বেশ সাবধানে বলতে হয়, সিনেমাটা একটু অন্য রকম
‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি’ সিনেমাটা কেমন? কেউ জানতে চাইলে এককথায় সেটা বলা মুশকির হবে। কারণ সিনেমা জিনিসটা কেমন, তার একটা অদ্ভুত ধারণা আগে থেকেই তৈরি হয়ে আছে আমাদের এখানে। সুতরাং, বেশ সাবধানে বলতে হয় যে, সিনেমাটা একটু অন্য রকম।
সিনেমায় একজন নায়ক আছে, কিন্তু তার কিছুই করার নেই! সিনেমাজুড়ে যেহেতু তাকে দেখা গেছে, আপাতদৃষ্টিতে তিনিই ছবির নায়ক। কিন্তু ঘুরিয়ে যদি বলতে হয়, গল্পটাই ছবির নায়ক। গল্পটার পেটের ভেতর আরেকটা গল্প, সেটার পেটের ভেতর আরেকটা। এভাবে একের পর এক গল্পবলা মানুষের খপ্পরে পড়ছিলেন ছবিটার নায়ক ইমতিয়াজ বর্ষণ। সিনেমা করতে এসে তার ভাগে যেসব গল্প জোটে, তা অন্য আর দশটা গল্পের মতো নয়। যেমন, বছর পাঁচ আগে তিনিই অভিনয় করেছিরেন ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ নামের এক অদ্ভুত ছবিতে!
‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি’ রাজনৈতিক সিনেমা। বানিয়েছেন আহমেদ হাসান সানি। দেখতে বসেছিলাম একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রীর সঙ্গে, তার ওপর তিনি একজন জেন-জি, জুলাই আন্দোলনের গভীর পর্যবেক্ষক। পর্দায় দেখানো গল্পের পাশাপাশি খেয়াল করছিলাম তার প্রতিক্রিয়াও। যেমন, এক জায়গায় হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন, ‘এখানে ভাষানীর কথাও বলা দরকার ছিল!’
ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব উপলক্ষে গতকাল ১৬ জানুয়ারি মুক্তি পেলো ‘এখানে রাজনৈতিক আলাপ জরুরি’। একটা জরুরি কথা বলে নেওয়া ভালো যে, সরকার পরিবর্তন না হলে হয়তো এই ছবি মুক্তি দেওয়া হতো না নির্মাতাদের। অন্তত পর্দায় যা দেখানো হয়েছে, তা দেখানো ছিল প্রায় অসম্ভব। অনেক জানা কথা, প্রতিষ্ঠিত সত্য উচ্চারণ যখন কঠিন হয়ে পড়েছিল, সদ্য সে রকম সময় পার করতে না করতেই এমন নির্মাণ অনেককে সাহসী করে তুলবে।

সিনেমায় অনেক রাজনৈতিক আলাপ ছিল। অজপাড়া গাঁয়ের দুজন মানুষের মুখ থেকে অমন আলাপ দর্শককে ধন্দে ফেলে দিতে পারে। যদিও রাজনীতিসচেতন ওরকম অনেক মানুষ এখনও অজপাড়া-গাঁয়ে বাস করেন। তাদের মুখ থেকেই বেরিয়ে আসে সত্য বচন – স্টেটম্যান হওয়ার সুযোগ ছিল শেখ মুজিবের! তারাই আবার বলেন সেই পরিবেশের কথা, যখন ভাষানীকে পাওয়া যায় ‘জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো’ শ্লোগানে। কীভাবে আর কার স্বার্থে দেশ ভাগ হলো, কেন ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করে এসবও তাদের মুখ থেকে জানা যায়। সাগরপাড়ের ওই মানুষগুলোর মাধ্যমে নির্মাতা দর্শকদের স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭৪ সালের দুর্বিক্ষের কারণ অসাম্য, অন্যায্য বণ্টন। সবচেয়ে বেশি শষ্য উৎপাদিত হওয়ার পরও তাই সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্বিক্ষের ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিল বাংলা। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরও কি সেই অন্যায্যের ছায়া ছড়াতে শুরু করলো?
ছবিটা প্রথমার্ধের গতি হারায় দ্বিতীয়ার্ধে। যদিও জুলাই আন্দোলনের তরতাজা ফুটেজে সেটি হয়ে ওঠার কথা ছিল আরও শক্তিশালী। কোথায় যেন সম্পাদকের তাড়াহুড়ো, চূড়ান্ত করার আগে আরও একবার দর্শকের চোখে না দেখার ছাপ রয়েছে এই অংশে। কখন ফ্ল্যাশব্যাকে যাচ্ছে আর কখন ফিরছে, সেটা বুঝতে মনে মনে সম্পাদনা করে নিতে হয় দর্শককে। তবে প্রথম নির্মাণ হিসেবে এই সিনেমাকে দশে ছয় দেওয়া যায়। কারণ চোখের জন্য আরামদায়ক সবুজ, দৃশ্য নির্মাণের প্রবণতা, আবহসংগীতে মায়া অনেক ভ্রান্তিকে ম্লান করে দেয়। সবচেয়ে বড় কথা গল্প, গল্পের ভেতর গল্প, গল্পের গায়ে গল্প ছবিটিকে স্বপ্নদৃশ্যের মতো করে রেখেছে।
সিনেমা শেষ হলো। দুজন দর্শকের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে নিতে ইচ্ছে হলো। পাশে বসা জেন-জি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রী বললেন, সদ্যবিদায়ী জুলাই আন্দোলন এখনও মানুষের মুখস্ত। ছবিতে ঘটনা পরম্পরায় গোলযোগ রয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধ আরও উপভোগ্য হতে পারতো, কেন হয়নি তা তিনি বললেন না। তবে প্রথমার্ধের অনেক তথ্য, সত্য, যুক্তি তাকে চমৎকৃত করেছে।
একজন সিনেসাংবাদিকে জিজ্ঞেস করি, কেমন দেখলেন? তিনিও দ্বিতীয়ার্ধ নিয়ে হতাশার কথা জানালেন। প্রথম ছবি হিসেবে গ্রেস মার্ক দেওয়া যায় কি না জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘নির্মাতা পেটে ক্ষুধা নিয়ে ছবি বানিয়েছেন দর্শক কি তা মানবেন?’
আরও পড়ুন:
অন্তর্বর্তী সরকারও এই শিল্পকে অগ্রাধিকার তালিকায় রাখেনি
আর্থিক সহায়তা না পেলে উৎসবের মান ও ব্যাপ্তি বজায় রাখা কঠিন
যে ঠাকুরগাঁওয়ে বসে গান করছে, তার কাছে বাজেটের কতটুকু যাচ্ছে
আরএমডি