দেশে দেশে রমজান
ঐতিহ্য আর উৎসবে মিশরের রোজা পালন
রমজানে মিশরের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, বাজার সেজে ওঠে কাঠের ফ্রেমে তৈরি রঙিন লণ্ঠনে
রমজান মাস এলেই উত্তর আফ্রিকার দেশ মিশর যেন এক অন্য রূপে সেজে ওঠে। দিনের বেলা শহরজুড়ে শান্ত, ধীর ছন্দ আর সূর্য ডোবার পরই শুরু হয় আলো, রং আর উৎসবের আবহ। রোজা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং সামাজিক মিলন, ঐতিহ্য ও আনন্দের এক সম্মিলিত অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে রমজানের সময় মিশরের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, বাজার সব জায়গাতেই দেখা যায় কাঠের ফ্রেমে তৈরি রঙিন লণ্ঠন, যাকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় ‘ফানুস’। এই লণ্ঠন শুধু সাজসজ্জা নয়; এটি একতা, আনন্দ এবং ঐতিহ্যের প্রতীক।
এই লণ্ঠনের ইতিহাস ঘিরে রয়েছে এক জনপ্রিয় কাহিনি। কথিত আছে, ৩৫৮ হিজরিতে (৯৬৯ খ্রিস্টাব্দ) ফাতেমীয় শাসক এল মোয়ায়েজ লি-দিন আল্লাহ যখন কায়রো শহরে প্রবেশ করেন, তখন সন্ধ্যার অন্ধকারে তাকে স্বাগত জানাতে শহরের মানুষ হাতে মোমবাতি নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিল। কাঠের ফ্রেমে বসানো আলো দিয়ে তারা পথ আলোকিত করেছিল এবং শাসকের আগমন উদযাপন করেছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, সেই ঘটনাই ধীরে ধীরে ঐতিহ্যে রূপ নেয় এবং পরবর্তীকালে কাঠের সাধারণ কাঠামো বদলে রঙিন কাঁচ ও নকশায় সাজানো শিল্পসম্মত লণ্ঠনে পরিণত হয়। আজও সেই স্মৃতির ধারাবাহিকতায় রমজান এলেই মিশরের অলিগলি আলোয় ভরে ওঠে।
রমজানে মিশরের দিনচক্রেও দেখা যায় বিশেষ ছন্দ। সাহরির আগে শহরজুড়ে শোনা যায় ‘মেসাহারাতি’দের কণ্ঠ তারা ঢোল বাজিয়ে মানুষকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে যাতে কেউ সাহরি মিস না করেন। এই ঐতিহ্য শত শত বছর পুরোনো এবং এখনো অনেক এলাকায় টিকে আছে। আধুনিক অ্যালার্ম ঘড়ি বা মোবাইল থাকা সত্ত্বেও অনেক পরিবার ঐতিহ্যের এই মানবিক ডাককে গুরুত্ব দেয়। এটি শুধু জাগানোর কাজই নয়, বরং সামাজিক সম্পর্ক ও সম্প্রদায়বোধকে আরও দৃঢ় করে।
ইফতার মিশরীয় সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে রোজা ভাঙেন। সাধারণত খেজুর ও পানি দিয়ে ইফতার শুরু করা হয়, যা নবীজির সুন্নত অনুসরণে প্রচলিত। এরপর পরিবেশন করা হয় নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার। জনপ্রিয় পদগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ফুল মেদামেস’ (মসলা দিয়ে রান্না করা মটরশুঁটি), ‘মোলোখিয়া’ নামের সবুজ শাকের স্যুপ, ভাত, মাংস বা মুরগির নানা পদ, এবং বিভিন্ন সালাদ। মিষ্টান্নের মধ্যে বিশেষভাবে জনপ্রিয় ‘কুনাফা’, ‘কাতায়েফ’ ও ‘বাকলাভা’ যেগুলো রমজান ছাড়া বছরের অন্য সময়ে তেমন দেখা যায় না।
ইফতারের পর শুরু হয় সামাজিক আড্ডা, বাজার ঘোরা ও রাতের নামাজ। শহরের ক্যাফেগুলো রাতভর খোলা থাকে, মানুষ সেখানে চা, কফি বা ঐতিহ্যবাহী পানীয় ‘কারকাডে’ খেতে খেতে গল্প করেন। অনেক এলাকায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কোরআন তেলাওয়াত, নাশিদ বা ধর্মীয় সংগীতের আসর বসে। ফলে রমজান শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের সময় নয়, বরং সামষ্টিক সংস্কৃতির উৎসব হিসেবেও উদযাপিত হয়।
মিশরে রমজানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো দান-সদকার সংস্কৃতি। এই মাসে ধনী পরিবার বা ব্যবসায়ীরা দরিদ্রদের জন্য ইফতার বিতরণ করেন, যাকে বলা হয় ‘মাওয়ায়েদ রহমান’। বড় বড় রাস্তার পাশে বা মসজিদের সামনে লম্বা টেবিল পেতে অচেনা মানুষদেরও বসিয়ে খাওয়ানো হয়। এতে সামাজিক বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি পারস্পরিক সহমর্মিতা বাড়ে। ঐতিহাসিকভাবে এই প্রথার শিকড় মধ্যযুগীয় ইসলামি সমাজে, যখন শাসক ও অভিজাতরা জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমকে ধর্মীয় কর্তব্য হিসেবে দেখতেন।
সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি ও জীবনযাত্রা বদলালেও মিশরের রমজান সংস্কৃতির মূল সুর কিন্তু একই আছে। আগে যেখানে তেলের বাতি বা মোমবাতির আলোয় লণ্ঠন জ্বলত, এখন সেখানে এলইডি আলো ব্যবহার করা হয়। আগে বাজারে হাতে বানানো ফানুসই বেশি দেখা যেত, এখন কারখানায় তৈরি নানা ডিজাইনের লণ্ঠনও পাওয়া যায়। তবু ঐতিহ্যবাহী কাঠের ফ্রেম ও নকশা করা ধাতব লণ্ঠনের জনপ্রিয়তা কমেনি; বরং সেগুলোই রমজানের আসল আবহ তৈরি করে।
মিডিয়া ও বিনোদনও মিশরের রমজান সংস্কৃতির অংশ। এই মাসে বিশেষ টিভি নাটক ও অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়, যেগুলো পরিবার নিয়ে একসঙ্গে বসে দেখার রীতি রয়েছে। ফলে রোজার মাসে রাত জেগে গল্প করা, অনুষ্ঠান দেখা আর মিষ্টি খাওয়ার মধ্যে দিয়ে পরিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। অতীতে যেমন গল্পকথকরা লোককাহিনি শোনাতেন, আজকের দিনে সেই জায়গা নিয়েছে টেলিভিশন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কিন্তু মূল উদ্দেশ্য একই: একসঙ্গে সময় কাটানো।
ইতিহাস ও বর্তমানের তুলনা করলে দেখা যায়, মিশরের রমজান উদযাপনের ধরন প্রযুক্তিগতভাবে বদলালেও আবেগ ও অর্থে খুব একটা বদলায়নি। অতীতে যেমন মানুষ আলো জ্বেলে শাসককে স্বাগত জানিয়েছিল, আজও তারা আলো জ্বেলে রমজানকে স্বাগত জানায়। আগে যেমন প্রতিবেশীরা একসঙ্গে ইফতার করত, এখনো সেই প্রথা বজায় আছে। অর্থাৎ শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়েও রমজান সেখানে শুধু ধর্মীয় পালন নয় এটি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সমাজ ও ইতিহাসের এক অনন্য সংমিশ্রণ।
সূত্র: ইউনিসেফ, ভিজিট ইজিপট
আরও পড়ুন
ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট ও সবচেয়ে দীর্ঘ চুমুর রেকর্ড
প্রাচীন মিশরে পারফিউম ব্যবহার হতো মমি সংরক্ষণে
কেএসকে