ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. ফিচার

জেফরি এপস্টেইন: ধনকুবেরের মুখোশে ‘বিকৃত যৌনাচার’

ফিচার ডেস্ক | প্রকাশিত: ০৫:০৬ পিএম, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে ‘এপস্টেইন ফাইলস’। যৌন অপরাধী ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী জেফরি এপস্টেইনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নথিপত্র বা এফআইলগুলো মার্কিন রাজনীতিতে এক বিশাল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই নথি প্রকাশের দাবিতে চাপ তৈরি হচ্ছিল। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে মানি-লন্ডারিং ও যৌন অপরাধের তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ৩০ লাখের বেশি পৃষ্ঠার নথি প্রকাশ করা হয়।

এই নথি শুধু একটি সাধারণ মামলা সংক্রান্ত নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত একটি বিশাল নেটওয়ার্কের তথ্য ধারণ করেছে। জেফরি এপস্টেইনের অপরাধ ইতিহাস দীর্ঘ এবং বিতর্কিত। এই বিতর্কে প্রিন্স অ্যান্ড্রু, প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প, নিউ মেক্সিকোর প্রাক্তন গভর্নর বিল রিচার্ডসন, আইনজীবী অ্যালান ডারশোভিটজ, গায়ক মাইকেল জ্যাকসন এবং পদার্থবিদ স্টিফেন হকিংয়, নরেন্দ্র মোদীসহ আরও প্রভাবশালী মানুষের নাম জড়িয়েছে।

jagonews২০০৮ সালে ফ্লোরিডার পাম বিচে এক কিশোরীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে জেফরি এপস্টেইনের বিরুদ্ধে প্রথম তদন্ত শুরু হয়। সে সময় তিনি প্রভাব খাটিয়ে প্রসিকিউটরদের সঙ্গে একটি আপিল চুক্তির মাধ্যমে বড় সাজা থেকে বেঁচে যান, তবে যৌন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হন।

এখন অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে এই জেফরি এপস্টেইন কে? কেন তার নাম বার বার উঠে আসছে? তিনি কতটা প্রভাবশালী ছিলেন যে এত অপকর্মের পরও প্রভাবশালীদের প্রিয় ছিলেন? আসুন আজ জেফরি এপস্টেইনের জন্ম থেকে মৃত্যু, সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা ছেলেটির বিশ্বের অন্যতম বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ হয়ে ওঠার গল্প শোনাব।

এপস্টেইন ফাইল কী? কেন এতো আলোচনায়

জেফরি এপস্টেইন এ নামটি শুনলেই আজও অনেকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। পুরো নাম জেফরি এডওয়ার্ড এপস্টেইন। ১৯৫৩ সালে নিউ ইয়র্কে একটি মধ্যবিত্ত ইহুদি পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এপস্টেইনের। এপস্টেইন ডাল্টন স্কুলে শিক্ষক হিসেবে তার পেশাগত জীবন শুরু করেন। ১৯৭৬ সালে স্কুল থেকে বরখাস্ত হোন তিনি।

jagonewsধীরে ধীরে সে অর্থ, ক্ষমতা এবং প্রভাবের এমন জাল বুনে ফেলেছিল যা শুধু আমেরিকান সমাজ নয়, পুরো বিশ্বের উচ্চবিত্ত সমাজকেই নাড়া দিয়েছিল। তিনি পরিচিত ছিলেন বিনিয়োগকারী, ধনকুবের, কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকরভাবে পরিচিত তার যৌন অপরাধ ও কিশোরী পাচারের জন্য।

১৯৭৬ সালে স্কুল থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর স্টিয়ার্নসের আমেরিকান স্টক এক্সচেঞ্জে একজন ফ্লোর ট্রেডারের জুনিয়র এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর তার ক্যারিয়ারে দ্রুত উন্নতি হতে থাকে। ১৯৮২ সালে নিজেই কোম্পানি খুলেন জে এপস্টেইন অ্যান্ড কোং নামে। এখানে তার সার্ভিস নিতে হলে ক্লায়েন্টদের এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক হতে হতো। তিনি তাদের বিনিয়োগের পরামর্শ দিতেন। নিজেকে দেখতেন বিলিয়নিয়ারদের অর্থ ব্যবস্থাপনা বিষয়ের স্থপতি হিসেবে। তিনি শুধু বিনিয়োগের ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ থাকতেন না, তাদের সমাজসেবা ও কর সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়েও আশ্বস্ত করতেন। এভাবেই ক্ষমতাধরদের সঙ্গে তার পরিচয় হতে থাকে।

১৯৯২ সালে তিনি ম্যানহাটনের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত বাড়ির মালিক হন। কর সংক্রান্ত কারণে তিনি অন্তত ১৯৯৬ সাল থেকে তার ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন সেন্ট টমাস দ্বীপ থেকে। ওই দ্বীপের কাছে লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপটি কিনে ফেলেন তিনি। এ দ্বীপ থেকে তিনি তার ফাউন্ডেশনের কাজও করতেন, যার নাম ছিল ‘জেফরি এপস্টেইন সিক্স ফাউন্ডেশন’। তার ফাউন্ডেশনটি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬.৫ মিলিয়ন ডলার ডোনেশন দিয়েছিল।

jagonewsশূন্য দশকের শুরুর দিকে বিল ক্লিনটনের সঙ্গে পরিচয় তাকে তারকা খ্যাতি এনে দেয়। বিল ক্লিনটনের ফাউন্ডেশনের আফ্রিকা সফরের এইডস প্রতিরোধ প্রজেক্টে তার ব্যক্তিগত ৭২৭ বিমান ব্যবহার করতে দেন। সেখানে তিনি ও বিল ক্লিনটনসহ হলিউড অভিনেতা কেভিন স্পেসি ও কমেডিয়ান ক্রিস টাকারও যোগ দেন। ২০০২ ও ২০০৩ সালের মধ্যে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বিমানে ক্লিনটন একাধিকবার ভ্রমণ করেন।

সমাজে তার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান থাকলেও এর আড়ালে তার ছিল অন্ধকার জীবন। তার নারীসঙ্গের ব্যাপারটা গোপন ছিল না। তবে তিনি অপ্রাপ্তবয়স্কদের তার দ্বীপে কিংবা ম্যানহাটনের বাড়িতে নিয়ে যেতেন। তাদের দিয়ে শরীর মালিশ করাতেন। তখন তাদের কাপড় খুলতে বাধ্য করতেন। এরপর হস্তমৈথুন করতেন কিংবা তাদের সঙ্গেই যৌন সম্পর্ক করতেন। এভাবে অনেককেই ধর্ষণ করেছেন।

তিনি আবার এসবের বিনিময়ে পারিশ্রমিকও দিতেন। ৩০০ ডলার থেকে ১,০০০ ডলার পর্যন্ত হতো পরিমাণ। আমেরিকার বাইরে থেকেও অল্পবয়সী তরুণীদের ধরে আনতেন। তাদের বলতেন তাকে আরও কিশোরীদের এনে দিতে। তার চাহিদা ছিল কম বয়সী তরুণী। এভাবে তিনি একটা ‘সেক্সুয়াল পিরামিড স্কিম’ তৈরি করেন। কেউ অভিযোগ করতে চাইলে প্রভাবশালী আইনজীবী কিংবা গোয়েন্দাদের দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করাতেন।

এপস্টেইন ফাইল কী? কেন এতো আলোচনায়

২০০৫ সালে ফ্লোরিডা পুলিশের কাছে এক নারী অভিযোগ করেন, তার মেয়েকে এক মধ্যবয়সী পুরুষ যৌন হয়রানি করেছে। পাম বিচের গোয়েন্দারা তদন্ত করতে গিয়ে একাধিক তরুণীর সাক্ষ্যে প্রমাণ পান, এপস্টেইন তাদেরকে যৌন হয়রানি করেছেন। এ মামলাটি তখন এফবিআইয়ের কাছে চলে যায়। এরপরের বছরগুলোতে আরও অনেক তরুণী তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। তার অপরাধ করেছিল সে একটি সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল, যেখানে অনেক প্রভাবশালী মানুষের নাম জড়িত ছিল। কিন্তু অনেকেই বলেছে, ‘আমি শুধু পরিচিত ছিলাম, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না।’

jagonewsপ্রথম ২০২৫-২৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘এপস্টেইন ফাইলস’, যা হলো বিপুল পরিমাণ নথি, ছবি এবং ভিডিওর সংকলন। এখানে রাজনীতিবিদ, রাজপরিবারের সদস্য, ব্যবসায়ী এবং বিনোদন জগতের অনেক নাম এসেছে। যদিও নামের মানেই অপরাধ প্রমাণিত হয় না, তথাপি প্রকাশিত নথিগুলো দেখিয়ে দেয় যে এপস্টেইনের প্রভাব কতটা বিস্তৃত।

এপস্টেইনের সবচেয়ে আলোচিত সম্পদ ছিল তার দুইটি ব্যক্তিগত দ্বীপ-লিটল সেন্ট জেমস এবং গ্রেট সেন্ট জেমস, যাকে মিডিয়ায় ‘পেডোপাইল আইল্যান্ড’ বা ‘জঘন্য কার্যক্রমের কেন্দ্র’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেখানে কিশোরী ও তরুণীদেরকে আনা হতো বোট, হেলিকপ্টার এবং প্লেন দ্বারা। সাক্ষ্য ও অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক কিশোরীকে খুবই কম বয়সেই (১২-১৪ বছর বয়স) সেই দ্বীপে আনা হয়েছিল। এই দ্বীপে চলত ধর্ষণ, যৌন শোষণ, মানুষের মাংস খাওয়াসহ জঘন্য কর্মকাণ্ড। যদিও পরবর্তীতে এই দ্বীপ বিক্রি করে দেওয়া হয়।

শিশুদের ধর্ষণ, যৌন শোষণ এবং অন্যান্য জঘন্য কর্মকাণ্ড শুধু যে এপস্টেইন একাই করতেন তা কিন্তু নয়। তার এই কাজে তাকে সহযোগিতা করেন তারই ব্যক্তিগত সহযোগী ঘিসলেন ম্যাক্সওয়েল। এপস্টেইনের নেটওয়ার্কে অনেক উচ্চপ্রোফাইল ব্যক্তির নাম পাওয়া গেছে। ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রু থেকে শুরু করে মার্কিন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিনটন, প্রযুক্তি নেতা ইলন মাস্ক ও বিল গেটস-তাদের নাম নথিতে এসেছে। যদিও প্রত্যেকে দাবি করেছেন, তারা কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তবে নথিতে তাদের উপস্থিতি বা যোগাযোগের তথ্য রয়েছে। বিনোদন জগতের কিছু নামও এসেছে, যেমন মাইকেল জ্যাকসন, ডায়ানা রস ইত্যাদি।

jagonews২০১৯ সালের জুলাইয়ে ফ্রান্স থেকে ভ্রমণ শেষে ফেরার সময় নিউ জার্সি বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। নিউইয়র্কের ফেডারেল কোর্টে নারী পাচারের মামলায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়। ২০১৯ সালে নিউইয়র্কে হাজতে এপস্টেইনের মৃত্যু হয়। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, এটি আত্মহত্যা। তবে মৃত্যুর চারপাশে এখনো রহস্য, ষড়যন্ত্র এবং নানা তত্ত্ব ঘোরে। তার মৃত্যুর পর বিভিন্ন নথি ও ই-মেইল প্রকাশিত হয়, যা আরও অনেক তথ্য ফাঁস করে। এই নথিগুলো দেখায়, এপস্টেইনের অপরাধ শুধু ব্যক্তিগত নয় এটি একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের অংশ ছিল।

জেফরি এপস্টেইনের গল্প শুধু এক ব্যাক্তির অপরাধের কাহিনী নয়। এটি একটি শিক্ষা, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় ক্ষমতা থাকলেই ন্যায় হয় না। স্বচ্ছতা, বিচার এবং নৈতিকতার গুরুত্ব কখনো কমে না। তার জীবন ও কার্যক্রম ইতিহাসে এক অন্ধকার ছাপ রেখে গেছে, যা আজও মানুষের কৌতূহল এবং আতঙ্ক উভয়ই উদ্রেক করে। তার কর্মকাণ্ড এবং মৃত্যুর পর প্রকাশিত নথি বহু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, কিন্তু আরও অনেক রহস্য এখনও অমীমাংসিত। এটি ইতিহাসে এক গভীর ছাপ রেখেছে, যেখানে ধন, ক্ষমতা, প্রভাব এবং মানবিক মূল্যবোধের সংঘাত স্পষ্ট।

আরও পড়ুন
খালেদা জিয়াকে যেভাবে মনে রাখবে ইতিহাস
ইতিহাসে বিশ্ব নেতাদের আলোচিত উত্থান, পতন ও পরিসমাপ্তি

কেএসকে

আরও পড়ুন