স্বাস্থ্যে আসছে ‘যুক্তরাজ্য মডেল’
বিনামূল্যে মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা দিতে চায় সরকার
বিনামূল্যে মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা দিতে চায় সরকার। এজন্য তারা যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) আদলে প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট গড়ে তুলবে। এ লক্ষ্যে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মীও নিয়োগ দেওয়া হবে। সবার জন্য তৈরি হবে ই-হেলথ কার্ড।
এই পদ্ধতি রোগী, সেবাদানকারী এবং সরকারসহ সব পক্ষের জন্যই। ভবিষ্যতেও চিকিৎসা পরিকল্পনা ও গবেষণা করাও হবে সহজতর। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি বাস্তবায়ন কঠিন হলেও অসম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্তাদের নিয়ে বসেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে কী কী করণীয় শুনেছেন। আলোচনায় সবচেয়ে বেশি এসেছে, জনবল ও বরাদ্দের বিষয়টি।
স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান জনবল ও বরাদ্দ দিয়েও অনেক দূর এগোনো যায়। প্রয়োজন তাদের কর্মস্থলে যথাসময়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা ও দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করা। পাশাপাশি দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা জরুরি।
এনএইচএস কী?
যুক্তরাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এনএইচএস (National Health Service-NHS) মূলত করের অর্থে পরিচালিত একটি সার্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যেখানে অধিকাংশ চিকিৎসাসেবা রোগীদের জন্য ব্যবহারের সময় বিনামূল্যে দেওয়া হয়। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হলো রোগীর আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নয়, বরং চিকিৎসার প্রয়োজনের ভিত্তিতে সেবা নিশ্চিত করা। সাধারণ কর ও ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স (National Insurance) অবদানের মাধ্যমে এর অর্থায়ন করা হয়। যুক্তরাজ্যের আইনগত বাসিন্দারা এবং নির্দিষ্ট ফি প্রদানকারী বৈধ ভিসাধারীরা এই সেবা পাওয়ার অধিকারী, আর জরুরি চিকিৎসা সাধারণত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে।
এনএইচএস-এর অধীনে সাধারণত রোগীরা প্রথমে জেনারেল প্র্যাকটিশনার (জিপি) বা পারিবারিক চিকিৎসকের কাছে নিবন্ধন করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী জিপি রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা হাসপাতাল সেবার জন্য রেফার করেন। জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীরা সরাসরি অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমারজেন্সি (Accident & Emergency- A&E) বিভাগ বা অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিতে পারেন। যুক্তরাজ্যের চারটি দেশে আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর (NHS England, NHS Scotland, NHS Wales এবং Health and Social Care) মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা পরিচালিত হলেও এর মূলনীতিগুলো একই থাকে। এনএইচএস ব্যবস্থার মাধ্যমে জিপি সেবা, হাসপাতালের চিকিৎসা, জরুরি চিকিৎসা, মাতৃত্বকালীন সেবা, টিকা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবাসহ বেশিরভাগ সেবা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। যদিও, ইংল্যান্ডে প্রেসক্রিপশন, ওষুধ, দাঁতের চিকিৎসা বা চোখের পরীক্ষার ক্ষেত্রে কিছু সীমিত ফি প্রযোজ্য হতে পারে।
আরও পড়ুন
- স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা অপরিহার্য
যে কারণে উন্নত চিকিৎসায় বিকল্প ভাবা হচ্ছে চীনের হাসপাতাল
দেশের স্বাস্থ্যসেবার পরিস্থিতি বোঝার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী পুরো দেশের চিকিৎসকদের হাজিরা খতিয়ে দেখেছেন এবং তাদের ৫০ শতাংশ উপস্থিতি পেয়েছেন। বাকি ৫০ শতাংশ অনুপস্থিত। বিশেষ করে, উপজেলা ও জেলা সদরে চিকিৎসকদের উপস্থিতি সন্তোষজনক নয়।

এ অবস্থায়, স্বাস্থ্যে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) গড়ে তোলা সম্ভব কি না জানতে চাইলে রাজধানীর শ্যামলীর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের প্রধান ডা. আয়শা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যুক্তরাজ্যের মডেল বাস্তবায়ন সম্ভব। চিকিৎসক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের পাশাপাশি তাদের কর্মস্থলে যথাসময়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। যে যার দায়িত্বটুকু পালন করতে হবে। তাহলেও আমাদের সীমিত সম্পদ দিয়ে ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব।
নতুন সিস্টেম শুরু করতে গেলে চ্যালেঞ্জ থাকবেই
এ নিয়ে সদ্য বিদায়ী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সচিব মো. সাইদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস মডেলে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয় জেনারেল প্রাকটিশনারের (জিপি) মাধ্যমে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন হয় জিপি সেন্টারে। আমরা অনেকেই সরাসরি সেবা নিতে চাই সবচেয়ে বড় চিকিৎসক অথবা হাসপাতালে। যে সেবাটি উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স থেকে দেওয়া সম্ভব হতো সেই সেবাটি নিতে আসি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ফলে এ হাসপাতালে শয্যার তুলনায় অনেক বেশি রোগী থাকে। রোগীর কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না, অপারেশনের সিরিয়াল পেতে বিলম্ব হয়, হাসপাতালে অবস্থানকাল বাড়ে, চিকিৎসা ব্যয়, রোগী এবং পরিবারের কষ্ট বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, এসব সমস্যার সমাধানে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের মতো জিপি মডেলে প্রতিটি ইউনিয়নে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট, উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সেবা প্রদান এবং জেলা হাসপাতালগুলোকে সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট হিসেবে প্রস্তুত করার কথা বলা হয়েছে। এটা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।
আরও পড়ুন
চ্যালেঞ্জ নিয়ে সাবেক এই স্বাস্থ্য সচিব বলেন, যে কোনো নতুন সিস্টেম শুরু করতে গেলে চ্যালেঞ্জ থাকবেই। সবগুলো ইউনিটকে পুরোপুরি প্রস্তুত করতে সময় লাগবে। এখন উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক রয়েছেন। রোগ নির্ণয়ের বেসিক যন্ত্রপাতি, উপকরণ, জনবল নিশ্চিত করে বর্তমান অবস্থাতেই উপজেলা পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন সম্ভব।
তিনি বলেন, জেলাকেও সাজাতে হবে একইভাবে। জেলা হাসপাতাল রোগী নেবে উপজেলা রেফার করলে। শুরুটা জটিল, কিন্তু অসম্ভব না। শুরু করলে চ্যালেঞ্জ আসবে, সমাধানও বের হবে। এসব ক্ষেত্রে ইশতেহার অনুযায়ী কিছু সেবা পিপিপি মডেলে আউটসোর্স করা যেতে পারে।
কেমন হবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা?
এনএইচএস মডেল বাস্তবায়ন, হেলথ কার্ড প্রদানসহ নানা কথা শোনা যাচ্ছে নতুন সরকারের কাছ থেকে। আসলে কেমন হবে নতুন স্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতি?
এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, স্বাস্থ্য খাতে আমরা যে সংস্কার, পরিবর্তন বা নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করছি- আমাদের সব কাজেরই চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো কীভাবে স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায়, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। আমাদের স্বাস্থ্যখাত নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। এখানে অনেক সমস্যা আছে, যার মধ্যে দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি হলো ক্লিনিক্যাল কোয়ালিটি, অর্থাৎ আমরা যে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছি তার গুণগত মান নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়টি হলো অবকাঠামোগত ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ, যা অনেক সময় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে।এই দুই ধরনের সমস্যার কারণেই অনেক ক্ষেত্রে মানুষের কাছে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে ব্যাঘাত ঘটে।
ই-হেলথ কার্ডেই থাকবে রোগীর সব তথ্য
তিনি বলেন, সম্প্রতি আমরা যে ই-হেলথ কার্ড নিয়ে আলোচনা করেছি, তা আমাদের ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ কর্মপরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে একজন রোগীর চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে। বিদেশে চিকিৎসা নিতে গেলে আমরা প্রায়ই দেখি ডাক্তারের কাছে গেলেই একটি আইডি নম্বরের মাধ্যমে কম্পিউটারে রোগীর কয়েক বছর আগের চিকিৎসা ইতিহাস দেখা যায়। রোগী আগে কী চিকিৎসা নিয়েছেন, তার রোগের অবস্থা কী ছিল- এসব তথ্য সহজেই পাওয়া যায়। আমরাও একই ধরনের একটি ব্যবস্থা চালু করতে চাই।
আরও পড়ুন
- আর্মি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চিকিৎসাসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে
সরকারি হাসপাতালে জনবল সংকট কাটাতে ধাপে ধাপে নিয়োগ: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ই-হেলথ কার্ড কার্যক্রমটি ধাপে ধাপে (ফেজওয়াইজ) বাস্তবায়ন করা হবে। শুরুতে একটি জেলায় এটি চালু করা হবে। সেই জেলার অধীনে থাকা উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। তখন ওই জেলার প্রতিটি নাগরিকের একটি করে ই-হেলথ কার্ড থাকবে। তারা যখন কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাবে, তখন তাদের আগের চিকিৎসা সংক্রান্ত সব তথ্য চিকিৎসকের সামনে চলে আসবে। এর ফলে চিকিৎসক খুব সহজেই রোগীর চিকিৎসা শুরু করতে পারবেন। রোগীর আগে কোনো রোগ ছিল কি না, সেটি সেরে গেছে কি না বা আবার বেড়েছে কি না- এসব বিষয় তিনি দ্রুত বুঝতে পারবেন। রোগের অগ্রগতি বা জটিলতা নির্ণয় করাও সহজ হবে। এতে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং রোগীর জন্যও নিজের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ ও বোঝা সহজ হবে।

তিনি আরও বলেন, ই-হেলথ কার্ড আসলে একটি বৃহত্তর ই-হেলথ সিস্টেমের অংশ। আমরা একটি সমন্বিত ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই। একটি জেলার মধ্যে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল এবং অনেক ক্ষেত্রে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রয়েছে। কিন্তু গ্রামের সাধারণ মানুষ অনেক সময় বুঝতে পারেন না- সাধারণ জ্বর, সর্দি বা কাশির মতো সমস্যার জন্য কোথায় চিকিৎসা নেওয়া উচিত। ফলে অনেকেই সরাসরি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলে যান।
ড. এম এ মুহিত বলেন, আমরা চাই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো মূলত টারশিয়ারি বা বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করুক, যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে জটিল রোগের চিকিৎসা দেওয়া হবে। সাধারণ রোগের জন্য বড় হাসপাতালে আসার প্রয়োজন নেই- প্রাথমিক পর্যায়েই চিকিৎসা পাওয়া উচিত। এ লক্ষ্যে আমরা প্রায় এক লাখ হেলথ ওয়ার্কার নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছি, যারা তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করবে এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেবে। তারা নিয়মিত মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরি করবে, যেন মানুষ অসুস্থ হওয়ার আগেই সতর্ক হতে পারে। এর ফলে রোগের সংখ্যা কমবে এবং হাসপাতালের ওপর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
এসইউজে/এএমএ
সর্বশেষ - স্বাস্থ্য
- ১ স্বাস্থ্যে আসছে ‘যুক্তরাজ্য মডেল’
- ২ পুরস্কারের অনুপ্রেরণায় দ্বিগুণ উৎসাহে সেবা দিচ্ছে ঢামেক পরিবার
- ৩ ঈদের ছুটিতেও হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখার নির্দেশ
- ৪ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আইসিইউ চালু
- ৫ জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে সহায়ক অধ্যাদেশগুলো দ্রুত আইনে পরিণত করার আহ্বান