ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. অর্থনীতি

এলপিজির সরবরাহ সচল রাখা নিয়ে শঙ্কা

ইকবাল হোসেন | প্রকাশিত: ১১:০৪ এএম, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

গত ডিসেম্বর মাস থেকে দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে চলছে সংকট। সরকার নির্ধারিত দর উপেক্ষা করে ১২ কেজির সিলিন্ডার গ্যাস এলাকাভেদে বিক্রি হচ্ছে দুই থেকে সাতশ টাকা বেশিতে। সামনে সরবরাহ সচল রাখতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন অপারেটররা।

গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে আগের বছরের তুলনায় বেশি এলপিজি আমদানি হলেও খুচরা পর্যায়ে ভোক্তারা সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে এখনো কয়েকশ টাকা বেশিতে এলপিজি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

খুচরা পর্যায়ে বেশি দামে বিক্রি হলেও এখনো সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এলপিজির। এপ্রিল মাসের পুরোটা সময় সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে। তবে মে মাসে এলপিজির জোগানে ভাটা পড়ার আশঙ্কার কথা বলছেন আমদানিকারকরা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এলপিজির নতুন সংস্থান নিয়ে কপালে ভাঁজ তাদের। সামনের দিনগুলোতে সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন অপারেটররা।

আমদানিকারকরা বলছেন, বাংলাদেশে এলপিজির বড় অংশ আসতো মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে এলপিজির উৎস সংকুচিত হয়ে আসছে। পাশাপাশি দ্বিগুণের চেয়ে বেশি বেড়েছে জাহাজ ভাড়া। এতে বেসরকারি অপারেটরদের ক্ষতি লাঘবে মাসের মাঝামাঝিও এলপিজির মূল্য সমন্বয়ের কথা ভাবছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

দেশে এখন যে এলপিজি মজুত রয়েছে, তাতে পুরো এপ্রিল মাস চলবে। তবে মে মাসে আমাদের সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ওমান থেকে আমাদের সাপ্লাইয়ারের সঙ্গে প্রতি মাসে ২০ হাজার টন এলপিজি দেওয়ার চুক্তি রয়েছে। কিন্তু তারা জানিয়েছে মে মাসে মাত্র ছয় হাজার টন দিতে পারবে।-বিএম এনার্জির নির্বাহী পরিচালক ক্যাপ্টেন মাইনুল আহসান 

বাংলাদেশে গৃহস্থালিতে সবচেয়ে বেশি সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবহন ও শিল্পেও এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষ করে, পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাসের জোগান সীমিত হয়ে আসায় বাংলাদেশে এলপিজির চাহিদা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। বর্তমানে দেশে বছরে এলপিজির চাহিদা প্রায় ১৫ থেকে ১৭ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আড়াই শতাংশের মতো আসে দেশি উৎস থেকে। অবশিষ্ট এলপিজি আমদানি করে বাজারে সরবরাহ দেন বেসরকারি উদ্যোক্তারা।

এলপিজি সরবরাহ

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৭টি প্রতিষ্ঠান ১৭ লাখ ৬ হাজার ২শ টন এলপিজি আমদানি করে। পাশাপাশি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশি উৎস থেকে সরকারি এলপিজিএলসহ বেসরকারি তিন রিফাইনারি মিলে সরবরাহ করে ৪৫ হাজার ৬৩০ টন। সব মিলিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলপি গ্যাস উৎপাদন ও আমদানি হয়েছে ১৭ লাখ ৫১ হাজার ৮৩০ টন।

তবে ২০২৪ সালের চেয়ে ২০২৫ সালের ক্যালেন্ডার বর্ষে এলপিজি আমদানি কমে যায়। বছরের শেষের দিকে আমদানি কমতে থাকে। ২০২৪ সালে যেখানে ১৬ লাখ ১০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে আমদানি হয় ১৪ লাখ ৬৭ হাজার টন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৬২ টন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ৭৬৫ টন। আগের বছরের চেয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১৮ হাজার ৮৬৬ টন এলপিজি কম আমদানি হয়েছে। জানুয়ারিতে একই চিত্র থাকলেও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মিলিয়ে প্রায় ২৫ শতাংশের মতো আমদানি বেড়েছে। শেষ দুই মাসে ৩ লাখ ৮২ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়। এর মধ্যে গত মার্চ মাসে এলপিজি আমদানি হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার টন। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৫৩ হাজার টন। একইভাবে চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতে আমদানি হয় ১ লাখ ৭১ হাজার টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতে আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৪১ হাজার টন। এতে দুই মাসে ৮৮ হাজার টন বেশি আমদানি হয়।

আমরা দেশের জন্য কাজ করছি। সংকটের কথা বলা হলেও ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি এলপিজি আমদানি হয়েছে। এটি আশার কথা। আমরা এ মুহূর্তে চাইছি দেশের মানুষ স্বস্তিতে থাকুক, কোনো প্যানিক চাই না।-লোয়াব সভাপতি আমিরুল হক

বর্তমানে অপারেটরদের হাতে থাকা এলপি গ্যাসে পুরো এপ্রিল মাসে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার আশা করছেন আমদানিকারকরা। তবে মে মাসের সরবরাহ নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন কেউ কেউ। কথা হলে এলপিজি খাতের বড় আমদানিকারক বিএম এনার্জির নির্বাহী পরিচালক ক্যাপ্টেন মাইনুল আহসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মধ্যেও মার্চে ওমান থেকে একটি পার্সেল এনেছি। দেশে এখন যে এলপিজি মজুত রয়েছে, তাতে পুরো এপ্রিল মাস চলবে। তবে মে মাসে আমাদের সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ওমান থেকে আমাদের সাপ্লাইয়ারের সঙ্গে প্রতি মাসে ২০ হাজার টন এলপিজি দেওয়ার চুক্তি রয়েছে। কিন্তু তারা জানিয়েছে মে মাসে মাত্র ছয় হাজার টন দিতে পারবে।’

এলপিজি

তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমাদের বড় একটি অংশ এলপিজি আসে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে অনেক প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক প্ল্যান্ট হামলার শিকার হয়েছে। এসব প্ল্যান্ট চালু করতেও সময় লাগতে পারে। সেজন্য আমাদের বিকল্প উৎসগুলোর দিকে নজর দিতে হচ্ছে।’

এ কর্মকর্তা বলেন, ‘বিইআরসি এপ্রিল মাসে ফ্রেইট (জাহাজ ভাড়া) টনপ্রতি ১২০ ডলার হিসাব করে দাম সমন্বয় করেছে। কিন্তু এখন প্রতি টনের ভাড়া ৪৫০ ডলারের বেশিও পরিশোধ করতে হচ্ছে। অপারেটররা ভাড়া নিয়ে আশ্বস্ত না হলে আমদানি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’

আমরা গত দুদিন আগেও লোয়াবের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তারা জাহাজ ভাড়া বাড়ানো নিয়ে বলেছে। আমরা তাদের লিখিতভাবে জানাতে বলেছি। আমরা ইন্টারন্যাশনাল সোর্সগুলো থেকে ডাটা কালেকশন করছি। যদি প্রিমিয়াম (ফ্রেইট) বাড়তি থাকে তাহলে আমরা যেখানে প্রতি মাসে দাম সমন্বয় করতাম, এখন মাসের মাঝামাঝিতেও দাম সমন্বয় করা হতে পারে।-বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য (গ্যাস) মিজানুর রহমান

এ বিষয়ে এলপিজি অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক জাগো নিউজ বলেন, ‘আমরা দেশের জন্য কাজ করছি। সংকটের কথা বলা হলেও ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি এলপিজি আমদানি হয়েছে। এটি আশার কথা। আমরা এ মুহূর্তে চাইছি দেশের মানুষ স্বস্তিতে থাকুক, কোনো প্যানিক চাই না।’

তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারি দামে এলপিজি বিক্রির জন্য ইতোমধ্যে বিবৃতি দিয়েছি। মধ্যপ্রাচ্য বাদেও বাইরের অনেক দেশ থেকে এলপিজি আসছে। তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলে সিপি রেট কমেও যেতে পারে।’

পরিস্থিতি বিবেচনায় মাসের মাঝামাঝি এলপিজির দাম সমন্বয় করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য (গ্যাস) মিজানুর রহমান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা গত দুদিন আগেও লোয়াবের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তারা জাহাজ ভাড়া বাড়ানো নিয়ে বলেছে। আমরা তাদের লিখিতভাবে জানাতে বলেছি। আমরা ইন্টারন্যাশনাল সোর্সগুলো থেকে ডাটা কালেকশন করছি। যদি প্রিমিয়াম (ফ্রেইট) বাড়তি থাকে তাহলে আমরা যেখানে প্রতি মাসে দাম সমন্বয় করতাম, এখন মাসের মাঝামাঝিতেও দাম সমন্বয় করা হতে পারে। যে দরই নির্ধারণ হোক না কেন, তা যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য বলছে, বর্তমানে মালয়েশিয়া থেকে আসা ‘মর্নিং জেইন’ নামে ট্যাংকার থেকে আড়াই হাজার টন এলপিজি খালাস হচ্ছে। ৫ এপ্রিল খালাস হয় ২ হাজার ৬শ টনের ‘গ্যাস জার্নি’। ১৩ এপ্রিল মালয়েশিয়া থেকে ১০ হাজার টনের আরও একটি জাহাজ চট্টগ্রামে আসার কথা রয়েছে।

এদিকে চলতি (এপ্রিল) মাসে সৌদি আরামকো এলপিজির সিপি (কন্ট্রাক প্রাইস) মার্চের চেয়ে ৪৪ শতাংশের বেশি বাড়িয়েছে। এতে দেশে এলপিজির দর সমন্বয় করে ১২ কেজি এলপিজির দাম ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকারি নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বিইআরসি। তবে বাজারে ১ হাজার ৮৫০ টাকা থেকে দুই হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এসব গ্যাস।

এমডিআইএইচ/এএসএ/ এমএফএ