শীতের হাওয়ায় গুলিস্তানের ফুটপাতে উষ্ণতার খোঁজ
প্রয়োজনমতো শীতের কাপড় কিনছেন ক্রেতারা, ছবি: মাহবুব আলম
ঢাকার আকাশে কুয়াশা যত ঘনিয়ে আসছে গুলিস্তানের ফুটপাতে ততই বাড়ছে মানুষের ভিড়। ঠান্ডা শুধু অনুভূতির জায়গায় আটকে নেই, তা ছুঁয়ে যাচ্ছে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনকে। আর সেই প্রয়োজনের ভাষা হয়ে উঠেছে গুলিস্তানের শীতের কাপড়ের জমজমাট বেচাকেনা।

সন্ধ্যা নামলেই গুলিস্তান যেন অন্য রূপ নেয়। ফুটপাতজুড়ে সাজানো হয় সোয়েটার, জ্যাকেট, হুডি, শাল আর কম্বল। ঝুলে থাকা কাপড়ের সারির ফাঁকে ফাঁকে ক্রেতাদের হাঁটা, দরদাম, বিক্রেতার ডাক সব মিলিয়ে শীতের সন্ধ্যায় এখানে তৈরি হয় এক আলাদা জীবনের দৃশ্যপট। ঠান্ডা হাওয়ার ভেতরেও মানুষের চোখে থাকে উষ্ণতার খোঁজ।

এই বাজারে আসা মানুষগুলোর গল্প একেক রকম। কেউ কিনছেন সন্তানের জন্য, কেউ নিজের জন্য, কেউ বা ঘরের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটির কথা ভেবে। কারও হাতে সীমিত টাকা, তবু শীত ঠেকাতে প্রয়োজন একটা মোটা কাপড়। তাই দামাদামির ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে থাকে হিসাব, দুশ্চিন্তা আর দায়িত্ববোধ। এখানে শীতের কাপড় শুধু ফ্যাশনের নয়; এগুলো প্রয়োজন, বেঁচে থাকার প্রস্তুতি।

অন্যদিকে, বিক্রেতারাও এই সময়টার অপেক্ষায় থাকেন। সারা বছর নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটানো মানুষগুলো শীত এলেই একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন। কারণ এই মৌসুমটাই তাদের জীবিকার বড় ভরসা। ঠান্ডা যত বাড়ে, তাদের চোখে তত বাড়ে আশার আলো। প্রতিটি বিক্রি হওয়া সোয়েটার কিংবা কম্বলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সংসারের চালচিত্র, ভাড়া, বাজার, সন্তানের পড়াশোনার খরচ।

গুলিস্তানের এই শীতের বাজারে বিলাসিতা কম, বাস্তবতা বেশি। এখানে নতুন-পুরোনো কাপড়ের তফাৎ থাকলেও মানুষের চাহিদা এক, ঠান্ডা থেকে একটু রেহাই। কেউ কাপড় গায়ে জড়িয়ে আয়নায় নিজেকে দেখেন না; দেখেন শীতটা কতটা কম লাগছে।

শীতের বাতাসে শহর যখন ধীরে ধীরে গুটিয়ে আসে, তখন গুলিস্তানের ফুটপাতে জীবন জমে ওঠে। আলো-আঁধারের ভেতর, ঠান্ডা হাত আর ব্যস্ত পায়ের শব্দে বোঝা যায় এই শহরে শীত মানে শুধু আবহাওয়া নয়, শীত মানে প্রয়োজন, সংগ্রাম আর উষ্ণ থাকার এক নীরব চেষ্টা।

গুলিস্তানের এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় শীত সবার জন্য একরকম নয়। কারও কাছে এটি আরামের অজুহাত, কারও কাছে বাঁচার লড়াই। আর এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে গুলিস্তানের ফুটপাত, যেখানে প্রতিটি শীতের কাপড়ের সঙ্গে বিক্রি হয় একটু উষ্ণতা, একটু স্বস্তি, আর অনেক মানুষের গল্প।
জেএস/