অনলাইন পাঠদান কতটুকু প্রাসঙ্গিক?
শরীরে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থেকে পাঠদানের যে সুফল পাওয়া যায় তা কখনো অনলাইন পাঠদানে অর্জিত হয় না
তৈয়বা খানম
দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনদিন অনলাইন ও তিনদিন অফলাইন বা সশরীরে ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তবে এ নিয়ম সারাদেশের সব স্কুলে নয়, চলবে শুধু মহানগর বা মেট্রোপলিটন এলাকায় অবস্থিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে।
তবে এই সিদ্ধান্ত এবং কার্যক্রমে কতটা জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা যাবে সেটা এখন আলোচনার বিষয় নয়। তবে অনলাইন ক্লাস বা পাঠদান কতটুকু প্রাসঙ্গিক? করোনার সময় নতুন এই পদ্ধতি কতটা কাজে লেগেছে সেই ভাবনাও এখন অতীত।
একটি জাতির বুদ্ধি ভিত্তিক সংস্কারে শিক্ষা একটি অমূল্য রত্ন হিসেবে কাজ করে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের অনলাইন পাঠদানের কথা বলা হচ্ছে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত অনলাইন পাঠদান আদৌ কতটুকু সুফল বয়ে আনবে তা কিন্তু ভাববার বিষয়। স্বশরীরে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থেকে পাঠদানের যে সুফল পাওয়া যায় তা কখনো অনলাইন পাঠদানে অর্জিত হয় না।
শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী সবচেয়ে বেশি শ্রেণিকক্ষের সঙ্গে, শিক্ষকের সঙ্গে এবং সর্বোপরি পড়াশোনার সঙ্গে অনেক বেশি নিজেকে সংযুক্ত করতে পারে। শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার যে পারস্পরিক মেলবন্ধন তৈরি হয় অনলাইন পাঠদানে তার সীমাবদ্ধতা লক্ষণীয়। তাছাড়া একজন শিক্ষকের কার্যকরী পাঠদানে শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি সংস্পর্শে থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ যা অনলাইন পাঠদানে শিক্ষকেরা বঞ্চিত হন। অনলাইন পাঠদান এর মাধ্যমে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বোঝাতে পারছেন কি না কিংবা তাদের সমস্যাগুলা যাচাই করা সম্ভব হয়ে উঠে না।
সমস্যার এখানেই শেষ নয়, দেখা যায় যে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে এখনো অনেক শিক্ষক সেভাবে প্রযুক্তিগত দক্ষতায় পারদর্শী না যার কারণে তারা প্রাণবন্ত ক্লাস শিক্ষার্থীদের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও উপহার দিতে ব্যর্থ হন। বিগত করোনার সময়ের কথায় চিন্তা করলে দেখা যায় যে, আমাদের পাঠদান অনলাইনে হওয়ায় শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি মোবাইলে সময় অতিবাহিত করত। ফলে সৃজনশীল উদ্ভাবনী শক্তি তাদের হ্রাস পেয়েছে।
একই সঙ্গে তারা অনলাইন ক্লাসে যুক্ত থেকেও যুক্ত নেই এমন একটা পরিস্থিতি ছিল। যার দরুন অভিভাবকদের কাছে এই পড়াশুনার কোনো গুরুত্ব বহন করছে বলে মনে হয়নি। এমন পরিস্থিতি অভিভাবকদের জন্যও চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। বর্তমান সময়ও তার পুনরাবৃত্তি হবে কি না তা আমাদের মনে প্রশ্ন আসে।
অনলাইন নির্ভরতা আমাদের শিক্ষার্থী ঝরে পড়া বৃদ্ধি করার আশঙ্কাও কিন্তু থেকে যায়। নেটওয়ার্ক ইস্যু ও ডিভাইস সংকট নিরবিচ্ছিন্নভাবে পাঠদানে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করে। তার চেয়েও বড় দুশ্চিন্তার বিষয় যে, শিক্ষার্থীরা যতটা না পড়াশোনা করে তার চেয়েও বেশি ডিভাইসে আসক্ত হয়ে যায়। তারা ভিডিও গেমস, রিলস ও অনলাইন জুয়া চক্রে জড়িয়ে নিজেদের উজ্জ্বল সম্ভাবনাগুলো হারিয়ে ফেলছে।
আমার নিজের ক্যাম্পাস অনেকটা দূরে তারপর একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি এই অনলাইন পাঠদানে সন্তুষ্ট নই; কেননা মাত্রা অতিরিক্ত অনলাইন নির্ভরতা আমাদের সম্ভাবনাগুলো গ্রাস করছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অনলাইন ভিডিও গেমস, রিলসসহ নানা বিষয়ে আমরা মারাত্মকভাবে আসক্ত হয়ে পড়ছি। এতে করে অনেক শিক্ষার্থীর হতাশা, নৈতিক অধঃপতন ও আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে।
আমরা বৈদ্যুতিক সংযোগ ব্যবহারের পরিবর্তে বিকল্প কোনো কিছুর চিন্তা করতে পারি; কিন্তু অনলাইন ক্লাস কখনো শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের বিকল্প হতে পারে না। স্বশরিরে পাঠদান শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের তৃষ্ণা যতটা মিটাতে সক্ষম অনলাইন পাঠদানে তার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান আমাদের প্রতিনিয়ত ঘটে চলা ঘটনা নিয়ে হাজারো স্মৃতি বাক্সবন্দি করে যা অনলাইন পাঠদানে আমরা হারাবো। সবচেয়ে বড় বিষয় অনলাইন পাঠদান মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত কতটুকু কার্যকরী হবে তা কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়। তাই আমরা আমাদের চিরচেনা শ্রেণিকক্ষেই ফিরতে চাই।
লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম।
- আরও পড়ুন
৩২ বছর ধরে ডাকটিকিট সংগ্রহ করছেন চিকিৎসক মশিউর
হাজার বছর আগের মহামারি হাম, বছরে লাখ লাখ প্রাণহানি
কেএসকে