প্রাচীন মিশরে পারফিউম ব্যবহার হতো মমি সংরক্ষণে
প্রাচীন মিশরের পুরোহিতরা বিশ্বাস করতেন, দেবতারা মানুষের ভাষা শোনেন না তারা অনুভব করেন সুগন্ধ
নিজেকে আকর্ষণীয় ও প্রেজেন্টেবল করতে সুগন্ধি বা পারফিউমের আসলে বিকল্প নেই। একেকজন একেক ধরনের সুগন্ধি ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। ফুল, ফল, গাছের নির্যাস থেকে তৈরি হয় সুগন্ধি। এর দাম হয় স্থান, কাল আর ব্র্যান্ড ভেদে ১০০ থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত।
কিন্তু জানেন কি, যেই সুগন্ধি এখন আপনার শরীরের ঘাম এবং অন্যান্য গন্ধ লুকানোর জন্য ব্যবহার করি তা এক সময় ব্যবহার হতো মৃত মানুষের জন্য। প্রাচীন মিশরের পুরোহিতরা বিশ্বাস করতেন, দেবতারা মানুষের ভাষা শোনেন না তারা অনুভব করেন সুগন্ধ। তাই মন্দিরে পূজার সময় ধূপ, রেজিন, মির আর সুগন্ধি তেল পোড়ানো হতো। ধোঁয়ার সরু রেখা আকাশে উঠে যেত, আর মানুষ ভাবত তাদের প্রার্থনা দেবতাদের কাছে পৌঁছে গেছে।
এক তরুণ পুরোহিতের কল্পনা করুন সবার প্রথম আলোয় সে দেবতার মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ছোট পাত্রে সুগন্ধি তেল। সে মূর্তির গায়ে তেল মাখিয়ে দিচ্ছে, যেন দেবতা জেগে ওঠেন, যেন মন্দিরে প্রাণ ফিরে আসে। এই আচার ছিল পবিত্র দায়িত্ব, কারণ সুগন্ধি ছিল দেবতার উপস্থিতির প্রতীক।
মিশরীয়রা মৃত্যু মানেই শেষ এ কথা বিশ্বাস করত না। তারা ভাবত মৃত্যুর পরও আত্মা বেঁচে থাকে। তাই মৃতদেহকে সংরক্ষণ করা জরুরি ছিল, যাতে আত্মা ফিরে এসে দেহকে চিনতে পারে। মমি তৈরির সময় দেহে লাগানো হতো নানা সুগন্ধি রেজিন, গাছের নির্যাস ও তেল। এগুলো শুধু গন্ধ ঢাকত না, বরং সংরক্ষণেও সাহায্য করত।
মমি তৈরির ঘরে কাজ করা এক কারিগরের কথা ভাবুন তার হাতে ছোট পাত্র, তাতে ঘন সুগন্ধি তরল। সে মৃতদেহের গায়ে ধীরে ধীরে লাগাচ্ছে, যেন শেষবারের মতো মানুষটিকে সম্মান জানাচ্ছে। এই কাজ ছিল এক ধরনের আধ্যাত্মিক বিদায়।
মিশরের বিখ্যাত রানি ক্লিওপেট্রার গল্পে সুগন্ধির উল্লেখ না থাকলে ইতিহাসই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিংবদন্তি আছে, তিনি এমন সুগন্ধি ব্যবহার করতেন যার সুবাস নাকি দূর থেকে তার উপস্থিতি জানান দিত। বলা হয়, যখন তিনি নদীপথে ভ্রমণ করতেন, তার নৌকার পালেও সুগন্ধি লাগানো থাকত যেন বাতাসই তার আগমনের সংবাদ বহন করে। এ গল্প সত্য হোক বা কিংবদন্তি এটি প্রমাণ করে যে সুগন্ধি তখন ক্ষমতা ও আকর্ষণের প্রতীক ছিল।
সময়ের চাকা ঘুরে যখন সুগন্ধির যাত্রা মিশর থেকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে পৌঁছাল রোমে, তখন এটি নতুন রূপ পেল। রোমানরা সুগন্ধিকে বিলাসের চিহ্ন বানাল। ধনী পরিবারে অতিথি এলে ঘরে সুগন্ধি ছিটানো হতো, স্নানের পানিতে তেল মেশানো হতো, এমনকি পোশাকেও সুগন্ধ লাগানো হতো।
এক রোমান অভিজাতের ভোজের দৃশ্য কল্পনা করুন চারদিকে মশাল জ্বলছে, টেবিলে ফল আর মদ, আর বাতাসে ভাসছে গোলাপ ও মশলার মিশ্র গন্ধ। অতিথিরা শুধু খাবারের স্বাদই নয়, গন্ধের অভিজ্ঞতাও উপভোগ করত। রোমাদের থেকে সুগন্ধির পথ এসে মিশল উপমহাদেশের রাজদরবারে। সম্রাট শাহজাহানের আমলে আতর ছিল রাজকীয় জীবনের অপরিহার্য অংশ। দরবারে অতিথি এলে তাদের হাতে সুগন্ধি জল ঢালা হতো, যেন তারা সম্মানিত বোধ করে।
সময় গড়িয়ে সুগন্ধির কেন্দ্র হয়ে ওঠে ফ্রান্স। সেখানে পারফিউম তৈরি এক শিল্পে পরিণত হয়। সুগন্ধি শুধু প্রসাধনী নয় এখানে এটি ছিল ফ্যাশন, পরিচয়, এমনকি রাজনীতির অংশ। সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এত বেশি কোলোন ব্যবহার করতেন যে তার ব্যক্তিগত ঘর সবসময় সুগন্ধে ভরা থাকত। ফরাসি শহরের ছোট পারফিউম কারখানাগুলোতে তখন কারিগররা ফুল, মশলা আর কাঠের নির্যাস মিশিয়ে নতুন নতুন সুগন্ধ বানাচ্ছিলেন যেন তারা গন্ধ দিয়ে গল্প লিখছেন।
২০শ শতকে এসে সুগন্ধি আর রাজদরবারে সীমাবদ্ধ থাকল না। ফ্যাশন জগতে বিপ্লব ঘটালেন কোকো স্যানেল। তার হাত ধরেই প্রথমবার সিন্থেটিক উপাদানে তৈরি আধুনিক পারফিউম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এতে সুগন্ধি হয়ে যায় সবার নাগালের জিনিস শুধু অভিজাতদের বিলাস নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সঙ্গী।
মানুষের স্মৃতির সঙ্গে গন্ধের সম্পর্ক অদ্ভুতভাবে গভীর। কোনো পুরোনো সুগন্ধ হঠাৎ নাকে এলে মনে পড়ে যায় বহু বছর আগের কোনো বিকেল, কোনো মানুষ, কোনো অনুভূতি। বিজ্ঞানীরা বলেন, গন্ধ সরাসরি মস্তিষ্কের স্মৃতি ও আবেগের অংশে কাজ করে তাই একটি সুগন্ধ মুহূর্তেই অতীত ফিরিয়ে আনতে পারে।
এই কারণেই সুগন্ধি শুধু প্রসাধনী নয় এ এক ধরনের আবেগের ভাষা। কেউ হয়তো গোলাপের গন্ধে প্রেমের স্মৃতি খুঁজে পায়, কেউ আবার চন্দনের গন্ধে শান্তি অনুভব করে। হাজার বছরের ইতিহাস পেরিয়েও সুগন্ধির ভূমিকা বদলায়নি শুধু তার রূপ বদলেছে। কখনো দেবতার উদ্দেশ্যে ধূপ, কখনো মৃতের বিদায়ে তেল, কখনো প্রেমিকের উপহার, কখনো ব্যক্তিত্বের পরিচয় সব ক্ষেত্রেই সুগন্ধ মানুষকে ছুঁয়ে গেছে গভীরভাবে।
আরও পড়ুন
রোমিও-জুলিয়েট থেকে শাহজাহান-মমতাজ, ইতিহাসের করুণ ভালোবাসা
ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট ও সবচেয়ে দীর্ঘ চুমুর রেকর্ড
কেএসকে