৫৩ বছর পর চাঁদে যাচ্ছে মানুষ, লাইভ দেখাবে নাসা
৫৩ বছর পর চাঁদে যাচ্ছে মানুষ
প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর আবারও মানুষের পদচারণার প্রস্তুতিতে উত্তেজনায় প্রহর গুনছে মহাকাশ গবেষণার বিশ্ব। দীর্ঘ ৫৩ বছর পর আবার মানুষকে নিয়ে চাঁদের পথে রওনা দিতে যাচ্ছে নাসা। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থিত কেনেডি স্পেস সেন্টারে এখন চলছে ঐতিহাসিক এক মুহূর্তের কাউন্টডাউন। সবকিছু ঠিক থাকলে আর্টেমিস ২ মিশন মহাকাশ অভিযানই হবে সেই যাত্রা, যা মানুষের চাঁদে ফিরে যাওয়ার নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
কেনেডি স্পেস সেন্টারের প্যাড ৩৯বি-তে নাসার স্পেস লঞ্চ সিস্টেম রকেট আর্টেমিস ২ উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত। বর্তমানে লঞ্চ কন্ট্রোল সেন্টারে প্রকৌশলীরা রকেটের হার্ডওয়্যার পরীক্ষা এবং জ্বালানি ভরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রকেট উৎক্ষেপণের সময় যে প্রচণ্ড শব্দ, কম্পন ও তাপ সৃষ্টি হয়, তা নিয়ন্ত্রণ করতে বিশেষ ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্মে রাখা হয়েছে বিশাল পানির ট্যাংক, যেখান থেকে হাজার হাজার গ্যালন পানি ছিটিয়ে দেওয়া হবে। এই পানি শব্দের তীব্রতা কমানো এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মহাকাশ গবেষণায় এ ধরনের প্রযুক্তি বহু বছর ধরে ব্যবহৃত হলেও আধুনিক প্রযুক্তির কারণে এখন তা আরও উন্নত হয়েছে।
আবহাওয়া পরিস্থিতিও এখন পর্যন্ত মিশনের জন্য আশাব্যঞ্জক। সংশ্লিষ্ট আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, উৎক্ষেপণের দিন প্রায় ৮০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে অনুকূল আবহাওয়ার। যদি আবহাওয়া সহায়ক থাকে এবং প্রযুক্তিগত কোনো জটিলতা না দেখা দেয়, তবে নির্ধারিত সময়েই শুরু হবে এই বহু প্রতীক্ষিত মহাকাশযাত্রা।
আর্টেমিস ২ মিশন ৪ এপ্রিল উৎক্ষেপণের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। ৪ জন নভোচারীকে নিয়ে চাঁদের চারপাশে ঘুরে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আসবে রকেটটি। অবশ্য চাঁদের উদ্দেশ্য যাত্রা করলেও এবার চাঁদের মাটিতে অবতরণ করবেন না তারা। বরং ১০ দিনের এই সফরে চাঁদের চারপাশে ঘুরে করে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসবেন তারা। ভবিষ্যতে আর্টিমিস মিশনের মাধ্যমেই চাঁদে পা রাখার আগে পরীক্ষামূলক ভাবে এই যাত্রা করা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ যেন এই ঐতিহাসিক ও রোমাঞ্চকর মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করতে পারে, সেজন্য বিশেষ ব্যবস্থা করেছে নাসা। তাদের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে এই উৎক্ষেপণ। ফলে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে মানুষ লাইভ দেখতে পারবেন মানুষের চাঁদের পথে যাত্রার এই ঐতিহাসিক দৃশ্য। এরই মধ্যে ৩১ মার্চ ফটোগ্রাফাররা প্যাড ৩৯বি-এর ভেতরে রিমোট ক্যামেরা স্থাপন করেছে।
মানুষসহ শেষবার চাঁদের পথে মহাকাশযান গিয়েছিল ১৯৭২ সালে, অ্যাপোলো ১৭ মিশনের মাধ্যমে। সেই ঐতিহাসিক অভিযানের পর প্রায় পাঁচ দশক কেটে গেছে। এবার নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি, শক্তিশালী রকেট এবং আধুনিক মহাকাশযান নিয়ে শুরু হচ্ছে আবারও চাঁদ অভিযানের প্রস্তুতি। আর্টেমিস কর্মসূচির মূল লক্ষ্যই হলো ভবিষ্যতে আবার মানুষের পা রাখা চাঁদের মাটিতে এবং সেখান থেকে আরও দূর মহাকাশ অভিযানের পথ তৈরি করা।
এই অভিযানে চারজন নভোচারীকে নিয়ে চাঁদের উদ্দেশ্যে উড়াল দেবে শক্তিশালী স্পেস লাউন্স সিস্টেম রকেট এবং অত্যাধুনিক ওরিওন স্পেসক্রাফট। এটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রকেট হিসেবে বিবেচিত। বিশাল এই রকেটের উৎক্ষেপণ ঘিরে কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ কন্ট্রোল সেন্টারে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রকৌশলীরা রকেটের বিভিন্ন হার্ডওয়্যার পরীক্ষা করছেন, পাশাপাশি ধাপে ধাপে শুরু হয়েছে জ্বালানি ভরার প্রস্তুতিও।
তবে এই অভিযানে নভোচারীরা চাঁদের মাটিতে নামবেন না। প্রায় ১০ দিনের এই মিশনে তারা চাঁদের চারপাশে প্রদক্ষিণ করে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। অর্থাৎ এটি মূলত একটি পরীক্ষামূলক অভিযান। ভবিষ্যতে মানুষের চাঁদে অবতরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি এবং মহাকাশযানের সক্ষমতা যাচাই করাই এর মূল লক্ষ্য।
এই পরীক্ষামূলক যাত্রার মাধ্যমে ভবিষ্যতের আরও বড় মিশনের পথ তৈরি হবে। বিশেষ করে পরিকল্পিত আর্টেমিস ২ মিশন-এর মাধ্যমে আবারও মানুষের চাঁদের মাটিতে অবতরণের লক্ষ্য রয়েছে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই কর্মসূচি সফল হলে চাঁদে স্থায়ী গবেষণা ঘাঁটি তৈরির পথও উন্মুক্ত হবে।
আর্টেমিস কর্মসূচি শুধু চাঁদে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনাই নয়, এটি ভবিষ্যতের মহাকাশ অনুসন্ধানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, চাঁদকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে ভবিষ্যতে আরও দূরে বিশেষ করে মঙ্গল গ্রহে মানব অভিযান পরিচালনা করা সহজ হবে। তাই এই মিশনকে অনেকেই মানব মহাকাশ অভিযানের নতুন যুগের সূচনা বলেও মনে করছেন।
সূত্র: নাসা
কেএসকে