নির্বাচনি উত্তাপে যেন না পুড়ে যায় দাম্পত্য সম্পর্ক
জাতীয় সংসদ নির্বাচন মানেই শুধু ভোটের লড়াই নয়, এটা মতাদর্শের সংঘাত, আবেগের বিস্ফোরণ আর সামাজিক উত্তেজনার সময়। এই উত্তাপ যখন ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে, তখন সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে দাম্পত্য সম্পর্ক। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রী যদি দুই ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থক হন, তাহলে নির্বাচন ঘিরে মতভেদ সহজেই ঝগড়া, দূরত্ব কিংবা নীরব অস্বস্তিতে রূপ নিতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো রাজনৈতিক মতপার্থক্য কি সম্পর্ক ভাঙার কারণ হওয়া উচিত? নাকি সচেতন কিছু আচরণ ও মানসিক কৌশলে এই সময়টাও শান্তভাবে পার করা সম্ভব?
কেন নির্বাচন দাম্পত্য সম্পর্কে প্রভাব ফেলে
রাজনীতি কেবল যুক্তির বিষয় নয়, আবেগেরও। অনেকের কাছে রাজনৈতিক দল মানে বিশ্বাস, পরিচয় ও ভবিষ্যতের আশা। ফলে প্রিয় দলের সমালোচনা অনেক সময় ব্যক্তিগত আঘাত হিসেবে মনে হয়। স্বামী বা স্ত্রী যদি ভিন্ন দলের সমর্থক হন, তাহলে সেই আঘাত আসে সবচেয়ে কাছের মানুষটির কাছ থেকেই। এতে-
- তর্ক দ্রুত ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে যায়
- একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে
- ‘আমি ঠিক, তুমি ভুল’ মানসিকতা তৈরি হয়
- ঘরের পরিবেশ অশান্ত হয়ে ওঠে
- এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে দাম্পত্য সম্পর্কে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
মনে রাখতে হবে দাম্পত্য কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ নয়
সংসার কোনো টক শো নয়, যেখানে জিতে যাওয়াই লক্ষ্য। এখানে লক্ষ্য হলো বোঝাপড়া, সম্মান আর নিরাপত্তা। তাই প্রথমেই মেনে নিতে হবে একই ঘরে থেকেও রাজনৈতিক মত আলাদা হতে পারে, এতে সম্পর্কের মান কমে না।
ভোটের পছন্দ ব্যক্তিগত। যেমন আপনি আপনার সঙ্গীর খাবারের রুচি বা পছন্দের সিনেমা বদলাতে চান না, তেমনি রাজনৈতিক বিশ্বাস বদলানোর চাপও দেওয়া উচিত নয়।
নির্বাচনী সময়ে দাম্পত্য শান্তি বজায় রাখার কৌশল
রাজনীতি নিয়ে ‘সীমারেখা’ টানুন: সব বিষয়ে আলোচনা দরকার নেই। দুজন মিলে ঠিক করতে পারেন ঘরে বসে কোন বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে না। বিশেষ করে ভোটের আগের কয়েকদিন রাজনৈতিক বিতর্ক এড়িয়ে চলাই ভালো।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব কমান: নির্বাচনের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে ওঠে গুজব, উত্তেজনা আর আক্রমণাত্মক বক্তব্যে ভরা। একসঙ্গে বসে এসব দেখলে তর্ক বাড়ার আশঙ্কা বেশি। প্রয়োজনে কিছুদিন অনলাইন রাজনীতি থেকে দূরে থাকুন।
‘তুমি ভুল’ নয়, ‘আমি ভাবি’ ভাষা ব্যবহার করুন: কথা বলার ধরন অনেক কিছু বদলে দেয়। ‘তুমি একদম ভুল দল সাপোর্ট করো’,এর বদলে বলুন ‘আমি বিষয়টা একটু ভিন্নভাবে দেখি।’-এই ছোট পরিবর্তন বড় সংঘাত ঠেকাতে পারে।
সম্পর্কের পরিচয়টা আগে আনুন: নিজেকে আগে স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে ভাবুন, তারপর সমর্থক। মনে রাখুন ভোট পাঁচ বছরে একবার আসে, কিন্তু সম্পর্ক প্রতিদিনের।
সন্তান থাকলে আরও দায়িত্বশীল হোন: ঘরের ছোটরা বড়দের আচরণ থেকে শেখে। রাজনৈতিক ঝগড়া তাদের মানসিক নিরাপত্তা নষ্ট করতে পারে। ভিন্নমত থাকলেও তা সম্মানের সঙ্গে প্রকাশ করা জরুরি।
আরও পড়ুন:
- কেন টেকেনি আমিরের সংসার, জানালেন নিজেই
- মানুষ পরকীয়ায় জড়ায় কেন? গবেষণা যা বলছে
- স্বামীর সাথে ঝগড়া, আলমারি গোছানোই সমাধান!
কখন সতর্ক হওয়া দরকার
- তর্কে অসম্মানজনক ভাষা আসছে
- একে অপরকে অপমান বা হুমকি দেওয়া হচ্ছে
- কথা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন
তাহলে সেটাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজনে নিরপেক্ষ কোনো তৃতীয় ব্যক্তি বা কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। কারণ রাজনীতি সাময়িক, কিন্তু মানসিক ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী।
নির্বাচন যাবে, সম্পর্ক থাকবে
নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, সংসারের ভোর শুরু হবে পরদিনও। সেই ভোরটা যেন চাপা কষ্ট, নীরব রাগ আর দূরত্ব নিয়ে না আসে সে দায়িত্ব দুজনেরই। রাজনৈতিক মতভেদ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আর দাম্পত্যে ভিন্নমত সামলানোর ক্ষমতাই সম্পর্কের পরিপক্বতা। তাই নির্বাচনী উত্তাপের এই সময়ে একে অপরকে হারানোর ঝুঁকি না নিয়ে, বরং বোঝাপড়ার জায়গাটা শক্ত করুন। কারণ শেষ পর্যন্ত ভোট বাক্সে পছন্দ আলাদা হতে পারে, কিন্তু ঘরের শান্তির ব্যালট যেন একসঙ্গেই পড়ে।
তথ্যসূত্র: স্ট্রেস ইন আমেরিকা
জেএস/
