ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. অর্থনীতি

জেট ফুয়েলের আকাশচুম্বী দামে আকাশপথে ভ্রমণে অশনিসংকেত

মুসা আহমেদ | প্রকাশিত: ০৫:১৪ পিএম, ১১ এপ্রিল ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে দেশে লাফিয়ে বাড়ছে জেট ফুয়েলের দাম। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আকাশপথে ভ্রমণে। ব্যয় সামলাতে ভাড়া বাড়িয়েছে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের এয়ারলাইন্সগুলো। টিকিটের আকাশচুম্বী দামকে অ্যাভিয়েশন খাতের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাষ্য, উড়োজাহাজ পরিচালনা ব্যয় সামাল দিতে টিকিটের দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। এখন অভ্যন্তরীণ রুটে টিকিটের দাম গড়ে প্রায় এক হাজার ও আন্তর্জাতিক রুটে পাঁচ হাজারের বেশি পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ, ভাড়া বাড়িয়ে উড়োজাহাজ পরিচালনা ব্যয় সমন্বয় করা হচ্ছে।

তবে যাত্রীদের অভিযোগ, জেট ফুয়েলের দামের সঙ্গে টিকিটের ভাড়া সমন্বয় করছে এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠানগুলো। এ কারণে উড়োজাহাজের টিকিট যাত্রীদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আকাশপথে যাতায়াত ক্রমেই কমে যাবে। এতে অ্যাভিয়েশন খাত সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই জেট ফুয়েলের দাম না বাড়িয়ে কীভাবে আকাশপথে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা যায় তা সরকারকে দেখতে হবে।

২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়। এ প্রেক্ষাপটে গত ২৪ মার্চ দেশে জেট ফুয়েলের দাম এক লাফে বাড়ে লিটারে প্রায় ৯০ টাকা। তখন দাম বেড়ে জেট ফুয়েলের দাম অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার ২০২ টাকা ২৯ পয়সা ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য ১ দশমিক ৩২ ডলার নির্ধারণ করা হয়।

জেট ফুয়েলের আকাশচুম্বি দামে আকাশপথে ভ্রমণে অশনিসংকেত

জ্বালানি নিচ্ছে বিমান

এরপর গত মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জ্বালানি জেট ফুয়েলের দাম ফের বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এপ্রিল মাসের জন্য প্রতি লিটার তেলের দাম ২০২ টাকা ২৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২২৭ টাকা ৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার তেলের দাম ১ দশমিক ৩২১৬ থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৪৮০৬ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এভাবে দেশে জেট ফুয়েলের দাম লাফিয়ে বাড়তে থাকায় এয়ারলাইন্সগুলো ব্যয় সামলাতে গলদঘর্ম।

একটি এয়ারলাইন্সের যে কোনো রুটের পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যয় হয় জেট ফুয়েলে। তাই ফুয়েলের দাম বাড়লে তা যাত্রীর ভাড়ায় গিয়ে যোগ হয়। অন্যথায় ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হয় না।-এয়ার অ্যাস্ট্রা এয়ারওয়েজ লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) সাবিক হাসান শুভ 

এখন রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী উড়োজাহাজ সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রা দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এয়ারলাইন্সগুলো ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, সৈয়দপুর, রাজশাহী, যশোর, বরিশালে দিনে প্রায় সাত হাজার যাত্রী বহন করে। এর মধ্যে বিমান ও ইউএস-বাংলা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আরও প্রায় ৩০টি এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠান ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী পরিবহন করে। এসব এয়ারলাইন্স শাহজালাল বিমানবন্দর থেকেই জেট ফুয়েল কেনে। আর এসব এয়ারলাইন্সে বিইআরসি নির্ধারিত দরে তেল সরবরাহ করে পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড।

জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধিতে এওএবির আপত্তি

গত ২৪ মার্চ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এক সিদ্ধান্তে জেট ফুয়েলের (জেট এ-১) দাম প্রায় ৮০ শতাংশ বাড়িয়েছে, যা দেশের উড়োজাহাজ চলাচল খাতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ও অযৌক্তিক বলে জানায় অ্যাভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এওএবি)।

এওএবির সেক্রেটারি জেনারেল মফিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যে জানানো হয়েছে। কিন্তু তারপর গত ২৪ মার্চ ও ৭ এপ্রিল জেট ফুয়েলের দাম বাড়িয়েছে বিইআরসি। ফলে দেশের এয়ারলাইন্সগুলো মারাত্মক আর্থিক চাপে পড়বে এবং অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ভার চাপবে।’

জ্বালানির দাম বাজারমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় রাখা যেমন প্রয়োজন, তেমনি অ্যাভিয়েশন খাতকে টিকিয়ে রাখতে সহায়ক নীতি প্রণয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে এয়ারলাইন্সগুলোকেও জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, রুট পরিকল্পনায় কৌশলগত পরিবর্তন এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আরও মনোযোগী হতে হবে।-ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম

তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে জেট ফুয়েলের ওপর কর বাড়ানোর ফলে সামগ্রিক পরিচালন ব্যয় আরও বাড়বে, যা দেশের উড়োজাহাজ চলাচল শিল্পের টেকসই উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করবে। মূল্যবৃদ্ধির ফলে অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে ফ্লাইট চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাই জেট ফুয়েলের এই অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত দ্রুত পুনর্বিবেচনা করে একটি বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য মূল্য নির্ধারণ করা হোক, যাতে দেশের অ্যাভিয়েশন খাতের স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা যায়।’

আকাশপথে ভ্রমণে জ্বালানির প্রভাব

অ্যাভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে যেখানে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে একমুখী ভাড়া সর্বনিম্ন ছিল ৪ হাজার ৮শ টাকা, এখন তা বেড়ে প্রায় ৫ হাজার ৮শ টাকা হয়েছে। একইভাবে অভ্যন্তরীণ অন্য রুটে ভাড়া বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সব রুটে সর্বনিম্ন ভাড়ায় গড়ে পাঁচ হাজার টাকা করে বাড়িয়েছে দেশ-বিদেশের এয়ারলাইন্সগুলো।

জেট ফুয়েলের আকাশচুম্বি দামে আকাশপথে ভ্রমণে অশনিসংকেত

বিমানে জ্বালানি সরবরাহ করে পদ্মা অয়েল

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, আগে যাত্রীর ভাড়ার সঙ্গে ফুয়েল চার্জ হিসেবে একমুখী টিকিটে ১৫০ টাকা করে নেওয়া হতো। কিন্তু সম্প্রতি জেট ফুয়েলের দাম বাড়ায় এক লাফে ১ হাজার ৫০ টাকা চার্জ বাড়ানো হয়েছে। আর রিটার্ন টিকিটের ক্ষেত্রে এ চার্জ ২১শ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অর্থাৎ, আগে ঢাকা থেকে কক্সবাজার রুটে সর্বনিম্ন ভাড়া ছিল ৫ হাজার ২শ টাকা, এখন এ রুটে সর্বনিম্ন ভাড়া ৬ হাজার ২শ টাকা। আবার ঢাকা থেকে সৈয়দপুরের সর্বনিম্ন ভাড়া ছিল ৪ হাজার ৮শ টাকা, এখন এ ভাড়া ৫ হাজার ৮শ টাকা করা হয়েছে। একইভাবে অন্য রুটের ভাড়ায়ও গড়ে ১ হাজার ৫০ টাকা করে ফুয়েল চার্জ যোগ হয়েছে।

এয়ার অ্যাস্ট্রা এয়ারওয়েজ লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) সাবিক হাসান শুভ জাগো নিউজকে বলেন, ‘একটি এয়ারলাইন্সের যে কোনো রুটের পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যয় হয় জেট ফুয়েলে। তাই ফুয়েলের দাম বাড়লে তা যাত্রীর ভাড়ায় গিয়ে যোগ হয়। অন্যথায় ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হয় না।’

ইউএস-বাংলার মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘তেলের দামের সঙ্গে ভাড়া সমন্বয় করার পর আকাশপথে যাত্রী কমতে শুরু করেছে। তার শতাংশ হিসাব করতে হলে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, এখন সামার মৌসুম শুরু হয়েছে। আবার সামনে ঈদুল আজহার ছুটি রয়েছে। তবে অন্য বছরের তুলনায় এখন আগাম বুকিং কম হচ্ছে।’

অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীরা বলছেন, এখন আকাশপথে ভ্রমণ বিলাসিতা নয়, বরং একটি দেশের অর্থনৈতিক গতির অন্যতম চালিকাশক্তি। সরকার আকাশপথে নীতিগত সহায়তা না দিলে অভ্যন্তরীণ বাজার সংকুচিত হবে। ফলে অনেকে ব্যয় মেটাতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে নেবে। কেউ কেউ পথে বসে যাবে। এর প্রভাবে পর্যটনখাতেও ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেবে।

মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) ব্যবসার কাজে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রাম গেছেন ফুলবাড়িয়ার এনেক্সকো টাওয়ারের গার্মেন্টস ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবির। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্যবসার কাজে মাসে এক-দুবার চট্টগ্রাম যেতে হয়। কিন্তু উড়োজাহাজে যে হারে ভাড়া বাড়ছে, তা ক্রমেই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অথচ দেশে জেট ফুয়েলের কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।’

দেশের বৃহত্তম বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। এখন এয়ারলাইন্সটির বহরে ২৪টি উড়োজাহাজ। সাতটি অভ্যন্তরীণ ও নয়টি দেশের ১১টি আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী পরিবহন করে সংস্থাটি। কিন্তু জেট ফুয়েলের দাম বাড়ায় তারাও ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হয়েছে।

জেট ফুয়েলের উচ্চমূল্য পুরো অ্যাভিয়েশন শিল্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে—যেখানে এয়ারলাইন্স, যাত্রী ও সামগ্রিক অর্থনীতি সবাই কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত হবে জানিয়ে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ায় সরাসরি প্রভাব পড়ছে যাত্রীর ভাড়ার ওপর। টিকিটের দাম বাড়লে সাধারণ যাত্রীরা ভ্রমণে নিরুৎসাহিত হন। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক- উভয় রুটেই যাত্রী সংখ্যা কমে যেতে পারে। তাই জ্বালানির দাম বাজারমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় রাখা যেমন প্রয়োজন, তেমনি অ্যাভিয়েশন খাত টিকিয়ে রাখতে সহায়ক নীতি প্রণয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে এয়ারলাইন্সগুলোকেও জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, রুট পরিকল্পনায় কৌশলগত পরিবর্তন এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আরও মনোযোগী হতে হবে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সচিব ও সরকারের যুগ্মসচিব মো. নজরুল ইসলাম সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘যারা দাম বাড়ায় তারা বৈশ্বিক বাজার, ডলারের দাম সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই বাড়ায়। বিইআরসির কারিগরি কমিটি এ কাজটি করে।’

এমএমএ/এএসএ/এমএফএ