প্রদাহ কমাতে প্রতিদিন পান করুন এক কাপ গ্রিন টি
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত গ্রিন টি পান করা পুরুষদের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়। যারা প্রতিদিন গ্রিন টি পান করেন তাদের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা গড়ে ৩০ শতাংশ বেশি, প্রদাহের মাত্রা ২৭ শতাংশ কম এবং অনিদ্রার সমস্যা ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কম। তুলনামূলকভাবে যারা গ্রিন টি পান করেন না তাদের চেয়ে কম।
এই ফলাফল আবারও প্রমাণ করে, বহু শতাব্দী ধরে স্বাস্থ্যকর পানীয় হিসেবে পরিচিত গ্রিন টি কেবল একটি সাধারণ পানীয় নয়, বরং এটি শরীর ও মনের জন্য বহুমুখী উপকারী একটি প্রাকৃতিক উপাদান।
প্রদাহ কমাতে গ্রিন টির ভূমিকা
আমাদের শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বিভিন্ন জটিল রোগের অন্যতম কারণ। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, বাতের সমস্যা এমনকি কিছু ধরনের ক্যানসারের ক্ষেত্রেও প্রদাহ বড় ভূমিকা রাখে। গ্রিন টিতে রয়েছে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান, বিশেষ করে ইপিগ্যালোক্যাটেচিন-৩-গ্যালেট (ইজিসিজি), যা প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর।
ইজিসিজি শরীরে প্রদাহ সৃষ্টিকারী সাইটোকাইন ও বিভিন্ন এনজাইমের উৎপাদন কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি এটি ফ্রি র্যাডিক্যাল বা ক্ষতিকর অণুকে নিষ্ক্রিয় করে কোষের ক্ষতি প্রতিরোধ করে। ফলে শরীরের ভেতরের প্রদাহজনিত প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসে।
হাড় ও তরুণাস্থি সুরক্ষায় কার্যকর
প্রদাহ শুধু রক্তনালিতেই নয়, হাড় ও জয়েন্টের ওপরও প্রভাব ফেলে। দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের কারণে হাড় ক্ষয়, জয়েন্টে ব্যথা বা আর্থ্রাইটিসের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। গ্রিন টি শরীরে কিছু নির্দিষ্ট প্রদাহজনক অণুর উৎপাদন কমিয়ে হাড় ও তরুণাস্থিকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। নিয়মিত সেবনে এটি জয়েন্টের স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।
টেস্টোস্টেরন বৃদ্ধি ও হরমোনের ভারসাম্য
পুরুষদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন, যা পেশী গঠন, শক্তি, যৌনস্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক কর্মক্ষমতার সঙ্গে জড়িত। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রিন টি শরীরে ৫-আলফা রিডাক্টেজ নামের একটি এনজাইমের কার্যক্রম কমিয়ে দিতে পারে। এই এনজাইম টেস্টোস্টেরনকে আরও শক্তিশালী এক রূপে রূপান্তর করে।
যখন এই এনজাইমের কার্যকারিতা কমে যায়, তখন টেস্টোস্টেরনের স্বাভাবিক সক্রিয় রূপ শরীরে বেশি পরিমাণে বজায় থাকে। ফলে রক্তে টেস্টোস্টেরনের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে শক্তি, মনোযোগ ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর।
অনিদ্রা দূর করতে সহায়ক
আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, মানসিক চাপ ও অতিরিক্ত পর্দা ব্যবহারের কারণে অনিদ্রা এখন সাধারণ সমস্যা। গ্রিন টিতে রয়েছে এল-থিয়ানিন নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিড, যা মস্তিষ্কে প্রশান্তি আনতে সাহায্য করে। এটি স্নায়ুকোষের অতিরিক্ত উত্তেজনা কমিয়ে মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে শান্ত অবস্থায় নিয়ে যায়।
এল-থিয়ানিন মানসিক চাপ কমায় এবং ঘুমের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। নিয়মিত গ্রিন টি সেবনে শরীরের প্রাকৃতিক ঘুমের ছন্দ পুনরুদ্ধারে সহায়তা মিলতে পারে।
ক্যাফেইন নিয়ে উদ্বেগ?
অনেকে মনে করেন, চায়ে ক্যাফেইন থাকার কারণে রাতে এটি পান করলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। তবে গ্রিন টিতে ক্যাফেইনের পরিমাণ কফির তুলনায় অনেক কম। তাছাড়া বর্তমানে ক্যাফেইনমুক্ত সংস্করণও সহজলভ্য, যা ঘুমের আগে পান করলেও তেমন সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা কম।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সবুজ চায়ে থাকা এল-থিয়ানিন দীর্ঘমেয়াদে স্নায়ুকে শান্ত রাখতে কাজ করে, যা ক্যাফেইনের সম্ভাব্য প্রভাবকেও অনেকাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে।
প্রতিদিন কতটা গ্রহণ উপযোগী?
বিশেষজ্ঞরা সাধারণত দিনে ২ থেকে ৩ কাপ গ্রিন টি পান করার পরামর্শ দেন। তবে যাদের গ্যাস্ট্রিক বা অতিরিক্ত অ্যাসিডিটির সমস্যা রয়েছে, তারা খালি পেটে না খাওয়াই ভালো। একই সঙ্গে কোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগ বা ওষুধ গ্রহণের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গ্রিন টি কোনো জাদুকরি ওষুধ নয়, তবে এটি একটি প্রাকৃতিক সহায়ক পানীয়। যা নিয়মিত ও পরিমিত সেবনে শরীরের ভেতরের প্রদাহ কমাতে, হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং ঘুমের মান উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সুষম খাদ্য ও নিয়মিত ব্যায়ামের সঙ্গে যদি যুক্ত হয় প্রতিদিনের এক কাপ গ্রিন টি তবে তা হতে পারে সুস্থতার পথে একটি সহজ কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ।
তথ্যসূত্র: দ্যা ফার্মেসি রিয়েল
জেএস/