মায়াবতী : পর্ব ০৪

মোহিত কামাল মোহিত কামাল , কথাসাহিত্যিক, মনোচিকিৎসক
প্রকাশিত: ০৫:২৮ পিএম, ১৪ এপ্রিল ২০২১

কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের মায়াবতী বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় মনোবৈজ্ঞানিক উপন্যাস। সাহিত্যের শব্দবিন্যাসে তিনি ব্যবহার করেছেন মনস্তত্ত্ব, সমাজের আড়ালের চিত্র। মা প্রত্যক্ষ করেছেন, মেয়েরা নানাভাবে উৎপীড়ন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, সহজে মুগ্ধ হয়ে অবিশ্বাস্য পাতানো ফাঁদে পা দেয়। মায়ের একান্ত চাওয়া মেয়ে ক্যারিয়ার গড়ে তুলুক। বিধিনিষেধ আরোপ করেন মা। মেয়ে তখন মনে করে, মা স্বাধীনতা দিতে চায় না, বিশ্বাস করে না তাকে। মায়ের অবস্থানে মা ভাবছেন তিনি ঠিক। মেয়ের অবস্থানে মেয়ে ভাবছে, সে ঠিক। মায়ের ‘ঠিক’ এবং মেয়ের ‘ঠিক’র মাঝে সংঘাত বাধে। সংঘাত থেকে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়, ভুল করে বসে মেয়ে রিয়া। পালিয়ে যায় ঘর থেকে। এই ‘ভুল’ই হচ্ছে উপন্যাসের মূলধারা, মূলস্রোত। মায়াবতী পড়ে চিন্তনের বুননে ইতিবাচক গিঁট দেয়ার কৌশল শেখার আলোয় পাঠক-মন আলোকিত হবে। জানা যাবে টিনএজ সমস্যা মোকাবিলার কৌশল। জাগো নিউজের পাঠকের জন্য ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে সাড়া জাগানো উপন্যাসটি।

চার.
পুলিশের অ্যাডিশনাল কমিশনার ফারুক আহমেদ ফোন করেছেন।
রেজা ফোন রিসিভ করে। তার মুখে হাসি ফোটে।
মামার মুখে হাসি দেখে আনন্দে লাফিয়ে উঠল মুনা।
রেজা বলল, ফোন কর। রিয়ার মা-বাবাকে জানিয়ে দে পুলিশ উদ্ধার করেছে রিয়াকে।
রিয়া ভালো আছে তো মামা?
অবশ্যই ভালো আছে। আমরা সবাই থানা থেকে ওকে রিসিভ করব।
মামার আশ্বাস শুনে মুনার ভয় কেটে গেল। ছুটে গেল সে টেলিফোন সেটের কাছে।
রিং করল রিয়াদের বাসায়।

অনেকক্ষণ ফোন বাজতে থাকে। একসময় লাইন কেটে যায়। আবার ডায়াল করে সে। রিংটোন শোনা যাচ্ছে।
হ্যালো কে বলছেন? রিয়াদের বাসায় ফোন রিসিভ করে কুসুমকলি।
তুই কি কুসুম? চিৎকার করে ওঠে মুনা।
হ্যাঁ। কুসুম বলছি।
আমি মুনা। আন্টিকে দে। রিয়াকে পাওয়া গেছে। পুলিশ উদ্ধার করেছে।
পাওয়া গেছে! আনন্দে লাফিয়ে ওঠে কুসুম।
হ্যাঁ। হ্যাঁ। রেজা মামার এক বন্ধু, পুলিশ অফিসার উদ্ধার করেছেন। আমরা থানায় যাব। ওকে নিয়ে আসব।

কুসুমকলি কাঁপতে শুরু করে। আনন্দ আর ভয় একসঙ্গে কাজ করে ওর মনে। কাঁপতে কাঁপতে আন্টির রুমে গেল সে। ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছে তাকে। ঘুমঘুম চোখে শুয়ে আছেন তিনি। পুরো ঘুমিয়ে পড়েননি। ঘরে এসি চলছে। তবুও কপাল ভেজা। মনে হচ্ছে ঘাম জমে আছে কপালে।
আন্টি। ওঠেন। রিয়াকে আনতে যাব। রিয়াকে পাওয়া গেছে।
রাহেলা চৌধুরি সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে তাকালেন। কুসুমকলির দিকে মরা চোখে তাকিয়ে থাকেন।
ওঠেন। আবার বলল কুসুম। ওঠেন আন্টি। রিয়াকে আনতে যাব, আঙ্কেলকে ফোন করেন।
রাহেলা চৌধুরির মুখে কথা ফুটল না। চাউনিতে পরিবর্তন নেই। মনে হচ্ছে তিনি শোনেননি, আনন্দসংবাদ তার কানেই ঢোকেনি। তাকে দেখে মনে হচ্ছে রিয়ার কিছুই হয়নি। রিয়া হারায়নি। কোথাও রিয়া চলে যায়নি। প্রতিদিনকার মতো দিন চলছে। কাজের বুয়া রান্নাঘরে কাজ করছে। টুকটাক শব্দ ভেসে আসছে রান্নাঘর থেকে। দুধওয়ালা বেল টিপেছে। দুধ দিয়ে গেছে। দরজার ফাঁক দিয়ে সাঁই করে ঢুকে গেছে ডেইলি পত্রিকা―একটা বাংলা, একটা ইংরেজি। রিয়ার আব্বু ইংরেজি পেপার পড়েন। রিয়া পড়ে বাংলা। ময়লা নিতে এসেছে ফ্ল্যাটের এজেন্ট। মনে হচ্ছে সাহেব অফিসে গেছেন। মেয়েটা কলেজে গেছে। মধ্যরাতে সাহেব বাসায় ফিরবেন। বিকেলে ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরবে। এমনিভাবে চলছে দিন―এমনই মনে হচ্ছে রাহেলা চৌধুরিকে দেখে।
আন্টি! শুনছেন আমার কথা। ওঠেন রিয়াকে আনতে যাব। কুসুমকলি অস্থির হয়ে একা একা কথা বলে যাচ্ছে। রাহেলা চৌধুরি কোনো জবাব দিচ্ছেন না। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই তাঁর আচরণে, প্রকাশে। একবার দেহ ঘুরিয়ে পাশ ফিরে শুলেন তিনি।

কুসুমকলি অস্থির হয়ে গেল। কী করবে বুঝতে পরছে না সে।
এবার টেলিফোন করে মুনাকে।
মুনা, আন্টি কথা বলছেন না। চুপচাপ হয়ে গেছেন। কী করব আমি? আঙ্কেলও বাসায় নেই।
রিয়াকে পাওয়ার সংবাদ শুনে খুশি হননি?
আরে না। নির্বাক হয়ে গেছেন তিনি। জড় পদার্থের মতো হয়ে গেছেন।
রেজা মামার সঙ্গে থানায় যাচ্ছি আমি। আঙ্কেলকে খবর দে। রিয়াকে নিয়ে বাসায় ফিরছি আমরা। সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই আন্টির পাশে থাক। মুনা ঝটপট জবাব দিয়ে ফোন রেখে দেয়।

পাঁচ.
কালো প্রাডো গাড়ি ছুটে চলেছে গুলশান থানার দিকে। গুলশান থানায় আছে রিয়া।
মুনা বসে আছে রেজা মামার পাশে। মামা ড্রাইভ করছে।
মুনা তাকাল মামার মুখের দিকে। মামার মুখে ভেসে আছে রহস্যময়তা। যেন মোনালিসার অভিব্যক্তির চেয়েও বেশি রহস্যময় এ প্রচ্ছায়া।
মোনালিসার চাপা হাসিটা স্টাডি করা হয়েছে। ডাচ ইমোশন শনাক্ত করার প্রোগ্রামে বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে মোনালিসা ৮৩ শতাংশ সুখী, ৯ শতাংশ হতাশ, ৬ শতাংশ ভীত এবং ২ শতাংশ রাগান্বিত। ম্যাগাজিনে এসব কথা পড়েছে মুনা। আর এ মুহূর্তে মামাকে দেখে ওর মনে হচ্ছে একশ ভাগ সুখী তিনি। ভাবতে গিয়ে কষ্ট জাগে মুনার মনে। কষ্টের সঙ্গে মিশে গেছে রাগ। রাগ থেকে ঈর্ষা। রিয়ার জন্য ঈর্ষা। মামা কি রিয়ার প্রতি বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না? ভাবতে গিয়ে লজ্জা পেল ও। বান্ধবীর বিপদে পাশে থাকতে হবে। এটাই হেল্প করার উপযুক্ত সময়। এ সময় তার প্রিয় মামাও ভূমিকা রাখছে। এটা তো তারই আনন্দ। চিন্তাটা স্বস্তির ঢেউ তুলল। স্বস্তির ঢেউ বেশিক্ষণ টিকল না। মামার চোখের দিকে ফের তাকাল মুনা। সঙ্গে সঙ্গে চোখের সামনে আবার ভেসে উঠল নিজেদের বসার ঘরে দেয়ালে সাঁটানো মোনালিসার ছবি। ইতালিয়ান বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মোনালিসার চোখ ও মুখের কাছে ধোঁয়াটে আবহ তৈরি করতে অস্পষ্ট মাইক্রোস্কোপিক ডট ব্যবহার করেছেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি।

এ মুহূর্তে মুনার মনে হচ্ছে, রিয়াও মামার মুখের ব্যঞ্জনাময় স্ফুরণের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে অস্পষ্ট মাইক্রোস্কোপিক ডট। অদৃশ্য আলো মৃদু তরঙ্গ তুলে ছুটোছুটি করছে। এ আলোকতরঙ্গ যেন ভিঞ্চি কোডের মতো মামার মুখের ত্বক থেকে গোপন কোনো মমতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গোপন বার্তা বইয়ে দিচ্ছে।
বার বার মনে ঢুকতে লাগল নারীর মুখের সঙ্গে পুরুষের মুখের তুলনা। তুলনা করা চলে না। এমন তুলনা করতে গিয়ে জড়তা পেয়ে বসছে, মুনা বুঝতে পারে।
সামনে তাকিয়ে থাকে সে। বাঁ পাশ দিয়ে দুরন্ত গতিতে ফেলে এল সংসদ ভবন। আচমকা গাড়ি ব্রেক কষতে হলো।
স্ট্রিট ব্রেকারের সামনে এসে থেমে গেল গাড়ি। বাস্তবে ফিরে এল মুনা। রেজা মামার মুখে কোনো কথা নেই। নিজেকে সামলে নিয়ে আবার ড্রাইভ করতে শুরু করেছে।

রেজা মামা পরেছে ক্যাটস আইয়ের রিংকেল ফ্রি লিনেন কাপড়ের পাঞ্জাবি। পুরো পাঞ্জাবিতে রয়েছে এক্সক্লুসিভ এমব্রয়ডারির কারুকাজ। অপূর্ব লাগছে। এমন লাগছে কেন মামাকে বুঝতে পারছে না মুনা। মামা তো মামাই। আপন মামা। আপন মামার জন্য শ্রদ্ধা থাকার কথা। মুনার মনে শুধু শ্রদ্ধাই নেই, শ্রদ্ধার বাইরে অন্য কোনো অনুভূতিও কাজ করছে। ব্যাখ্যা জানা নেই মুনার।
মুনার হ্যান্ডসেট বেজে উঠল।
কাঁধে ঝোলানো ক্যাজুয়াল ব্যাগের ভেতর থেকে মোবাইল সেটটা বের করে ডিসপ্লেতে চোখ বোলায় ও। আননোন নম্বর। তবু ইয়েস বাটনে টিপ দিয়ে সেটটি কানের কাছে ধরে মুনা।
মুনা, আমি রিয়া। কথা শেষ করতে পারল না সে। ভেতর থেকে কান্না ধেয়ে এল। কান্নার শব্দ মুনার কানে ঢোকায় ব্রেনের কোষে কোষে পৌঁছে গেছে রিয়ার কষ্টের অনুভূতি। কোনো জবাব দিতে পারল না। সে-ও কেঁদে উঠল। বুঝল কান্না ছোঁয়াচে। কান্না জাগায় কান্না। একজনের কান্না আরেকজনের মনে সঞ্চারিত হয়। একজনের দুঃখে আরেকজন দুঃখী হয়। কাঁদতে থাকে এ মুহূর্তে দুজনেই।
কান্নাজড়ানো স্বরে মুনা বলল, আমরা এসে গেছি। একটু ধৈর্য ধর।
রিয়া লাইন কেটে দেয়। গাড়ি ছুটে চলেছে উড়ন্ত গতিতে। গুলশান থানার উদ্দেশে।

রেজা গুলশান থানা চেনে। চেনা পথে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ রেখে এগিয়ে যাচ্ছে। সামনে জ্যাম। মহাখালী ফ্লাইওভারে দেখা যাচ্ছে সারি সারি গাড়ি। গাড়ির বহর জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত বিস্তৃত। এ সিগন্যালে লাল বাতি অফ হয়ে সবুজ বাতি জ্বলছে। সিগন্যাল ক্লিয়ার। তবুও ট্র্যাফিক সার্জেন্ট ছাড় দিচ্ছে না। হাত উঁচিয়ে থামিয়ে রেখেছে গাড়ি। অস্থিরতা বেড়ে গেল মুনার। ছটফট করছে। রিয়ার কান্না শুনেছে। তাড়াতাড়ি রিয়ার কাছে পৌঁছানো দরকার। এগোনো যাচ্ছে না। আবার মামার দিকে তাকাল রিয়া। মামা অবিচল। স্থির। আশ্চর্য! এত স্থির থাকে কী করে মানুষ! কোনো দিকে তাকাচ্ছে না। সোজা তাকিয়ে আছে সামনে। যেন জগতে কিছুই ঘটেনি। নির্লিপ্ত তিনি।

দারুণ লাগছে মামাকে। এ ম্যানলি ভাবটা গোপনে টানে মুনাকে। কেন টানে জানে না ও। মামার সান্নিধ্য বেশি ভালো লাগে। মামাকে শ্রদ্ধা করে। ভালোবাসে। এ ভালোবাসা হচ্ছে মামার জন্য ভালোবাসা। টান আসে কেন? বোঝে না মুনা। টানের অর্থই বা কী, জানে না ও। একদিকে রিয়ার জন্য ছটফট করছে। আবার মামার সান্নিধ্য ভালো লাগছে। একবার মনে হচ্ছে গাড়ি থেমে থাকুক। মামার এ রূপটি দেখার সুযোগ হারাতে চায় না ও। একই সঙ্গে রিয়ার কাছেও ছুটে যেতে ইচ্ছা করছে। মনের এ কোন দ্বৈতখেলা! কোন গোপন টানে ঘটে যায় এমনি ধারা!

নিজের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগে মিনারেল ওয়াটারের বোতল আছে। ব্যাগ থেকে বোতলটা বের করে ও। হালকা ঢোকে গলা ভিজিয়ে নেয়। স্বস্তি লাগছে এখন। স্বস্তি নিয়ে মামার দিকে তাকিয়ে মুনা বলল, এক ঢোক চলবে, মামা?

রেজা বাঁ হাত বাড়িয়ে মিনারেল পানির বোতলটা নেয়। মুখে কোনো শব্দ উচ্চারণ না-করে এক ঢোকে গলা ভিজিয়ে নেয়। প্রতিক্রিয়াহীন মুখে স্বস্তির চিহ্ন ভেসে ওঠে। সহজ চিকিৎসা। সহজে অস্থিরতা সামাল দেওয়া যাচ্ছে। মুনা গাড়ির অডিয়ো সেটের দিকে হাত বাড়ায়। সেটের পাশে আছে সিডি ফোল্ডার। ফোল্ডারের গায়ে লেখা আছে গানের কলি। রবীন্দ্রসংগীত। প্রথমেই আছে পাপিয়া সারোয়ারের গান। আউট বাটনে চাপ দিয়ে একবার সিডিটির পজিশন দেখে নেয় ও। আবার চাপ দিয়ে ঢুকিয়ে দিল ভেতরে। এবার প্লে বাটনে চাপ দিয়ে অন করে দেয় প্লেয়ার।

গানের সুর বেজে ওঠে। সুর শুনেই বুঝতে পারে গানের কলি। একটু পরই বেজে ওঠে ‘যে ছিল আমার স্বপনচারিণী...’
অস্থির সময়ে স্বস্তির গান। ভালো লাগে। চোখ বুজে শোনে রেজা। চোখ বুজে শোনে মুনা। ভালো লাগছে। ভীষণ ভালো লাগছে।
গান থেমে যাওয়ার পর চোখ খুলে দুজনে প্রায় একসঙ্গে তাকাল সামনে। আচমকা গাড়িবহরের হর্ন বেজে ওঠে। জ্যাম খুলে গেছে। গাড়ি চলতে শুরু করেছে।

নিঃশব্দে এগোতে থাকে কালো প্রাডো।

চলবে...

এসইউ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]