি মানুষ কোন একটি ভালো কাজে লাগাইত। তাহলে এই পৃথিবী একদিন স্বর্গরাজ্যে পরিণত হইত। কিছুক্ষণ পর মাতা-শ্রী তার জোর গলায় কী জানি বলিতে বলিতে আমার কাছে আসিলেন। শুনতে পারতেছি না বলে তিনি আমার বিছানার এক কোণাতে বসিয়া বলিলেন যে, আমেরিকা থেকে পিতামশাই কিছুক্ষণ আগে ফোন করিয়াছে এবং তিনি আদেশ দিয়েছিলেন যে, আমাদের সবাইকে শীঘ্রই গ্রামের বাড়ি ছাড়িয়া শহরে জেঠামশাইদের পাশের বাসাতে স্থানান্তরিত হইতে হইবে। কেন পিতাশ্রীর হঠাৎ এই ইচ্ছার উদয় হইল, সেটা তখনি বুঝিতে পারিলাম না—কিন্তু এই সংবাদে যে আমার জ্বর হঠাৎ পালাইতেছিল তাহা নিশ্চিত বুঝিতে পারিয়াছিলাম। শহরে জেঠা মশাইদের পাড়াতেই প্রচেতাদের নিবাস তাহলে এখন থেকে আমি প্রতিদিন তাহাকে একটি বার হইলেও দেখিবার সুযোগ পাইব। এই ভাবনাতে শরীরের ভিতর যেন বসন্তের খোলা হাওয়া বইতেছিল। আমার দুই চোখ হঠাৎ খুলিয়া এইদিক ওইদিক তাকাইতেছিল। এত আনন্দে কি আর নয়ন বন্ধ থাকে? এই আনন্দ সেই কোটি টাকার লটারী জিতার মহা-আনন্দ, যাহার দরুণ সাধারণ মানুষেরা দিনের পর দিন ঘুমাইতে পারে না। আমি তো সেখানে এক তুচ্ছ বালক, যে কিছুদিন আগেও একটি ক্যান্ডির লোভে কত কি না করিয়াছে।

পরের দিন প্রাতঃকালে ঘুম ভাঙ্গার পর আমি উঠিয়া বসিলাম। আমার শরীরে এখন জ্বর প্রায় নাই বললেই চলে—কিন্তু শরীর এখনো ঠসঠসে হীনবল। ঘর থেকে বেরিয়ে গ্রামের মেঠো রাস্তায় একটু হাঁটিতে বের হলাম। মনে হইতেছে বহুদিন পর প্রকৃতির স্পর্শ পাইলাম। মুহূর্তে প্রকৃতির ছোঁয়ায় এই শরীরটি জুড়াইয়া গেল। কিন্তু এখন শত ভাবনা মনে—চলিতেছে সমান সমানে। পিতাশ্রী গতকাল মাকে কহিলেন, আমাদের পরিবারের সবার জন্য তিনি কয়েক-বছর আগে আমেরিকাতে স্থানান্তরিত হইবার জন্য যুক্তরাষ্টের কর্তৃপক্ষের নিকট যে দরখাস্তগুলো করিয়াছিলেন তাহার কার্যক্রম প্রায় শেষ মুহূর্তে এসে পৌঁছল। পিতার তখনকার ধারণা অনুযায়ী আমরা সবাই আগামী এক বছরের মধ্যে আমেরিকাতে এসে পৌঁছতে পারিব। মনে পড়িল—আমার এখনো মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়া হয়নি। তাছাড়া এক বছর পরে আমার ও জ্যেষ্ঠ সহোদরা মিলির একসাথে মাধ্যমিক পরীক্ষা। পিতাশ্রী ফোনে মাকে বুঝাইলেন যে, আমাদের পড়াশুনা করানোর জন্য স্কুলের শিক্ষকদের শহরে বাসায় অর্থ দিয়ে আনা হইবে। আমাদের গ্রামের অনেক শিক্ষক তখন বসুরহাট শহরের আশেপাশে বসবাস করিত। তাই পিতার ধারণা অনুযায়ী মাধ্যমিক পরীক্ষা পর্যন্ত আমাদের পড়াশুনাতে কোন সমস্যা হইবার কথা নয়—তদ্ব্যতীত মাধ্যমিক পরীক্ষা-কেন্দ্র শহরেই অনুষ্ঠিত হইবে।

কিছুদূর হাটিবার পর আমি রাস্তার পাশে একটি আমগাছের তলায় একটু বসিলাম। এবার মনে পড়িল—প্রচেতার কথা। এক বছরের মধ্যে যদি আমেরিকাতে চলে যাই, তাহলে আমার আর প্রচেতার কী হইবে? সে তো এখনো জানে না আমি তাহাকে কত প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। ভীষণ চিন্তায় পড়িলাম। বুকে হঠাৎ একটি চমকানো ব্যথা অনুভব করিলাম। গ্রামের সকলের মুখে মুখে পূর্বে বহুবার শুনিয়াছি—আমেরিকা হচ্ছে পৃথিবীর স্বর্গরাজ্য, যেখানে শুধু সুখ আর সুখ। কিন্তু আমার সুখ? সে তো প্রচেতায়—এক দ্বন্দ্বে পড়িলাম। একদিকে অজানা এক স্বর্গ-রাজ্য আমেরিকা, অন্যদিকে প্রচেতা—যে আমার স্বর্গের ছোঁয়া। ভাবিলাম—তাহারে বিনে আমি ঐ স্বর্গ-রাজ্য চাহিনে, শুধু ইচ্ছে করিতে বাস তাহার হৃদয়রাজ্যে। মনে মনে ঠিক করিলাম, শহরে স্থানান্তরিত হইবার পর পিতাশ্রীকে ফোনে বুঝাইয়া বলিব যে আমি আমেরিকাতে যাইব না। কিন্তু সেটা এক্ষণে বলা যাইবে না। কারণ এতে হিতে বিপরীত হইতে পারে। এখন কোনমতে একবার শহরে স্থানান্তরিত হই, বাকীটা পরে দেখা যাইবে—এই ভাবিয়া মনকে শান্ত করিলাম।

কিছুদিনের মধ্যে বাড়ীর সব জিনিসপত্র রিক্সায় নিয়ে বসুরহাটে এসে আমরা সবাই পৌঁছলাম। আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে বেশি জিনিসপত্র আনিতে হয়নি কারণ বাড়িতে ঠাকুরমা থাকিবেন—তাহাকে দেখ-ভাল করিবার জন্য গ্রামের একজন মহিলাকেও দায়িত্ব দেওয়া হইয়াছে। শহরে যেদিন আমরা সবাই স্থানান্তরিত হইয়া আসিলাম—আর সেই দিন বুঝিতে পারিলাম যে আমার প্রেমে দেবতাদের প্রত্যক্ষ আশীর্বাদ আছে। তা না হইলে হঠাৎ পিতাই বা কেন আমাদের শহরে স্থানান্তরিত হইবার জন্য আদেশ করিলেন। আমার জন্য এ যেন মেঘ না চাইতে হঠাৎ জলের সন্ধান। এখন প্রতিদিন ইচ্ছে করিলে অন্তত একবার প্রচেতাকে দেখিতে পারিব—পারিব ভাসিতে তাহার রূপসাগরে।

প্রায় এক সপ্তাহ গত হইয়া গেল আমরা শহরে স্থানান্তরিত হইয়া আসিলাম—কিন্তু প্রচেতাকে একটি বারও দেখিলাম না। প্রচেতাদের বাসার সম্মুখভাগ দিয়া বহুবার হাঁটিয়া যাইলাম কিন্তু প্রত্যেকবার দেখিলাম তাহাদের বাসার দরজাতে তালা ঝোলানো। মনের মধ্যে এক অজানা ভয় এসে বাসা বাঁধল। প্রচেতারা কি এই শহর থেকে কোথাও স্থানান্তরিত হইয়া গেছে? যদি সত্যি সত্যি তাহারা এই শহর থেকে চলিয়া যায় তাহলে তাহাদের বালক আমি খুঁজিয়া পাইবো কি করে? প্রচেতাকে কি আমি চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেললাম? ভাবতেই চোখে জল আসিল। কাউকে যে তাদের কথা জিজ্ঞেস করিব সে জন্য কোন লোকও খুঁজে পাইলাম না। শহরে আমি নতুন—এখনো পাড়ার কাউকে চিনি না। তাই ভরসা ছিল আমার সহজ-সরল জেঠতুতো ভাই জীকু কিন্তু তাকে জিজ্ঞেস করিলে সেও কিছু বলিতে পারেনি।

মনটা আমার ভীষণ খারাপ হইয়া গেল। যাহার জন্য অতিআগ্রহে আমার প্রাণের গ্রাম ছাড়িয়া আসিলাম—আজ তাহার দেখা নাই। সামনের বছরে আমার মাধ্যমিক পরীক্ষা—কিন্তু পড়াশুনাতে একদম কোন মনোযোগ আমার নাই। মনে হইতেছিল যদি প্রচেতারে না পাই তাহলে পড়াশুনা দিয়া কোন সুখের সন্ধান করিতে যাইব। বিকেল বেলায় আমাদের বাসার একটি কক্ষে বসিয়া পড়াশুনার অভিনয় করিতেছিলাম। জীকু আমাকে ডাক দিয়া কহিল—‘রুদ্র, চল যাই বাসার সামনে ক্রিকেট খেলব।’ আমি সাথে সাথে জীকুর কথায় রাজী হইয়া গেলাম। ভাবিলাম—বাসার ভিতর মন খারাপ করিয়া বসিয়া পড়াশুনা করার অভিনয়ের চেয়ে খেলাধুলা করাই শ্রেয়। হয়তো মনটি একটু ভালো হইতে পারে।

আমাদের বাসার সম্মুখে মানুষ যে রাস্তা দিয়ে পায়ে হেঁটে চলাচল করে সে রাস্তার উপর পাড়ার ছেলেরা খেলাধুলা করিত। ক্রিকেট ব্যাট ও বল হাতে জীকুকে দেখিয়া হঠাৎ আমার একটি বুদ্ধি মাথায় ভর করিল। ‘চল জীকু, ঐ বাসার সামনে আজ ক্রিকেট খেলি—ঐ জায়গা একটু প্রশস্ত মনে হচ্ছে।’ এই বলে প্রচেতাদের বাসার সামনের জায়গাটি জীকুকে দেখিয়ে দিলাম। জীকুও সঙ্গে সঙ্গে আমার কথায় রাজী হইয়া যায়। এরপর আমরা প্রচেতাদের বাসার সম্মুখভাগে কিছুক্ষণ ক্রিকেট খেলিলাম। কিছুক্ষণ পর পাড়ার এক মাসীকে উনার বাসা থেকে বাহির হইতে দেখিলাম। উনি আমাদের ক্রিকেট খেলা দেখিতে পাইয়া কোন এক কারণে একটু থামিল। আমি বুকে সাহস জমাইয়া উনাকে জিজ্ঞেস করিলাম—‘মাসি, এ বাসাতে কারা থাকে। এদের কে যে দেখছি না।’ পাড়া মাসি তখন কহিলেন—‘ও, এটা কান্তাদের বাসা—এরা সবাই তাদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেল আজ কয়েকদিন হবে, তবে শীঘ্রই চলে আসবে।’ পাড়ার মাসির কথাটা শুনে যেন অভাগা বুকে প্রাণের সঞ্চার হইল।

চলবে...

এসইউ/এমকেএইচ