ঈদ ভাবনায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা
ঈদ ভাবনায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা
পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। এক মাস সিয়াম সাধনার পর আনন্দের বার্তা নিয়ে আসা এই দিনটি মানুষে কাছে ধরা দেয় বিভিন্ন রঙে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ প্রজন্মের কাছে ঈদ মানে কেবল উৎসব নয়, বরং শেকড়ে ফেরা, নস্টালজিয়া আর আত্মোপলব্ধির এক সন্ধিক্ষণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের একঝাঁক শিক্ষার্থীর ঈদ-ভাবনা তুলে ধরেছেন তরুন লেখক রবিউল ইসলাম শাকিল।
শিল্পীর মনে সাম্যের উৎসব
এক মাস সিয়াম সাধনার পর ক্যালেন্ডারের পাতায় ঈদের চাঁদ উঁকি দিলেই মনে এক অন্যরকম শিহরণ জাগে। হাতে মেহেদির আলপনা আর নতুন পোশাকে নিজেকে সাজানোর সেই চিরায়ত আবহের মাঝে খুঁজে পাই পরম চঞ্চলতা। তবে একজন কারুশিল্পের শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, ঈদের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর সর্বজনীনতায়। ঈদ আমাদের শেখায় ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ। যখন আমরা ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ ভুলে পাড়ার অসহায় মানুষটির মুখেও হাসি ফোটানোর চেষ্টা করি, তখনই ঈদের উৎসবের রং পূর্ণতা পায়। পারস্পরিক ভালোবাসার এই মেলবন্ধনই হলো ঈদের মূল শিক্ষা।
প্রজ্ঞা রিতি
১ম বর্ষ, কারুশিল্প, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
শেকড়ে ফেরা ও ত্যাগের মহিমা
পড়াশোনা বা চাকরির প্রয়োজনে ঘরছাড়া মানুষের কাছে ঈদ মানেই নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা। এটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং মা-বাবার সান্নিধ্য আর পরিবারের সবার সাথে এক দস্তরখানে বসে খাওয়ার এক পরম সুযোগ। ঈদের দিন সকালে নামাজ পড়তে যাওয়া, বড়দের থেকে সালামি পাওয়া এবং বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মেতে ওঠার মধ্য দিয়ে আমাদের ফেলে আসা শৈশব যেন আবার নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে। তবে উৎসবের এই রঙিন আবহে ঈদের একটি গভীর দর্শনকেও আমি খুঁজে পাই। ঈদ মানে কেবল নিজের আনন্দ নয়; বরং ত্যাগ, সহমর্মিতা আর অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের মুখে হাসি ফোটানোর মাঝেই লুকিয়ে আছে উৎসবের আসল সার্থকতা।
মুছাদ্দিকুল ইসলাম মাহিম
১ম বর্ষ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
নেপথ্য নায়কদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা
‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার’- এই সুর যখন সবার মনে নাড়ির টান বাড়িয়ে দেয়, তখন আমি ভাবি তাদের কথা যাদের স্বপ্নগুলো সীমান্তে পাহারা দেয়। দেশ ও দশের অসীম দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে যারা ঈদের সকালে প্রিয়জন থেকে দূরে থাকেন, তাদের প্রতি আমাদের অশেষ শ্রদ্ধা থাকা উচিত। আমাদের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে অনেক পুলিশ সদস্য বা আনসার সদস্যরা নিজেদের উৎসবকে হাসিমুখে বলি দেন। তারা আমাদের নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী বলেই আমরা শান্তিতে ঈদ কাটাতে পারি। অন্যের ত্যাগের এই মহানুভবতা স্মরণ করা এবং তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাই আমার কাছে এবারের ঈদের বিশেষ ভাবনা।
মাফশিতা রহমান মরিন
১ম বর্ষ, লোক প্রশাসন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির মিলনমেলা
সম্পর্কের দূরত্ব ঘুচিয়ে হৃদয়ের সেতুবন্ধন তৈরির এক জাদুকরী মন্ত্র হলো ঈদ। এটি প্রিয় মুখগুলোর সাথে পুনরায় মিলিত হওয়ার এবং একে অপরের ঘরে ঘরে ভালোবাসার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার এক বিশাল মঞ্চ। একজন মিডিয়ার স্টুডেন্ট হিসেবে আমি দেখি, ঈদ হলো জীবনের এক নতুন সিনেমাটিক ফ্রেম, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত মায়ায় ঘেরা। তবে আমাদের উৎসব তখনই সার্থক হবে, যখন সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও বাস্তুহারা মানুষের আনন্দ নিশ্চিত করতে আমরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেব। পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই ঈদ হয়ে উঠুক এক আনন্দময় রঙিন মিলনমেলা।
ফারজানা আনজুম বর্ষা
১ম বর্ষ, ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।
জীবনদর্শনের আলোকবর্তিকা
রমজানের পবিত্র নিস্তব্ধতা ভেঙে ঈদের সকাল আসে এক নতুন ভোরের স্নিগ্ধ আলো নিয়ে। ঈদ কেবল পোশাকের চাকচিক্য নয়, বরং এটি আত্মার পরিশুদ্ধির মহোৎসব। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে একই কাতার থেকে ইদগাহে যাওয়া ইসলামের সাম্যের কথাই মনে করিয়ে দেয়। এই দিনটি আমাদের শেখায় পরম করুণাময়ের প্রতি কৃতজ্ঞ হতে এবং ভালোবাসার বন্ধন আরও মজবুত করতে। ছোট ছোট এই আনন্দগুলোই জীবনের বড় সঞ্চয়। আমার কাছে ঈদ কেবল একটি আনন্দঘন দিন নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন যা আমাদের মানবতার সেবা করতে উদ্বুদ্ধ করে।
মারুফ সরকার
১ম বর্ষ, একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
নস্টালজিয়া ও হারানো ঈদকার্ড
স্মৃতির জানালায় টোকা দিলেই আমি বারবার ফিরে যাই শৈশবের সেই সোনালি দিনগুলোতে। পাড়া-মহল্লায় আতশবাজি ফোটানো আর প্রিয় মানুষদের হাতে ‘ঈদ মোবারক’ লেখা রঙিন কার্ড পৌঁছে দেওয়ার সেই মায়াবী সংস্কৃতি আজ যান্ত্রিকতার ভিড়ে হারিয়ে গেছে। বর্তমানের ডিজিটাল মেসেজের যুগে সেই কাগজের কার্ডের আবেগ ও মমত্ববোধ যেন খুঁজে পাওয়া ভার। আজকের প্রজন্ম হয়তো জানবেই না ঈদকার্ডের সাথে কতটা ভালোবাসা ও সৃষ্টিশীলতা মিশে থাকতো। রঙিন কার্ডের মোড়কে মোড়ানো সেই হারানো শৈশবকে আমি আজকের এই কৃত্রিম উৎসবের দিনে বড্ড মিস করি।
আব্দুর রহিম
১ম বর্ষ, ফ্যাকাল্টি অব অ্যাগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
এমআইএইচ