ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. আন্তর্জাতিক

রয়টার্সের প্রতিবেদন

ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েন, বাংলাদেশে প্রভাব বাড়ছে চীনের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রকাশিত: ১১:৪৯ এএম, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ভারতঘনিষ্ঠ নেতা শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশে চীনের প্রভাব আরও বাড়ছে বলে মনে করছেন রাজনীতিক ও বিশ্লেষকেরা। যদিও তাদের মতে, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতকে পুরোপুরি উপেক্ষা করার সুযোগ বাংলাদেশের নেই।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নির্বাচনে এগিয়ে থাকা দুই প্রধান দলই ঐতিহাসিকভাবে ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার মতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেনি। ২০০৯ থেকে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ, আর তিনি স্বেচ্ছা নির্বাসনে দিল্লিতে অবস্থান করছেন।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে চীন। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত সীমান্তের কাছে একটি ড্রোন কারখানা স্থাপনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে বেইজিং।

আরও পড়ুন>>
বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফেরানোর নির্বাচন, কার হাতে ভবিষ্যৎ?
বিপ্লবের পর প্রথম নির্বাচন: বাংলাদেশে তরুণ নেতৃত্ব কি কোণঠাসা?
তারেক রহমানকে নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনের বিশেষ প্রতিবেদন

আল-জাজিরার প্রতিবেদন/ ড. ইউনূসকে কীভাবে মনে রাখবে বাংলাদেশ?

চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে প্রায়ই ঢাকায় বাংলাদেশি রাজনীতিক, কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করতে দেখা যাচ্ছে। চীনা দূতাবাসের ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী, এসব বৈঠকে বিলিয়ন ডলার মূল্যের অবকাঠামো প্রকল্পসহ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ মনে করে, শেখ হাসিনার অপরাধে ভারত সহযোগী ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘যে দেশ একজন সন্ত্রাসীকে আশ্রয় দিচ্ছে এবং আমাদের দেশকে অস্থিতিশীল করতে দিচ্ছে, তার সঙ্গে সম্পর্ক বা ব্যবসা করতে মানুষ রাজি হবে না।’

তবে তারেক রহমান নিজে তুলনামূলক সংযত সুরে কথা বলেছেন। গত সপ্তাহে রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘আমরা সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাইবো, তবে অবশ্যই আমার জনগণ ও দেশের স্বার্থ রক্ষা করে।’

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক আরও খারাপ হয়েছে, বিশেষ করে ক্রিকেটকে ঘিরে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগে ভারতের হিন্দু সংগঠনগুলোর চাপে বাংলাদেশি তারকা ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগ (আইপিএল)-এর একটি দল থেকে বাদ দেওয়া হয়।

এর জবাবে ঢাকা আইপিএলের সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে। পাশাপাশি, টি২০ ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচ ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরানোর অনুরোধ জানানো হয়। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে বাংলাদেশ টুর্নামেন্ট থেকেই বাদ পড়ে।

বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশই একে অপরের জন্য ভিসা প্রদানে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ভারত ও বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য বৈঠকও খুব কম দেখা গেছে। তবে গত ডিসেম্বর ঢাকায় তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। সে সময় তিনি তারেক রহমানের মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় ভারতের পক্ষ থেকে সমবেদনা জানান।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার একাধিকবার শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতকে অনুরোধ জানালেও তাতে সাড়া মেলেনি। বিশেষ করে ঢাকার একটি আদালত গত বছর তাকে অভ্যুত্থানের সময় প্রাণঘাতী দমন অভিযান চালানোর দায়ে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর এই দাবি জোরালো হয়।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হন। তবে শেখ হাসিনা এসব হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

‘ধীরে ধীরে প্রভাব বাড়াচ্ছে চীন’

নির্বাচনের আগে বিএনপি ও তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী একে অপরের বিরুদ্ধে বিদেশি শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ তুলেছে। জামায়াতের দাবি, বিএনপি ভারতের ঘনিষ্ঠ। অন্যদিকে বিএনপি পাকিস্তানের সঙ্গে জামায়াতের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরছে।

সাম্প্রতিক এক জনসভায় তারেক রহমান বলেন, ‘দিল্লিও নয়, পিন্ডিও নয়—সবার আগে বাংলাদেশ।’ এখানে তিনি ভারতের রাজধানী দিল্লি ও পাকিস্তানের সেনা সদর দপ্তর রাওয়ালপিন্ডির কথা উল্লেখ করেন।

আরও পড়ুন>>
বাংলাদেশের নির্বাচন কী প্রভাব ফেলবে ভারত-নেপালে?
জেন জির হাতে স্বৈরাচার পতন: নির্বাচনের দৌড়ে এগিয়ে পুরোনো শক্তিরাই
রয়টার্সের প্রতিবেদন/ ইতিহাসের সেরা নির্বাচনি ফল পেতে যাচ্ছে জামায়াত

ভারতীয় কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকায় বাংলাদেশে নতুন সরকার যে-ই গঠন করুক, তাদের সঙ্গেই দিল্লিকে কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে চীনই সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার, যার প্রায় ৯৫ শতাংশই চীন থেকে আমদানি।

শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে শত শত মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। হাসিনার শাসনামলে আদানি গ্রুপসহ একাধিক ভারতীয় সংস্থা বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ করলেও তার পতনের পর নতুন কোনো চুক্তি হয়নি।

নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রোগ্রেসের জ্যেষ্ঠ ফেলো কনস্টান্টিনো জাভিয়ার বলেন, ‘ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের সংকটকে কাজে লাগিয়ে চীন প্রকাশ্য ও আড়াল—দুইভাবেই ধীরে ধীরে নিজের প্রভাব বাড়াচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমে যাওয়া এবং ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে চীন নিজেকে আরও নির্ভরযোগ্য ও পূর্বানুমেয় অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে।’

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করবে। কারণ বেইজিং তুলনামূলকভাবে বেশি অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার সময় হিন্দু সংখ্যালঘু ইস্যুতে ভারতের মতো বিতর্কে জড়ায় না।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের থমাস কিয়ান বলেন, ‘ঢাকা ও দিল্লি যদি সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে না পারে, তাহলে বাংলাদেশের পরবর্তী সরকারের জন্য বেইজিংয়ের দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা আরও বাড়বে।’

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন নয়

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হওয়া মানেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য চীন ও ভারত—দুই দেশকেই প্রয়োজন। বিষয়টি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হলেও কোনো সরকারই ভারতকে উপেক্ষা করার মতো অবিবেচক হবে না।’

তিনদিক থেকে ভারতের সীমান্তবেষ্টিত বাংলাদেশ বাণিজ্য, ট্রানজিট ও নিরাপত্তা সহযোগিতার জন্য প্রতিবেশী দেশটির ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, স্থলসীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য ঢাকার সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক প্রয়োজন ভারতেরও। শেখ হাসিনা ভারতে বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সহযোগিতা করেছিলেন।

সরকারি তথ্যে দেখা যায়, রাজনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য প্রায় ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের রপ্তানি বেশি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় আদানি গ্রুপ বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়িয়েছে, যদিও হাসিনার সময় নির্ধারিত উচ্চ শুল্কের সমালোচনা করেছে ঢাকা।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত সহায়তা করলেও, পানি বণ্টন, সীমান্তে হত্যা এবং শেখ হাসিনার অজনপ্রিয় শাসনকে ভারত বৈধতা দিয়েছে—এমন ধারণা দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।

জেন জি–সমর্থিত ও জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা ভারতের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

দলের প্রধান নাহিদ ইসলাম রয়টার্সকে বলেন, ‘এটি শুধু নির্বাচনি বক্তব্য নয়। তরুণদের মধ্যে ভারতের আধিপত্য গভীরভাবে অনুভূত হয় এবং এটি নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যু।’

সূত্র: রয়টার্স
কেএএ/