জাপানি কবি শুনতারো তানিকাওয়ার কবিতা: প্রকৃতির উপাদানই মুখ্য

সাহিত্য ডেস্ক
সাহিত্য ডেস্ক সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৫২ পিএম, ১২ মে ২০২৬
ফাইল ছবি

মাসুমুর রহমান মাসুদ

জাপানের কবি শুনতারো তানিকাওয়ার (১৯৩১-২০২৪) কবিতায় প্রকৃতির উপাদান মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। তার ‘গাছ’ কবিতাসহ অনেক কবিতায় প্রকৃতির উপাদানের উপস্থিতির পাশাপাশি সর্বপ্রাণবাদের প্রভাব বিশেষ লক্ষণীয়। মানুষের গাছে পরিণত হওয়া, ডালপালা গজানো; এ যেন এক কাল্পনিক কাহিনি। তবে এতে আছে বৃক্ষের মতো উদার হয়ে ওঠার অসম্ভব গভীর জীবনবোধ। তার এ কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় মোতাহের হোসেন চৌধুরীর ‘জীবন ও বৃক্ষ’ প্রবন্ধের মূল জীবনবোধের কথা, যেখানে বৃক্ষের মতো নিঃস্বার্থ, নীরব সাধক এবং পরোপকারী হওয়ার বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। লেখক মানবজীবনকে বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করে দেখিয়েছেন যে, কীভাবে সদ্গুণ ও সেবার মাধ্যমে জীবন সার্থক, উন্নত ও পরম সুন্দর করা যায়। এটি মূলত মানবতাবাদ, ত্যাগ ও শান্তিবাদী জীবন দর্শনের প্রতিফলন।

একইভাবে শুনতারো তানিকাওয়ার কবিতায় দেখি: ‘খুব শীঘ্রই আমি গাছ হয়ে যাচ্ছি/ আমার মধ্য আঙুলের ডগাটা কেমন চিনচিন করছে/ যেন সেখান থেকে গজাচ্ছে কচি সবুজ পাতা/ দেখছি—অনামিকা আর তর্জনি থেকেও উঁকি দিচ্ছে কিশলয়।/ আমার দুহাত ডালপালা হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে আকাশে/ শার্টের নিচে আমার শরীরটা হয়ে পড়েছে খসখসে গুঁড়ি/ পায়ের পাতাগুলো শেকড় হয়ে ঢুকে যাচ্ছে মাটিতে/ আর তলপেট অবধি ক্রমশ বেয়ে উঠছে উষ্ণ বুদবুদ।’ (গাছ, অনুবাদ মালেক মুস্তাকিম)

শুনতারো তানিকাওয়া আধুনিক জাপানি সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় কবি। তার কবিতা সহজবোধ্যতা, গভীর জীবনদর্শন এবং আধুনিক মনস্তত্ত্বের সমন্বয়ে অনন্য সাধারণ। তার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অত্যন্ত সহজ এবং সাধারণ ভাষায় গভীর সত্য উপস্থাপন করা। তিনি মনে করতেন ‘কবিতাকে কেবল পণ্ডিতদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের উপযোগী হতে হবে’। তার কবিতায় শৈশব স্মৃতি, মহাবিশ্ব, নিঃসঙ্গতা, প্রেম এবং মৃত্যু—সব কিছুই সাবলীলভাবে উঠে এসেছে। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) যেখানে মুক্তি বা মোক্ষ চেয়েছিলেন, জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) সেখানে চেয়েছিলেন পুনরাগমন। তিনি দেবতা হতে চাননি; তিনি চেয়েছেন শালিক, ঘাস, শঙ্খচিল কিংবা হাঁস হয়ে এই বাংলার বুকেই ফিরে আসতে।

অপরদিকে জাপানের কবি শুনতারো তানিকাওয়া চেয়েছেন গাছ হতে, আদিম অন্ধকারে ডুব দিয়ে হারিয়ে যেতে। বেড়ে ওঠার বৃত্তায়নে শিশু থেকে যেতে চেয়েছেন কখনো। তার কবিতায় জল প্রায়ই পরিবর্তন এবং প্রবাহের প্রতীক হিসেবে ধরা দেয়। নদী বা সমুদ্রের ঢেউয়ের মাধ্যমে তিনি সময়ের নিরন্তর বয়ে চলাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। জলের স্বচ্ছতা তার কবিতায় সত্য ও সরলতার প্রতীক হিসেবে কাজ করে: ‘এমন নয় যে মানুষ শুধু সমুদ্রকে দেখে—/ বরং সমুদ্রই তার উজ্জ্বল চোখে মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকে/ সময়ের সেই আদি লগ্ন থেকে আজও তার দৃষ্টি অবিচল।/ এমন নয় যে মানুষ শুধু সমুদ্রের গর্জন শোনে—/ তটরেখার নিচে পড়ে থাকা অগুনতি ঝিনুকের/ কান পেতে সমুদ্রই মানুষের কথা শোনে।’ (সমুদ্রের রূপক, অনুবাদ মালেক মুস্তাকিম)

এভাবে সমুদ্র যখন কান পেতে মানুষের কথা শোনে; তখন আমাদের ‘সর্বপ্রাণবাদ’র কথা স্মরণ হয়। বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম (১৯২৫-২০১৪) তার ‘দর্শনকোষ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘ইট-পাথর লতাপাতা, ফুল, আকাশ বাতাস, গ্রহ-নক্ষত্র, বিভিন্ন বন্য অথবা গৃহপালিত প্রাণী শরীরে আশ্রয় নিতে পারে আত্মা। এ কারণেই এই তত্ত্ব সর্বপ্রাণবাদ নামে পরিচিত। অর্থাৎ সবকিছুর ভেতর প্রাণের অস্তিত্বের বিশ্বাসই সর্বপ্রাণবাদের মূল কথা।’ এ থেকে স্পষ্ট হয় জাপানের কবি শুনতারো তানিকাওয়াও এই তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন, যা তার কবিতায় বিবৃত। বিশ্বসাহিত্যে এমন অসংখ্য লেখকের সন্ধান মেলে, যারা এই তত্ত্বকে তাদের গ্রন্থের মুখ্য দর্শন হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে জার্মান লেখক হেরমান হেসের (৮৭৭-৯৬২) উপন্যাস ‘সিদ্ধার্থ’ (১৯২২) এবং ব্রাজিলিয়ান লেখক পাওলো কোয়েলহোর (জ. ১৯৪৭) উপন্যাস ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’ (৯৮৮) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দুটি উপন্যাসে তারা ধূলিকণা, গাছপালা, নদী, সূর্য ও বাতাসে প্রাণের অস্তিত্ব চিত্রিত করেছেন।

জাপানি কবি শুনতারো তানিকাওয়া কেবল বড়দের জন্য নয়, শিশুদের জন্য প্রচুর ছবি-বই এবং কবিতা লিখেছেন। জনপ্রিয় কার্টুন সিরিজ ‘পিনাটস’-এর জাপানি অনুবাদক ছিলেন তিনি। ‘টু-বিলিয়ন লাইট-ইয়ার্স অব সলিটিউড’ (১৯৫২) তার প্রথম এবং সবচেয়ে বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। মাত্র ২১ বছর বয়সে এটি প্রকাশের পর তিনি জাপানি কাব্যজগতে উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তানিকাওয়া বিশ্বাস করতেন, কবিতা কোনো স্থির বস্তু নয়। কবিতা সতত প্রবহমান। তার কবিতায় জাপানের ঐতিহ্যবাহী ‘হাইকু’ বা ‘তনকা’ ফর্মের চেয়ে পশ্চিমা আধুনিক কবিতার প্রভাব বেশি দেখা যায়। তিনি প্রায়ই নিজেকে একজন ‘কারিগর’ হিসেবে অভিহিত করতেন, যিনি শব্দের মাধ্যমে মানুষের অনুভূতিকে রূপ দেন। তার বিখ্যাত ‘বিশ কোটি আলোকবর্ষের নিঃসঙ্গতা’ কবিতার একটি অংশে তিনি লিখেছেন: ‘মানুষ এই ছোট গ্রহে/ ঘুমায়, জেগে ওঠে, কাজ করে/ এবং মাঝে মাঝে অন্য গ্রহের প্রতিবেশী খুঁজতে চায়’।

শুনতারো তানিকাওয়ার কবিতায় দর্শন, দৈনন্দিন জীবন, মহাকাশ এবং মানব অস্তিত্বের টানাপোড়েন বারবার উঠে এসেছে। ১৯৩১ সালে টোকিওতে জন্মগ্রহণ করা এই কবি দীর্ঘকাল বিশ্বজুড়ে পাঠকদের অনুপ্রাণিত করে চলেছিলেন। তিনি মাটিকে জীবনের উৎস এবং শেষ গন্তব্য হিসেবে দেখিয়েছেন। গাছপালা বা ঘাসের শেকড় কীভাবে মাটির গভীরে প্রোথিত থাকে, তা দিয়ে তিনি মানুষের জীবনসংগ্রাম ও স্থিরতাকে তুলে ধরেছেন। বাতাসের শব্দ এবং প্রকৃতির নীরবতার মধ্যে তিনি এক ধরনের কথোপকথন খুঁজে পেতেন। প্রকৃতির এই নীরবতা তার কবিতায় গভীর ধ্যানের পরিবেশ তৈরি করে: ‘তোমার চোখে ভেসে উঠবে আকাশের সুদূর নীলিমা/ তোমার পিঠ ভিজে যাবে বুনো সবুজে—/ চলো—দুজনে মিলে জেনে নেই নক্ষত্রপুঞ্জের নাম/ আমাদের স্বপ্নে ভেসে আসুক সুদূরের গান/ ভোরের আকাশের সমুদ্র থেকে চলো—ঝিনুক কুড়িয়ে আনি—/ আজলায় তুলে নিই তারামাছ’।
(পৃথিবী এক বনভোজন, অনুবাদ মালেক মুস্তাকিম)

এসব কবিতা পাঠে আমাদের মনে ভেসে ওঠে তিরিশের কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতাংশ: ‘আমারো ইচ্ছা করে এই ঘাসের এই ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো/ গেলাসে গেলাসে পান করি,/ ...ঘাসের ভিতর ঘাস হয়ে জন্মাই কোনো এক নিবিড় ঘাস-মাতার/ শরীরের সুস্বাদু অন্ধকার থেকে নেমে।’ (ঘাস, বনলতা সেন)

জাপানি কবি শুনতারো তানিকাওয়া ভাষাকে জটিল করার পরিবর্তে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সহজ করে ব্যবহার করেছেন। এতে তার কবিতা সহজবোধ্য হয়েছে। আর এ কারণেই তার কবিতা অধিকতর জনপ্রিয়তা লাভ করতে সক্ষম।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, লক্ষ্মীপুর আলিম মাদ্রাসা, চান্দিনা, কুমিল্লা।

এসইউ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।