সিএনএনের প্রতিবেদন
বিপ্লবের পর প্রথম নির্বাচন: বাংলাদেশে তরুণ নেতৃত্ব কি কোণঠাসা?
বিপ্লবের পর প্রথম নির্বাচন হচ্ছে বাংলাদেশে/ ছবি: এনসিপি
জেন জি আন্দোলনে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের পর প্রথমবারের মতো নির্বাচন হচ্ছে বাংলাদেশে। আগামী বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হবে ভোটগ্রহণ। দেশের কোটি কোটি তরুণের হাত ধরে হওয়া সেই বিপ্লবের পরও নির্বাচনি রাজনীতিতে প্রাধান্য পাচ্ছে পুরোনো শক্তিরাই।
২০২৪ সালের আগস্টে বিক্ষোভকারীরা শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবনে ঢুকে পড়লে হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে যান তিনি। সেই দৃশ্য বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। সেই আন্দোলন দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও যুবনেতৃত্বাধীন আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করে; যার প্রভাব দেখা যায় নেপাল ও মাদাগাস্কারে সরকার পতনের মধ্য দিয়ে।
শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসানে অনেকে স্বস্তি প্রকাশ করছেন। তার শাসনামলে নির্বাচন কারচুপি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট এবং বিরোধী কণ্ঠ দমনের অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিনের।
আরও পড়ুন>>
বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফেরানোর নির্বাচন, কার হাতে ভবিষ্যৎ?
তারেক রহমানকে নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনের বিশেষ প্রতিবেদন
আল-জাজিরার প্রতিবেদন/ ড. ইউনূসকে কীভাবে মনে রাখবে বাংলাদেশ?
শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন শিক্ষার্থী মির্জা শাকিল। তিনি সিএনএনকে বলেন, ‘এই বিপ্লব দেখিয়েছে—জেন জি চাইলে কত কিছু করতে পারে।’
তবে হাসিনা–পরবর্তী বাংলাদেশকে যারা নেতৃত্ব দিতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে, তারা সেই তরুণ আন্দোলনকারীদের থেকে অনেকটাই ভিন্ন। সম্ভাব্য দুই শীর্ষ প্রার্থীর একজন ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান। তিনি এমন এক রাজনৈতিক বংশের উত্তরসূরি, যে বংশ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী। অন্যজন ৬৭ বছর বয়সী জামায়াতে ইসলামীর নেতা শফিকুর রহমান, যার দল এবারের নির্বাচনে একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি।
সাদমান মুজতবা রাফিদ নামে জেন জি আন্দোলনে অংশ নেওয়া আরেক তরুণ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমরা এমন একটি দেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেখানে লিঙ্গ, জাতি বা ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকবে। আমরা নীতিগত পরিবর্তন ও সংস্কার আশা করেছিলাম, কিন্তু বাস্তবতা আমাদের স্বপ্নের অনেক দূরে।’
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচন
শেখ হাসিনার পতনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরির কোটা সংস্কার দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ওই আন্দোলনের জবাবে সরকার কঠোর ও রক্তক্ষয়ী দমননীতি গ্রহণ করে, যা উল্টো আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে তোলে।
দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে এবং সেনাবাহিনী যখন জানিয়ে দেয়, তারা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালাবে না, তখনই স্পষ্ট হয়ে যায় শেখ হাসিনার শাসনের অবসান আসন্ন।
২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীরা শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবনে প্রবেশ করে দেয়াল ভাঙচুর ও ভেতরের জিনিসপত্র লুট করে। এর পরই তিনি ভারতে পালিয়ে যান।
আরও পড়ুন>>
বাংলাদেশের নির্বাচন কী প্রভাব ফেলবে ভারত-নেপালে?
জেন জির হাতে স্বৈরাচার পতন: নির্বাচনের দৌড়ে এগিয়ে পুরোনো শক্তিরাই
রয়টার্সের প্রতিবেদন/ ইতিহাসের সেরা নির্বাচনি ফল পেতে যাচ্ছে জামায়াত
ওই সহিংসতার ঘটনায় ভূমিকার জন্য গত বছরের নভেম্বর মাসে ঢাকার একটি আদালত শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাবে, ওই সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন।
বর্তমানে শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে। বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণ দাবি করছে, যদিও শেখ হাসিনা তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তার দল আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
পুরোনোদের আধিপত্য, কোণঠাসা নতুন নেতৃত্ব?
শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি সুবিধা করে দিয়েছে তাদের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপিকে।
দলটির নেতা তারেক রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও শেখ হাসিনার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার ছেলে। ১৭ বছর পর নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে তিনি এখন ক্ষমতার শীর্ষ দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
পুরোনো রাজনীতির আরেক শক্তি জামায়াতে ইসলামীও পুনরুত্থান ঘটাচ্ছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে দীর্ঘদিন দমন–পীড়নের পর দলটি আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছে।
অন্যদিকে, আন্দোলনের পর শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সহিংস ও বিভক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি।
ডিসেম্বরের শেষ দিকে দলটি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করার ঘোষণা দিলে অনেকেই বিস্মিত হন।
লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক নাওমি হোসেন সিএনএনকে বলেন, এই জোট আংশিকভাবে নিরাপত্তার প্রশ্নে করা। তার কথায়, ‘জামায়াতের সঙ্গে জোট হলে এনসিপির কিছু প্রার্থীর সংসদে যাওয়ার ভালো সম্ভাবনা থাকে।’
তিনি আরও বলেন, সহিংস রাজনৈতিক পরিবেশে সংসদ সদস্য হওয়া একটি সুরক্ষা দেয়। তা না হলে নেতারা প্রতিক্রিয়া ও প্রতিশোধের ঝুঁকিতে থাকেন।
সম্প্রতি প্রার্থী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংস হামলা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে, এমন অভিযোগও উঠেছে।
এই অস্থিরতা তরুণ আন্দোলনকারীদের প্রাথমিকভাবে আশা করা পরিস্থিতির সঙ্গে মেলে না।
শিক্ষার্থী আন্দোলনকারী নাজিফা জান্নাত বলেন, ‘এনসিপি সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এমন একটি দলের সঙ্গে জোট, যারা একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি, সেটি আমাদের কাছে বিশ্বাসঘাতকতার মতো।’
তিনি একে ‘লজ্জাজনক ঘটনা’ বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা তাদের জানিয়েছি, এটি আমাদের জন্য কতটা অপমানজনক।’
তবু অনেকের কাছে বৃহস্পতিবারের ভোট এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ঢাকার রাজপথে এখন অপেক্ষা ও উত্তেজনার আবহ।
জেন জি আন্দোলনকারী শাকিলের কথায়, ‘এই নির্বাচন নতুন কিছু আনতে পারে। আমরা উল্লাসিত।’
সূত্র: সিএনএন
কেএএ/