পাবনায় সাড়ে ৪ কোটি টাকার মধু আহরণের আশা
২২৬ জন মধু চাষের সঙ্গে জড়িত, ছবি: জাগো নিউজ
তেলের চাহিদা ও দাম বাড়ায় পাবনায় প্রতি বছরই বাড়ছে সরিষা চাষ। সরিষা একদিকে যেমন তেলের চাহিদা মেটায়; তেমনই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে মধু আহরণে। জেলার ৯টি উপজেলায় সরিষার জমির পাশে মৌবক্স স্থাপন করে ১১০ মেট্রিক টন মধু আহরণের প্রত্যাশা কৃষি বিভাগের। যার বাজারদর প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, ক্রমেই আবাদি জমি কমে যাওয়ায় গত দু’বছরে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও প্রতি বছরই বাড়ছে চাষ। গত বছর জেলায় ৪৪ হাজার ৮৯০ হেক্টর ও এবার ৪৫ হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। এসব জমির পাশেই সদর উপজেলায় ৭৮৮, আটঘরিয়ায় ২০০, ঈশ্বরদীতে ৪৫০, চাটমোহরে ৩ হাজার ২৫০, ভাঙ্গুড়ায় ৬ হাজার ১২০, ফরিদপুরে ১ হাজার ৭৫, বেড়ায় ২০০ ও সাঁথিয়ায় ১০০টিসহ মোট ১২ হাজার ১৮৩টি মৌবক্স স্থাপন করে আহরণ করা হচ্ছে মধু। গত বছর মৌবক্সের সংখ্যা ছিল ৮ হাজারের মতো। এ বছর ২২৬ জন মৌচাষি মধু চাষের সঙ্গে জড়িত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জমির পাশে মৌবক্স বসিয়ে কেবল মধু সংগ্রহের বিষয়টিই মুখ্য নয়। এর মধ্য দিয়ে পরাগায়ন বৃদ্ধিতে বাড়ে সরিষার ফলন। এতে লাভবান হচ্ছেন সরিষা চাষিরা। বাজারে সরিষা ফুলের খাঁটি মধুর ব্যাপক চাহিদা থাকায় ভালো দামে লাভবান হচ্ছেন মধু চাষিরাও। অনেকেই খাঁটি মধুর আশায় জমির পাশে সারি সারি বসানো মৌবক্স থেকেই মধু সংগ্রহ করছেন। এ মধু বিক্রি করে প্রতি কেজি ৪০০ টাকা গড় দর হিসেবে প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা আয় হবে। তবে ৫০০ টাকা কেজি দরেও মধু বিক্রি হয়।

মৌচাষিরা জানান, প্রতিটি বক্সে ১ লাখ কর্মী মৌমাছি ও একটি রানি মৌমাছি থাাকে। এসব মৌমাছি দিগন্ত জোড়া হলুদ সরিষা ফুলে উড়ে উড়ে মধু সংগ্রহ করে। আট থেকে দশ দিন পর পর প্রতিটি বক্স থেকে ২৫ থেকে ৩০ কেজি মধু মেলে। ভাঙ্গুড়ার খানমরিচ ইউনিয়নের বড়পুকুরিয়া গ্রামের মৌচাষি সোহাগ ও রমজান বলেন, ‘বছরের ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত সরিষা, লিচু ও তিলসহ বিভিন্ন জমিতে বক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়া বাকি সময় মৌমাছিদের পালন করতে হয়। এ পর্যন্ত ৮ মণ, ১৫ মণ করে কয়েক দফায় বক্স থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়েছে। এ দফায় ২০ মণের মতো পাওয়া যাবে বলে আশা রাখছি।’
তারা বলেন, ‘পুরো মৌসুমের কথা এখনো বলা যাচ্ছে না। প্রতি কেজি মধু ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা করে বিক্রি হয়। অনেকে জমিতে এসে নিয়ে যাচ্ছেন, আবার ড্রামে করে বিভিন্ন জায়গায় পাঠানোও হয়।’
একই উপজেলার বেতুয়ান গ্রামের মৌচাষি শফি বলেন, ‘এবার দেড়শটির মতো মৌবক্স স্থাপন করেছি। দুজন কর্মী নিয়ে মধু আহরণ করছি। ভালো দাম ও চাহিদা থাকায় ভালোই আয় হচ্ছে। তবে মাঝের তীব্র শীতে মধু পাওয়া যায়নি। এত শীতে মৌমাছিরা বক্স থেকে বের হয় না।’

সদর উপজেলার গয়েশপুর, দোগাছি ও ভাঁড়ারাসহ বিভিন্ন জায়গায় মৌবক্স স্থাপন করে মধু সংগ্রহ করা হচ্ছে। মধু চাষি হানিফ বলেন, ‘মৌচাক কাটার সময় উপস্থিত থেকে সংগ্রহ করা ছাড়া খাঁটি মধু পায় না ভোক্তারা। এ ক্ষেত্রে জমিতে এসে নিজে বক্স থেকে বের করে মধু নিচ্ছেন তারা। তাই তুলনামূলক কদর রয়েছে এই মধুর। শুরুতে সরিষা আবাদকারীরা না বুঝতে পেরে মৌবক্স বসাতে দিতে না চাইলেও এখন তারা নিজেদের ফলন বাড়ার বিষয়টি বোঝেন। ফলে জমির পাশে মৌবক্স বসাতে এখন তারাও আগ্রহী।’
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. রাফিউল ইসলাম বলেন, ‘চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও সদর উপজেলায় সরিষার আবাদ বেশি। ফলে এসব উপজেলার বিস্তীর্ণ সরিষার জমির পাশে মৌবক্সে মধু আহরণ বেশি হয়। এ পর্যন্ত জেলায় ৭৫ হাজার ৩০ কেজির মতো মধু আহরণ হয়েছে। নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরিষার জমিতে মধু সংগ্রহ চলবে। আমরা মৌচাষিদের মৌবক্স দিয়ে ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে পরামর্শসহ নানাভাবে সহযোগিতা দিচ্ছি।’
আলমগীর হোসাইন নাবিল/এসইউ