ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. একুশে বইমেলা

বই আলোচনা

পদ্মা নদীর মাঝি: জীবন সংগ্রামের নির্মোহ দলিল

জাগো নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত: ০৪:০৬ পিএম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ইয়িলদিরিম মারু

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‌‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে উপলব্ধি করেছি, এটি শুধু একটি গল্প নয় বরং বাংলার এক বিস্তৃত জনপদের জীবন সংগ্রামের নির্মোহ দলিল। এ উপন্যাসে পদ্মা নদীর তীরবর্তী কেতুপুর এবং তার আশেপাশের গ্রামের জেলে ও মাঝিদের জীবনযাত্রা অত্যন্ত বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটে উঠেছে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, সভ্যতার তথাকথিত সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলো প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য নদীর সাথে যুদ্ধ করে। তাদের জীবন নদীনির্ভর, অনিশ্চিত এবং সংগ্রামময়। লেখক অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই মানুষের অভাব, দুঃখ, আশা, স্বপ্ন এবং শোষণের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র কুবের একজন দরিদ্র জেলে, যার জীবন প্রতিনিয়ত অভাব ও দায়িত্বের ভারে ন্যুব্জ। পদ্মা নদীতে মাছ ধরেই তার সংসার চলে। সংসারে আছে খোঁড়া স্ত্রী মালা, একমাত্র মেয়ে গোপী, তিন ছেলে এবং তার বোন। তাদের জীবন দারিদ্র্যের সীমারেখায় আবদ্ধ। প্রতিদিন তাদের জন্য এক নতুন সংগ্রাম।

এই দারিদ্র্যপীড়িত সংসারে মালার বোন কপিলার আগমন উপন্যাসে নতুন আবেগ ও জটিলতার সৃষ্টি করে। কপিলা তার যৌবন ও আকর্ষণের মাধ্যমে কুবেরের জীবনে নিষিদ্ধ আবেগের জন্ম দেয়। এই সম্পর্ক কোনো রোমান্টিক কল্পনা নয় বরং এটি মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতা, একাকিত্ব এবং মানসিক শূন্যতার প্রতিফলন। লেখক এই সম্পর্ককে অত্যন্ত বাস্তব ও নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।

উপন্যাসের আরেকটি রহস্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হোসেন মিয়া। তার চরিত্রের মধ্যে আমি এক ধরনের রহস্য, প্রভাব এবং নেতৃত্বের গুণ দেখতে পেয়েছি। তিনি হঠাৎ করেই জেলে সমাজে আবির্ভূত হন এবং তাদের জীবনে এক নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখান। তার ময়নাদ্বীপের স্বপ্ন যেন দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের জন্য মুক্তির প্রতীক। কিন্তু একইসাথে এই চরিত্র আমাকে ভাবিয়েছে, এই স্বপ্ন কতটা বাস্তব, আর কতটা মরীচিকা। এ ছাড়া ধনঞ্জয়, শীতল, সিধু দাস, রাসু, বৈকুণ্ঠ, অধর পীতম, হীরু প্রমুখ চরিত্র উপন্যাসটিকে আরও জীবন্ত ও বাস্তব করে তুলেছে। প্রত্যেকটি চরিত্র যেন একটি বাস্তব সমাজের প্রতিনিধি।

উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে অনুভব করেছি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু একটি গল্প লেখেননি, তিনি একটি জীবনচিত্র এঁকেছেন। বইটি যতবার পড়েছি; ততবারই এর গভীরতায় হারিয়ে গেছি। মনে হয়েছে, আমি যেন কেতুপুর গ্রামের একজন মানুষ, খুব কাছ থেকে দেখছি জেলেদের জীবন, তাদের কষ্ট, তাদের হাসি এবং তাদের অসহায়তা।

বিশেষ করে কুবের ও কপিলার সম্পর্ক, হোসেন মিয়াকে ঘিরে রহস্য এবং মহাজনদের শোষণের চিত্র আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে। লেখক এমনভাবে ঘটনাগুলো উপস্থাপন করেছেন, যা আমাকে পৃষ্ঠা থেকে চোখ সরাতে দেয়নি। আমার কাছে একজন লেখকের সবচেয়ে বড় সফলতা তখনই; যখন তিনি পাঠককে গল্পের ভেতরে নিয়ে যেতে পারেন। এদিক থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পূর্ণ সফল। কারণ তিনি জেলে সমাজের জীবনকে এতটাই বাস্তবভাবে তুলে ধরেছেন। যাতে মনে হয়েছে, আমি কোনো গল্প পড়ছি না বরং একটি বাস্তব জীবন প্রত্যক্ষ করছি।

উপন্যাসে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। এই ভাষা উপন্যাসটিকে আরও জীবন্ত, আরও বাস্তব করে তুলেছে। উপন্যাসের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বাস্তবতা। সহজ, সরল এবং আঞ্চলিক ভাষার মাধ্যমে লেখক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে জেলে সমাজের জীবনচিত্র তুলে ধরেছেন। চরিত্রগুলো এতটাই জীবন্ত যে, মনে হয়েছে তারা বাস্তব মানুষ। তাদের দুঃখ, কষ্ট, আশা এবং হতাশা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। এ ছাড়া প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক, দারিদ্র্য এবং সামাজিক শোষণের যে চিত্র এখানে ফুটে উঠেছে, তা অত্যন্ত শক্তিশালী।

ব্যক্তিগতভাবে এ উপন্যাসের কোনো দুর্বলতা খুঁজে পাইনি। কারণ এটি একটি পরিপূর্ণ এবং গভীর জীবনভিত্তিক উপন্যাস, যা প্রতিবার পড়লে নতুন অনুভূতি দেয়। আমার মতে, উপন্যাসটি পড়া মানে বাংলার বাস্তব সমাজকে জানা। এটি আমাদের শেখায়, অভাবের মধ্যেও মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকে, ভালোবাসে এবং স্বপ্ন দেখে। যারা বাস্তবধর্মী সাহিত্য ভালোবাসেন, যারা মানুষের জীবন ও সমাজকে গভীরভাবে জানতে চান, তাদের বইটি অবশ্যই পড়া উচিত। বিশেষ করে কুবের ও কপিলার সম্পর্কের পরিণতি এবং হোসেন মিয়ার রহস্য জানতে হলে বইটি অবশ্যই পড়তে হবে।

বই: পদ্মা নদীর মাঝি
লেখক: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রকাশনী: দূরবীণ
বিষয়: চিরায়ত উপন্যাস
মূল্য: ২০০ টাকা।

এসইউ

আরও পড়ুন