কাকে ভোট দেবেন জানেন না? আবেগ নয়, যুক্তিতে সিদ্ধান্ত নিন
প্রতীকী ছবি, এআই দিয়ে বানানো
নির্বাচনের শেষ সময়ে এসে বেশিরভাগ ভোটারই দোটানায় পড়েন, ভোগেন সিদ্ধান্তহীনতায়। কাকে ভোট দিবেন? আর কেনই বা দিবেন সেটা নিয়ে এক ধরনের দ্বিধায় পড়েন। চারদিকে নির্বাচনি প্রচারণা, স্লোগান, ব্যানার, পোস্টার, বাহারি সব প্রতিশ্রুতি, সোশ্যাল মিডিয়ার রমরমা প্রচারণা সব মিলিয়ে ভোটার স্থির হতে পারছেন না। এমন সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া খুবই কঠিন।
এই সময় প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতিতে আপনি সহজেই আবেগে ভেসে যেতে পারেন। কিন্তু আপনাকে মনে রাখতে হবে একটি ভোট শুধুই ব্যক্তিগত পছন্দ নয়; এটি সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই এই বিশেষ সময়ে আবেগ দিয়ে নয়, যুক্তি আর তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। এখন প্রশ্ন তাহলে কি করা উচিত। চলুন তাহলে জেনে নেই শেষ সময়ে কিভাবে স্থির হবেন ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন সে সম্পর্কে।
আগে নিজের অগ্রাধিকার ঠিক করুন
ভোট দিতে যাওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন আপনার কাছে কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ? এলাকার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন নাকি নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা। কারণ সব ভোটারের অগ্রাধিকার এক নয়। নিজের প্রয়োজন ও মূল্যবোধ পরিষ্কার না হলে অন্যের কথায় প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
প্রার্থী সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানুন
আমরা ভোট দিতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অনেকেই জানি না সেই এলাকার প্রার্থীদের যোগ্যতা ও কাজ সর্ম্পকে। তাই বেশিরভাগ সময়ই আমরা প্রার্থী সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেই লোকমুখে শুনে। কিন্তু যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের জন্য দরকার যাচাইকৃত তথ্য। তাই জানার চেষ্টা করুন প্রার্থীর পেশাগত ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কী? আগে কোনো দায়িত্বে থাকলে কাজের রেকর্ড কেমন? এলাকায় তার গ্রহণযোগ্যতা আছে কি না? কোনো গুরুতর অভিযোগ বা বিতর্ক রয়েছে কি না? ব্যক্তিগত আক্রমণ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপপ্রচারকে তথ্য হিসেবে ধরবেন না।
প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবতা দেখুন
নির্বাচনের সময় সব প্রার্থীই নানা ধরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন। যেমন- সব সমস্যার সমাধান, দ্রুত উন্নয়ন, স্বপ্নের এলাকা। কিন্তু প্রশ্ন হলো সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবসম্মত কি না। তাই আগে ভাবুন ও খোঁজ নিয়ে জানুন প্রার্থী বা দল আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি কতটা পালন করেছে? প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা আছে কি না? কথার সঙ্গে কাজের মিল আছে কি না? কারণ অতিরিক্ত আবেগী বা অবাস্তব আশ্বাস যুক্তির জায়গা নেয় না।
আরও পড়ুন:
দল নয়, ব্যক্তির ভূমিকাও বিবেচনায় নিন
অনেকে শুধু দল দেখে ভোট দেন, আবার কেউ শুধু ব্যক্তি দেখে। যুক্তিসংগত সিদ্ধান্তের জন্য দুটোই বিবেচনায় রাখা জরুরি। দল ক্ষমতায় গেলে কী ধরনের নীতি গ্রহণ করে? প্রার্থী হিসেবে ব্যক্তি কতটা দায়িত্বশীল ও সৎ? নির্বাচিত হলে তিনি এলাকায় সময় দেবেন কি না? কারণ একটি ভালো দলেও দুর্বল প্রার্থী থাকতে পারে, আবার কম পরিচিত দলেও যোগ্য প্রার্থী থাকতে পারেন।
আবেগী চাপ থেকে নিজেকে দূরে রাখুন
পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী বা সামাজিক পরিবেশ অনেক সময় সিদ্ধান্তে চাপ তৈরি করে। কিন্তু ভোট আপনার ব্যক্তিগত অধিকার। মনে রাখুন ভোট গোপন, সিদ্ধান্ত আপনার। কারও মন রাখার জন্য ভোট দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত মানে নিজের বিবেকের সঙ্গে সৎ থাকা।
অতীতের অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করুন
আপনার এলাকা বা দেশের অতীত অভিজ্ঞতা অনেক কিছু শেখায়। আগের নির্বাচনে যাদের নির্বাচিত করা হয়েছিল, ফলাফল কেমন ছিল? সমস্যাগুলোর সমাধান হয়েছে, না আরও বেড়েছে? সাধারণ মানুষের কথা শোনা হয়েছে কি না? এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
‘ভোট না দেওয়াই ভালো’ এই ভাবনা কি ঠিক?
অনেকে সিদ্ধান্তহীন হলে ভোট না দেওয়ার কথা ভাবেন। কিন্তু ভোট না দেওয়াও এক ধরনের সিদ্ধান্ত, যার ফল ভোগ করতে হয় সবাইকে।
- আপনার ভোট পছন্দের প্রার্থীকে শক্তিশালী করতে পারে
- অযোগ্য প্রার্থীকে ঠেকাতে পারে
- গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আপনার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে
সম্পূর্ণ নিখুঁত প্রার্থী নাও পেতে পারেন, কিন্তু তুলনামূলকভাবে ভালো বিকল্প বেছে নেওয়াই যুক্তিসংগত।
শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে হলে কী করবেন?
যদি একেবারে শেষ সময় পর্যন্ত দ্বিধা থাকে দুই বা তিনজন প্রার্থীর মধ্যে তুলনা করুন। আপনার অগ্রাধিকারের সঙ্গে যিনি সবচেয়ে বেশি মেলে, তাকে বেছে নিন। আবেগ নয়, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব চিন্তা করুন। শান্ত মাথার সিদ্ধান্ত অনেক সময় সবচেয়ে সঠিক হয়।
ভোট দেওয়া শুধু একটি অধিকার নয়, এটি দায়িত্বও। আবেগের বশে নেওয়া সিদ্ধান্ত ক্ষণিকের সন্তুষ্টি দিতে পারে, কিন্তু যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তই দীর্ঘমেয়াদে সমাজের উপকারে আসে। তাই কাকে ভোট দেবেন এই প্রশ্নের একক কোনো উত্তর নেই। উত্তরটি তৈরি হয় আপনার মূল্যবোধ, তথ্যজ্ঞান আর যুক্তির সমন্বয়ে। আবেগকে পুরোপুরি বাদ দিতে না পারলেও, সিদ্ধান্তের চালিকাশক্তি যেন হয় যুক্তি। কারণ একটি সচেতন ভোটই পারে আপনার এলাকা ও দেশের ভবিষ্যৎকে একটু হলেও সঠিক পথে এগিয়ে নিতে।
জেএস/