আর্থিক সহায়তা না পেলে উৎসবের মান ও ব্যাপ্তি বজায় রাখা কঠিন
রেইনবো ফিল্ম সোসাইটির আয়োজনে গত শনিবার শুরু হয়েছে চব্বিশতম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। উৎসবের এ আসরের নানান দিক নিয়ে ইংরেজি ফিল্ম ম্যাগাজিন কাট টু সিনেমার সঙ্গে কথা বলেছেন উৎসব পরিচালক আহমেদ মুজতবা জামাল। কিঞ্চিৎ পরিবর্তন ও পরিমার্জন করে বাংলায় সেটি প্রকাশ করা হলো জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য।
প্রশ্ন: তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের যাত্রার দিকে ফিরে তাকালে আপনার অনুভূতি কী?
উত্তর: ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (ডিআইএফএফ) দীর্ঘযাত্রার দিকে ফিরে তাকালে প্রথমেই গভীর কৃতজ্ঞতার অনুভূতি আসে। এই উৎসবটি শুরু হয়েছিল একটি সহজ কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নিয়ে। সেটা হচ্ছে বাংলাদেশে একটি সুস্থ চলচ্চিত্র সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করা এবং বিশ্ব সিনেমার সামাজিক গুরুত্ব দর্শকদের কাছে তুলে ধরা। তেত্রিশ বছরেরও বেশি সময় পর এটি দেশের অন্যতম সম্মানজনক সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
প্রশ্ন: এই সাফল্যের পেছনে মূল চালিকাশক্তি কী ছিল?
উত্তর: এই অগ্রগতি একদিনে আসেনি। বছরের পর বছর দলগত প্রচেষ্টা, অধ্যবসায় এবং সুস্পষ্ট সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির ফল এটি। প্রতিটি আসরই নিজস্ব চ্যালেঞ্জ ও অর্জন নিয়ে এসেছে, আর সব মিলিয়ে এগুলো বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ভুবনের বিকাশের একটি ইতিহাস তুলে ধরে।
প্রশ্ন: আপনার কাছে এই উৎসবের সবচেয়ে ইতিবাচক দিকটি কী?
উত্তর: সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক বিষয় হলো উৎসবটি সবসময় অশ্লীলতা, অতিসেনসেশন এবং সস্তা বাণিজ্যিক ফর্মুলার বিরুদ্ধে নীতিগত অবস্থান নিয়েছে। উৎসবটি এমন চলচ্চিত্রকে গুরুত্ব দিয়েছে, যা দর্শকের বুদ্ধিমত্তাকে সম্মান করে এবং শিল্পমান বজায় রাখে। আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, ডিআইএফএফ একটি সাংস্কৃতিক বিকল্প হয়ে উঠেছে, যেখানে অর্থবহ গল্প বলার সুযোগ তৈরি হয়।
আরেকটি বড় প্রাপ্তি হলো তরুণ ও নবীন নির্মাতাদের জন্য আমরা যে প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পেরেছি। অনেক নতুন নির্মাতা ডিআইএফএফের মাধ্যমে বিশ্বচলচ্চিত্র ধারার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, নিজেদের দক্ষতা শাণিত করেছেন এবং বাংলাদেশের সমান্তরাল চলচ্চিত্র আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছেন।

প্রশ্ন: এখনকার এই উৎসবটি আপনার কাছে কেমন?
উত্তর: এখন ডিআইএফএফ একটি আন্দোলন। বাংলাদেশ ও বিশ্ব সিনেমার মধ্যে একটি নির্ভরযোগ্য সেতুবন্ধন হিসেবে ডিআইএফএফকে গড়ে উঠতে দেখা সত্যিই পরম তৃপ্তির। এটি প্রমাণ করে যে দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক কাজ টেকসই প্রভাব তৈরি করতে পারে, আর এই ধারাবাহিকতাই আমাদের এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।
প্রশ্ন: এ বছরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক বা আকর্ষণটি কী?
উত্তর: ২০২৬ সালের আসরের অন্যতম আকর্ষণ হলো অংশগ্রহণকারী দেশের রেকর্ডসংখ্যা। মোট ৯৩টি দেশের ২৪৬টি চলচ্চিত্র নয়টি বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে। এটি ডিআইএফএফের প্রতি বিশ্ব চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আস্থার প্রতিফলন।
প্রশ্ন: ভেন্যু বাড়ানোর কথা প্রতি বছরই শোনা যায়!
উত্তর: আগের মতো আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মিলনায়তনে প্রদর্শনী হবে। এ বছর পরিধি কিছুটা বেড়েছে। ঢাকার স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস ও কক্সবাজারের লাবনী পয়েন্টে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থী ও তরুণ সিনেমাপ্রেমীরা এমনকি কক্সবাজারের পর্যটকেরাও সিনেমা দেখতে পারবেন।
প্রশ্ন: চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
উত্তর: শুরু করার আগপর্যন্ত প্রয়োজনীয় বাজেটের মাত্র ১০ শতাংশ এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা গেছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের সহযোগীদের সঙ্গে আমরা সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ করেছি। এ বছর নির্বাচিত চলচ্চিত্রগুলোর সেন্সর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা কিছুটা সময়সাপেক্ষ হলেও নির্বিঘ্ন প্রদর্শনের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আমাদের টিম পূর্ণ উদ্যমে কাজ করে গেছে।
প্রশ্ন: এ বছর দর্শক ও সিনেমাপ্রেমীরা কী নতুন অভিজ্ঞতা পেতে পারেন?
উত্তর: এ বছরের উৎসবে বেশ কিছু নতুন সংযোজন রয়েছে, পাশাপাশি আগের জনপ্রিয় বিভাগগুলোরও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের অভূতপূর্ব ব্যাপ্তি। ৯৩টি দেশের ২৪৬টি চলচ্চিত্র। এটি ডিআইএফএফের ৩৩ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যা, যা স্থানীয় দর্শকদের বিভিন্ন সংস্কৃতি, দৃষ্টিভঙ্গি ও চলচ্চিত্র ভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেবে।
নয়টি বিভাগে রয়েছে বৈচিত্র্য-এশিয়ান সিনেমা প্রতিযোগিতা, নারী নির্মাতাদের চলচ্চিত্র, আধ্যাত্মিক চলচ্চিত্র, স্বল্পদৈর্ঘ্য ও স্বাধীন চলচ্চিত্র, শিশুতোষ চলচ্চিত্রসহ আরও অনেক কিছু।
এ বছরের আরেকটি বিশেষ সংযোজন হলো ওয়েস্ট মিটস ইস্ট স্ক্রিনপ্লে ল্যাবের সম্প্রসারণ। আগে এটি শুধু দক্ষিণ এশীয় নির্মাতাদের জন্য উন্মুক্ত ছিল, এখন তা পুরো এশিয়ার নির্মাতাদের জন্য উন্মুক্ত। নির্বাচিত সেরা দশটি প্রকল্প চার দিনের নিবিড় মেন্টরশিপ কর্মশালায় অংশ নেবে এবং পরে ফিল্মহাটে পিচিং সেশনে যুক্ত হবে। এই উদ্যোগটির মাধ্যমে সরাসরি নবীন নির্মাতাদের সহায়তা করা হয় এবং প্রযোজনা, সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক পরিচিতির সুযোগ সৃষ্টি করে।
প্রশ্ন: চীনা ছবি নিয়ে সম্ভবত বিশেষ কিছু থাকছে এবার?
উত্তর: সাম্প্রতিক আসরগুলোতে এটি একটি নিয়মিত আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি ৯ থেকে ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ মিলিটারি মিউজিয়ামের থ্রি-ডি আর্ট গ্যালারিতে একটি বৃহৎ চিত্রকলা প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে, যার কিউরেটর শিল্পী লুৎফর মাহমুদা। এটি চলচ্চিত্রের সঙ্গে ভিজ্যুয়াল আর্টের একটি আন্তঃবিভাগীয় সংযোগ তৈরি করবে।
প্রশ্ন: মাস্টারক্লাস নিয়ে তরুণ নির্মাতাদের আগ্রহ থাকে। এ নিয়ে কিছু বলুন।
উত্তর: মাস্টারক্লাস বিভাগটি চতুর্থবারের মতো ফিরছে। আগের আসরগুলোতে মাজিদ মাজিদি ও অঞ্জন দত্তের মতো ব্যক্তিত্বরা এই সেশন পরিচালনা করেছেন। এ বছরের মাস্টারক্লাস অনুষ্ঠিত হবে ১৭ জানুয়ারি। আমন্ত্রিত অতিথিরা হলেন সুইস চলচ্চিত্র সমালোচক তেরেসা ভেনা, ক্রোয়েশিয়ার চলচ্চিত্র প্রভাষক আলেক্সান্দ্রা মার্কোভিচ এবং বাংলাদেশের শিল্প নির্দেশক লিটন কর। সব মিলিয়ে, এ বছরের উৎসব শুধু চলচ্চিত্র প্রদর্শনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আলোচনা, কর্মশালা, প্রদর্শনী ও আন্তর্জাতিক সংযোগের মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা উপহার দেবে।
প্রশ্ন: উৎসব পরিচালক হিসেবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল আপনার সামনে?
উত্তর: সবচেয়ে বড় এবং ধারাবাহিক চ্যালেঞ্জ হলো পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা। এত বড় পরিসরের একটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন করতে উল্লেখযোগ্য বাজেট প্রয়োজন, কিন্তু বাস্তবে নিশ্চিত অর্থের পরিমাণ প্রায়ই প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম থাকে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সরকার ও বেসরকারি খাত থেকে সময়মতো আর্থিক সহায়তা না পেলে ডিআইএফএফ যে মান ও ব্যাপ্তির জন্য পরিচিত, তা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
এমআই/আরএমডি