বই আলোচনা
আয়না: তীব্র ও ঝাঁঝালো জীবনবোধ
মুহিবুল হাসান রাফি
হাসির পেছনে যে অশ্রু আছে, কামড়ের পেছনে যে দরদ আছে, তা যারা ধরতে পারবেন; আবুল মনসুর আহমদের ব্যঙ্গের সত্যিকার রসোপলব্ধি করতে পারবেন তারাই। তার এ রসাঘাত কষাঘাতেরই মতো তীব্র ও ঝাঁঝালো। কেননা আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন বিচিত্র গুণের অধিকারী। তার বইসমূহ বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তিনি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ব্যঙ্গাত্মক লেখকদেরও একজন। ‘আয়না’, ‘ফুড কনফারেন্স’, ‘গালিভারের সফরনামা’র মতো কালজয়ী রচনা তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৮-১৯৭৯) রচিত আয়না (১৯৩৫) ব্যঙ্গগল্পের সংকলন। গল্পগুলোতে আপাত-কৌতুকের সঙ্গে সমাজের জন্য লেখকের দরদ ও দুঃখবোধ জড়িত। গল্পগুলো সম্পর্কে তিনি লিখেছেন—‘এই হাসির পেছনে কান্না লুকানো আছে।’ তিনি সমাজের সংস্কার চেয়েছেন। তাঁর রচনার একটি বড় গুণ হলো এই উদ্দেশ্যমূলকতা কখনো শিল্পকে ছাড়িয়ে যায়নি। লেখক স্বপ্নের মাধ্যমে যে চিত্র অংকন করেছেন, তা মনে হবে পুরোপুরি বাস্তব। তার প্রতিটি গল্পই বর্তমানের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক।
বইটিতে ছোটগল্পের সংখ্যা মোট সাতটি। এগুলো হলো: ‘হুজুর কেবলা’, ‘গো-দেওতা-কা-দেশ’, ‘নায়েবে নবী’, ‘লীডারে কওম’, ‘মুজাহেদীন’, ‘বিদ্রোহী সংঘ’ ও ‘ধর্মরাজ্য’। ধর্মকে পুঁজি করে ব্যবসা করার প্রথা সুপ্রাচীন। বাংলাদেশেও সেই প্রথা চলে আসছে সুদীর্ঘ কাল থেকে। দরগা, আশ্রম, পীরবাবা, আঞ্জুমান সভা এসবের সাথে বাঙালির পরিচয় নতুন নয়। আবহমানকাল থেকেই কিছু অসাধু ব্যক্তি এসবের নামে লোক ঠকিয়ে স্বার্থ আদায় করে যাচ্ছেন। ধর্মের প্রতি বাঙালির স্বভাবসুলভ শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও আনুগত্যকে ব্যবহার করছেন স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে। ‘আয়না’র গল্পগুলোর মাধ্যমে আবুল মনসুর আহমদ মুখোশধারী ধর্মীয় নেতাদের আসল চেহারা পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি উঠে এসেছে ধর্মীয় গোড়ামির কারণে সৃষ্ট ধর্মযুদ্ধের চিত্রও।
হুজুর কেবলায় বর্ণিত হয়েছে এক ভণ্ডপীরের কাহিনি, যে কি না তার লালসা চরিতার্থ করার জন্য শরীয়তের দোহাই দিয়ে মুরিদের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে তালাক পড়িয়ে নিজে বিয়ে করে। পীরের ভণ্ডামি শিক্ষিত যুবক এমদাদের চোখে ধরা পরলেও সে তা আটকাতে পারে না। বরং পীরের অন্ধ ভক্তদের রোষে পড়তে হয় তাকে। বাংলাদেশের গ্রামজীবনে প্রবলভাবে জেঁকে বসা পীর ব্যবসার বৃত্তান্ত বর্ণিত হয়েছে। ধর্মকে আশ্রয় করে কীভাবে একশ্রেণির মানুষ তাদের স্বার্থোদ্ধার করে তারই চিত্র এ গল্প। এক ভণ্ডপীর, পীরের কতিপয় সাগরেদ, তাদের ভণ্ডামি ও মিথ্যাচার, পীরের রিরংসাবৃত্তি চরিতার্থ করার শঠ-কৌশল এবং এক প্রতিবাদী যুবকের আখ্যান শিল্পিত হয়েছে আলোচ্য গল্পে।
- আরও পড়ুন
ওঙ্কার: একটি দেশের জন্মকথা
বর্তমানের প্রাসঙ্গিকতা থেকে একটুও যেন বদল হয়নি আবুল মনসুর আহমদের প্রতিটি ছোটগল্প। তারই উৎকৃষ্ট উদাহরণ ‘নায়েবে নবী’ গল্পটি। নায়েবে নবীতে দেখানো হয় নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ধর্ম ব্যবসায়ীরা কীভাবে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দেন। মৌলভীর ইতিহাস জ্ঞানের অভাব, একজনের মৃত্যুতে কীভাবে জানাজা পড়া হবে, তা নিয়ে দুই মৌলভীর বাহাস, জুতা পেটাপেটি, ইমামতি নিয়ে কাড়াকাড়ি, ধাক্কাধাক্কি, পরে মাতব্বরের মধ্যস্থতায় জানাজা। গল্পটি রঙ্গরসপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও গ্রামবাংলার এক আর্থসামাজিক বাস্তবতারই আলেখ্য।গ্রামের একজন মানুষের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মৌলভীদের মধ্যে যে বিবাদের চিত্র তিনি হাস্যরসের মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন তা সত্যিই অতুলনীয়।
‘মুজাহেদীন’ গল্পেও তেমনই দেখানো হয় হানাফি ও মোহাম্মদী মাজহাব নিয়ে বাহাসের নাম করে কীভাবে গ্রামের সাধারণ মানুষের মাঝে দাঙ্গা বাঁধিয়ে স্বার্থলোভীরা নিরাপদ দূরত্বে সরে যায়। মুজাহেদিন ধর্মীয় ভণ্ডামির কাহিনি, কীভাবে এক অঞ্চলের মধ্যে হানাফি ও মোহাম্মদী উভয় সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ বসবাসকে এক বহিরাগত মাওলানা বাহাসের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সংঘাতে পরিণত করে। উভয়পক্ষে সংঘর্ষ ও গ্রেপ্তার, পুলিশি তদন্ত, পরিনামে গ্রামের প্রায় সবার জেল-জরিমানা। ওদিকে উভয় সম্প্রদায়ের মাওলানার বাহাস সভার বিবরণ সম্বলিত দুটি পৃথক পুস্তিকায় উভয়পক্ষের জয় দাবি।
‘লীডারে কওম’ গল্পটিতে দেখানো হয় এক শ্রেণির ধর্মীয় নেতাদের চিত্র, যারা নিঃস্বার্থভাবে ধর্ম প্রচারের নাম করে ধর্মকে ব্যবহার করে সমাজে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। একাধারে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভণ্ডামির কাহিনি, আহলে-হাদীস ও হানাফিদের বিবাদ, হানাফি-মোহাম্মদীর বাহাস। এ সুযোগে ইসমাইল সাহেবের ‘আহলে-হাদিস-গুর্য’ নামক পত্রিকা প্রকাশ, হানাফি-নিন্দার সঙ্গে সঙ্গে কিছু ইংরেজ নিন্দা ও ইসমাইল সাহেব কর্তৃক পত্রিকার মালিকানা গ্রহণ, মাজহাবি-ঝগড়া বিবাদের নিন্দা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে মুসলমান সম্প্রদায়ের তুলনা, এহ্তেকাফের সাহায্যে মুসলিম বঙ্গের অদ্বিতীয় নেতা হযরত মওলানা সাহেবের অঞ্জুমান-তবলিগুল-ইসলাম নামক আঞ্জুমান কায়েম, সর্বত্র শাখা স্থাপন, চাঁদা আদায়, বন্যায় রিলিফের জন্য টাকা সংগ্রহ, খেলাফত আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ, আহলে হাদিস কনফারেন্স, স্বরাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, টাকা-পয়সার হিসাবে গোলমাল, তবলিগ, আঞ্জুমান ও খেলাফত নেতা মাওলানার কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান নেতায় উন্নতি, গ্রেফতার, কারাদণ্ড কিন্তু স্বাস্থ্যগত কারণে তিন মাসের মধ্যে মুক্তি এবং স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য রাঁচি গমন।
‘বিদ্রোহী সংঘ’ ইংরেজবিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবী দলের কর্মী ও নেতার স্ববিরোধিতার স্যাটায়ার। ‘ধর্ম-রাজ্য’ হিন্দু ও মুসলমানের সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও ইংরেজের ভূমিকার আক্ষরিক চিত্র। দেখা যাচ্ছে, আয়না গ্রন্থে তিনি যেমন ধর্ম ব্যবসায়ী ফতোয়াবাজ মৌলবাদী ও স্বার্থপর, সুবিধাবাদী রাজনীতিক; তেমনই বাংলার দুই প্রধান সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমান সমাজের সাম্প্রদায়িকতাকে সমান তীব্রতার সঙ্গে ব্যঙ্গ, পরিহাস, সমালোচনা করেছেন।
- আরও পড়ুন
চরিত্রহীন: মানবমনের গভীর উপলব্ধি
আবুল মনসুর আহমদ তাঁর আয়নায় যে কেবল মুসলমানদেরই ধর্মান্ধতা তুলে ধরেছেন তা নয়। হিন্দুদের ধর্মীয় গোঁড়ামিকেও তিনি ব্যঙ্গ করেছেন তাঁর ‘গো-দেওতা-কা-দেশ’ গল্পটিতে। গল্পটিতে মূলত গোহত্যা বন্ধের জন্য মানুষে মানুষে হানাহানির চিত্রকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আবুল মনসুর আহমদ সমকাল, সমাজ, জনগণ ও রাজনীতি সচেতন গল্পকার। সমাজের অতি-নিকটে কথকের বসবাস। জীবনের কঠিন বাস্তবতায় পায়ে হেঁটে চলায় নানা অনুঘটনা ভিড় করেছে তার অভিজ্ঞতার ডালিতে।
এসইউ