ব্যাংক রেজল্যুশন আইন: পথ করে দিচ্ছে আগের মালিকদের ফিরে আসার
বাংলাদেশ ব্যাংক/ছবি: জাগো নিউজ
সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ পুনরায় ফিরে পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন সাবেক মালিকরা, তাও তুলনামূলক সহজ শর্তে। ফলে নতুন সরকারের পদক্ষেপটিকে অনেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাংক সংস্কার উদ্যোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখছেন।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের দুর্বল ও সংকটাপন্ন ব্যাংকিং খাতকে পুনরুদ্ধারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’। এ অধ্যাদেশের মূল লক্ষ্য ছিল অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন এবং দায়ীদের স্থায়ীভাবে মালিকানা থেকে অপসারণ করা।
এখন ওই অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেওয়ার সময় পরিবর্তন এনে একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে পরিস্থিতি বদলে গেছে। সংশোধিত আইনের ১৮(ক) ধারায় বলা হয়েছে, একীভূত ব্যাংক পরিচালনায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যে অর্থ সহায়তা দিয়েছে, তার মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ পরিশোধ করেই সাবেক মালিকরা আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, তারা অভ্যন্তরীণভাবে এ ধরনের বিধান যুক্ত করার বিপক্ষে মত দিয়েছিল। পাশাপাশি বিরোধীদলও সংসদে এ বিষয়ে আপত্তি তোলে। তবুও তা উপেক্ষা করে গত শুক্রবার ১৮(ক) ধারা সংযুক্ত রেখেই বিলটি পাস করা হয়। সব মিলিয়ে, নতুন আইনটি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রক্রিয়াকে কোন দিকে নিয়ে যাবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক আরও জোরদার হয়েছে।
১৮(ক) ধারা: পুরোনো ক্ষতে নতুন প্রলেপ?
নতুন পাস হওয়া আইনের সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং একই সঙ্গে সমালোচিত অংশ হলো ১৮(ক) ধারা। এ বিধানের মাধ্যমে একীভূত বা ‘রেজল্যুশন’ প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলোর সাবেক মালিক ও পরিচালকদের জন্য আবারও ফিরে আসার আইনি সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, এসব ব্যাংকের পূর্ববর্তী মালিক বা পরিচালকরা সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া মোট আর্থিক সহায়তার মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করলেই মালিকানা পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাবেন। অবশিষ্ট সাড়ে ৯২ শতাংশ অর্থ তাদের দুই বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে, যা ১০ শতাংশ সরল সুদে গণনা করা হবে।
এ ব্যবস্থাকে ঘিরে বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা দেখা গেছে। তাদের মতে, যেখানে আগের অধ্যাদেশে দায়ীদের জন্য কোনো ধরনের ছাড় ছিল না, সেখানে এখন কিস্তিতে মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। ফলে এটি ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও লুটপাটে জড়িতদের জন্য এক ধরনের সুবিধা বা প্রণোদনা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
নতুন আইনের সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের নিয়ে ব্যাংকপাড়ায় এখন জোর আলোচনা চলছে। বিশেষ করে গত বছর শরীয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক- এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের প্রেক্ষাপট আবার সামনে আসছে।
এ ব্যাংকগুলোর মধ্যে চারটির পরিচালনা পর্ষদে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব ছিল বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমের। অন্যদিকে, এক্সিম ব্যাংক অনেক বছর ধরেই নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, একবার কোনো ব্যাংক সাবেক মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিলে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়বে। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিলটি পর্যালোচনার দায়িত্বে থাকা ১০ সদস্যের কমিটি এবং বাংলাদেশ ব্যাংক উভয়ই ১৮(ক) ধারা সংযোজনের বিরোধিতা করেছিল এবং তা বাতিলের সুপারিশ দিয়েছিল।
তাদের মতে, যাদের কারণে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের হাতেই আবার নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া সুশাসনের পরিপন্থি। তবে শেষ মুহূর্তে কী কারণে এ ধারা যুক্ত করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে ধারণা করছেন, প্রভাবশালী কিছু ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর জন্যই এই সুযোগ রাখা হয়েছে।
নতুন ধারায় যা বলা হয়েছে
নতুন আইনের ১৮(ক) ধারা অনুযায়ী, রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় যাওয়ার আগের শেয়ারহোল্ডার বা বাংলাদেশ ব্যাংক উপযুক্ত মনে করলে অন্য কেউ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের শেয়ার ও দায়-সম্পদ পুনরায় গ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে একটি অঙ্গীকারনামা দিতে হবে, যেখানে ব্যাংক পরিচালনা, মূলধন ঘাটতি পূরণ, সব ধরনের ঋণ ও আর্থিক সহায়তা পরিশোধ, আমানতকারী ও পাওনাদারদের দায় নিষ্পত্তি এবং কর পরিশোধের প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে।
এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া, শেয়ার হস্তান্তরে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিধিনিষেধ মানা এবং সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার মতো শর্তও মানতে হবে। ধারার উপধারা অনুযায়ী, আবেদন অনুমোদনের পর তিন মাসের মধ্যে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া অর্থের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ জমা দিতে হবে। বাকি ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।
আমানতকারীদের ভবিষ্যৎ
নতুন আইন পাসের পর থেকেই ইসলামী ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অস্থিরতা বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এই পরিবর্তনকে ‘লুটেরাদের পুনর্বাসন’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। গত এক বছরে যখন আমানতকারীদের মধ্যে কিছুটা আস্থা ফিরতে শুরু করেছিল, তখনই সাবেক বিতর্কিত মালিকদের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের খবরে সেই বিশ্বাস আবারও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে যেসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও ব্যাংককে মূলধন সংকটে ফেলার অভিযোগ রয়েছে, তারা যদি আবার নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে, তাহলে সাধারণ গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
পাশাপাশি আশঙ্কা করা হচ্ছে, এসব গোষ্ঠীর ফিরে আসার খবরে আতঙ্কিত হয়ে আমানতকারীরা হঠাৎ করে অর্থ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজস্ব অভ্যন্তরীণ আলোচনায় এ ধরনের ধারা যুক্ত করার বিরোধিতা করেছিল। সাবেক মালিকরা পুনরায় নিয়ন্ত্রণে এলে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা কাঠামো এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
অপর এক কর্মকর্তার মতে, আগের মালিকরা ফিরে এসে কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যাংক পরিচালনা করবেন এবং বিদ্যমান আইন-কানুন মেনে চলবেন তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। পাশাপাশি তাদের প্রত্যাবর্তন চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়াকেও বিঘ্নিত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, ১৮(ক) ধারাকে পুরোনো ক্ষততে নতুন প্রলেপ বলা যায়। এ বিধানের মাধ্যমে একীভূত প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলোর সাবেক মালিক ও পরিচালকদের জন্য আবারও ফিরে আসার আইনি সুযোগ তৈরি হচ্ছে। যেসব ব্যক্তি আগে ব্যাংক থেকে অর্থ পাচার বা অনিয়মিত ঋণ গ্রহণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা এখন সেই অর্থেরই একটি ক্ষুদ্র অংশ পরিশোধ করে আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসার সুযোগ পেতে পারেন। এ ধরনের বিধান আর্থিক খাতে দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। এতে অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার বদলে দায়ীদের কার্যত পুরস্কৃত করা হবে এবং ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
ইএআর/একিউএফ