সাক্ষাৎকার
ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে, তবে বড় চ্যালেঞ্জ টেকসই ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁদপুর নদী কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আমিরুল ইসলাম
দেশে ইলিশ উৎপাদন বিগত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে টেকসই ব্যবস্থাপনা, মা ইলিশ সংরক্ষণ, জাটকা নিধন বন্ধ, নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিতে হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁদপুর নদী কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আমিরুল ইসলাম।
জাগো নিউজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ২০০৩-০৪ সাল থেকে সরকার ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পর থেকেই উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়। এর আগে নির্বিচারে মা ইলিশ ও জাটকা নিধনের কারণে উৎপাদন নেমে গিয়েছিল প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টনে। পরবর্তীতে গবেষণাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়নের ফলে ইলিশ উৎপাদন আবার বাড়তে শুরু করে।
তিনি জানান, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন ছিল প্রায় ৫ লাখ ৩২ হাজার মেট্রিক টন। পরবর্তী বছরগুলোতে তা বেড়ে ৫ লাখ ৫০ হাজার, ৫ লাখ ৬৫ হাজার, ৫ লাখ ৬৬ হাজার হয়ে সর্বশেষ প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ইলিশ ব্যবস্থাপনার সফলতার প্রমাণ। তবে এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে টেকসই ব্যবস্থাপনা, মা ইলিশ সংরক্ষণ, জাটকা নিধন বন্ধ, নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিতে হবে।
আরও পড়ুন-
৮ বছরে ইলিশের সর্বনিম্ন উৎপাদন, বাড়ানোকে চ্যালেঞ্জ বললেন মন্ত্রী
৭-১৩ এপ্রিল জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ
ড. আমিরুল ইসলাম বলেন, ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়, এটি আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। দেশের মোট মাছ উৎপাদনে এর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাস্তবতা ও গবেষণার তথ্যে ভিন্নতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সরকারি গবেষণার ভিত্তিতেই তথ্য প্রকাশ করা হয়। অনেকে বিভিন্ন কথা বললেও জেলে বা ব্যবসায়ীরা কিন্তু বলেন না যে তাদের জালে ইলিশ কম এসেছে। সরকারি তথ্যই গ্রহণযোগ্য।
ইলিশ সংরক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি একটি পরিযায়ী মাছ, যা সাগর থেকে নদীতে এসে ডিম ছাড়ে। তাই এর প্রজনন ও আবাসস্থল রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এমনভাবে ইলিশ আহরণ করতে হবে, যাতে প্রাকৃতিক প্রজনন ও বৃদ্ধি ব্যাহত না হয়। এজন্য মা ইলিশ সংরক্ষণ, জাটকা নিধন বন্ধ, নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিতে হবে।
আরও পড়ুন-
তেলের সংকটে ইলিশ আহরণে ভাটা, ক্ষতির মুখে জেলেরা
প্রশাসনের নজরদারি কমায় বেড়েছে জাটকা নিধন
দেশে বর্তমানে ছয়টি ইলিশের অভয়াশ্রম রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটিতে মার্চ-এপ্রিল দুই মাস সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। এই সময়ে জাটকা নিরাপদে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়। এছাড়া বছরে নির্দিষ্ট সময়ে মা ইলিশ ধরার ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যা উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কৃত্রিমভাবে ইলিশ উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও কৃত্রিমভাবে ইলিশের পোনা উৎপাদন সম্ভব হয়নি। তাই প্রাকৃতিক প্রজননের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষা করাই একমাত্র পথ।
ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে তিনি কয়েকটি বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এর মধ্যে রয়েছে মা ইলিশ সংরক্ষণ, জাটকা নিধন বন্ধ, অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ, নদী ও সাগরের দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
নদীর নাব্যতা কমে যাওয়াকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিবছর প্রায় ৬ বিলিয়ন টন পলি নদীতে জমা হয়। এতে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল বা মাইগ্রেশন রুট বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নদীতে পর্যাপ্ত স্রোত না থাকলে পলি জমে যায়, ফলে ইলিশের প্রজনন ব্যাহত হয়। এজন্য পরিকল্পিতভাবে নদী খনন ও ড্রেজিং জরুরি।
পরিবেশ দূষণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই বিজ্ঞানী। তিনি বলেন, শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক ও রাসায়নিক পদার্থ নদী ও সাগরের পানির গুণগত মান নষ্ট করছে, যা ইলিশের জন্য মারাত্মক হুমকি।
আরও পড়ুন-
ইলিশের দাম কেজিতে বেড়েছে ৩০০-৪০০ টাকা
৯ হাজারে বিক্রি হলো এক ইলিশ
ইলিশ সংরক্ষণে জনসম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্বারোপ করে ড. আমিরুল ইসলাম বলেন, এটি শুধু সরকারের কাজ নয়, এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। ইলিশ অধ্যুষিত এলাকার মানুষসহ সবাইকে নিয়ে সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সরকার যে নিষেধাজ্ঞা দেয়, তা সবার মেনে চলা জরুরি।
চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় বড় আকারের ইলিশ কমে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ইলিশ গবেষকরা বলছেন, ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় গর্ব। এই সম্পদ টিকিয়ে রাখতে হলে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা, গবেষণা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষা এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে পারলেই ভবিষ্যতে ইলিশ উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে।
এফএ/এএসএম