জঙ্গিদের অর্থায়ন, ফ্রান্সে দোষী সাব্যস্ত সিমেন্ট কোম্পানি লাফার্জ
লাফার্জ কোম্পানির লোগো/ছবি: রয়টার্স
সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলাকালে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ দিয়ে সেখানে কারখানা চালু রাখার অভিযোগে সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হোলসিমের লাফার্জ ইউনিটকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) ফ্রান্সের প্যারিসের একটি আদালত এ রায় দেন।
এটি ফ্রান্সে প্রথমবারের মতো কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে অর্থায়নের অভিযোগে বিচার ও দণ্ড দেওয়ার ঘটনা। মামলাটি দায়েরকারী সংগঠন শেরপা এবং ইউরোপীয় সাংবিধানিক ও মানবাধিকার কেন্দ্র (ইসিসিএইচআর) এক যৌথ বিবৃতিতে একে ‘বহুজাতিক কোম্পানির দায়মুক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি ঐতিহাসিক রায়’ বলে উল্লেখ করেছে।
রায়ে লাফার্জের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্রুনো লাফোঁসহ মোট আটজন সাবেক কর্মকর্তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ব্রুনো লাফোঁকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তার আইনজীবী জানিয়েছেন, এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।
একইভাবে সাবেক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান এরোকেও পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং তিনিও আপিল করবেন। অন্য দোষীদের এক থেকে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ২০১৩ থেকে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লাফার্জ মোট ৫৫ লাখ ৯০ হাজার ইউরো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে দিয়েছে। এর মধ্যে ইসলামিক স্টেট এবং আল-কায়েদার সঙ্গে সংযুক্ত নুসরা ফ্রন্টও রয়েছে, যেগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সংগঠন।
মামলার বিচারক ইসাবেল প্রেভো-দেপ্রে জানান, এসব অর্থ জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর শক্তি বাড়াতে সহায়তা করেছে এবং তারা সিরিয়া ও এর বাইরে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে।
তিনি বলেন, কারখানা চালু রাখার অর্থনৈতিক স্বার্থেই এ অর্থ দেওয়া হয়েছে। এটি দেওয়া ছিল কার্যত ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে একটি বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব।
আদালত কোম্পানিটিকে সর্বোচ্চ ১১ লাখ ২৫ হাজার ইউরো জরিমানা করেছে, যা প্রসিকিউটরদের চাওয়া সর্বোচ্চ শাস্তি।
লাফার্জ এক বিবৃতিতে জানায়, এক দশকেরও বেশি আগের এ ঘটনা তাদের আচরণবিধির গুরুতর লঙ্ঘন ছিল। প্রতিষ্ঠানটি আদালতের রায়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং এর আইনি ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করছে। এ বিষয়ে হলসিম তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
জানা গেছে, সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের জালাবিয়া কারখানাটি ২০০৮ সালে ৬৮ কোটি ডলারে অধিগ্রহণ করে লাফার্জ এবং ২০১০ সালে উৎপাদন শুরু করে। ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরুর পরও কারখানা চালু রাখতে বিভিন্ন পক্ষকে অর্থ দেওয়া হয়। এর মধ্যে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে ৮ লাখ ইউরোর বেশি এবং জঙ্গি গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত খনি থেকে কাঁচামাল কিনতে প্রায় ১৬ লাখ ইউরো ব্যয় করা হয়।
কারখানার কর্মীরা কাছাকাছি মানবিজ শহরে অবস্থান করতেন এবং ইউফ্রেটিস নদী পার হয়ে কারখানায় যাতায়াত করতেন বলেও আদালতে উঠে আসে।
এর আগে ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটি পৃথক মামলায় লাফার্জ স্বীকার করে যে তাদের সিরিয়ান শাখা কর্মী, গ্রাহক ও সরবরাহকারীদের চলাচলের সুবিধার্থে ইসলামিক স্টেট ও নুসরা ফ্রন্টকে প্রায় ৬০ লাখ ডলার দেয়। ওই মামলায় প্রতিষ্ঠানটি ৭৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার জরিমানা ও অর্থদণ্ড দিতে সম্মত হয়।
এদিকে, সিরিয়ায় কারখানা চালু রাখার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগেও ফ্রান্সে লাফার্জের বিরুদ্ধে পৃথক তদন্ত চলমান রয়েছে।
২০১৫ সালে লাফার্জ সুইজারল্যান্ডভিত্তিক হোলসিমের সঙ্গে একীভূত হয়।
সূত্র: রয়টার্স
এমএএস/একিউএফ