প্যানক্রিয়াটাইটিসের ইতিহাস থাকলে কেমন সতর্কতা জরুরি?
প্রতীকী ছবি, এআই দিয়ে বানানো
পেটের ভেতরে অবস্থিত ছোট একটি অঙ্গ ‘অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াস’ হজম ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই অঙ্গের প্রদাহকে বলা হয় প্যানক্রিয়াটাইটিস। একবার এই রোগে আক্রান্ত হলে অনেকেই সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান। কিন্তু যাদের প্যানক্রিয়াটাইটিসের ইতিহাস আছে, তাঁদের জন্য কিছু দীর্ঘমেয়াদি সতর্কতা মানা অত্যন্ত জরুরি। অবহেলা করলে পুনরায় আক্রমণ, জটিলতা এমনকি স্থায়ী ক্ষতিও হতে পারে।
প্যানক্রিয়াটাইটিস কী এবং কেন হয়?
প্যানক্রিয়াটাইটিস সাধারণত দুই ধরনের অ্যাকিউট (হঠাৎ তীব্র প্রদাহ) এবং ক্রনিক (দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ)। পিত্তথলির পাথর, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেশি থাকা, কিছু ওষুধ এবং অ্যালকোহল গ্রহণ এসব কারণেই বেশি দেখা যায়।
অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসে তীব্র পেটব্যথা, বমি, জ্বর হতে পারে। ক্রনিক অবস্থায় ধীরে ধীরে অগ্ন্যাশয়ের কার্যক্ষমতা কমে যায়, ফলে হজমের সমস্যা ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে।
ছবি: ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এ.কে.এম. যোবায়ের
ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এ.কে.এম. যোবায়ের বলেন, যাদের একবার প্যানক্রিয়াটাইটিস হয়েছে, তাদের জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় হলো কারণটি শনাক্ত করে সেটি নিয়ন্ত্রণে রাখা। কারণ ঠিক না করলে রোগ ফিরে আসার আশঙ্কা থেকেই যায়।
তিনি জানান, পিত্তথলির পাথর থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। রক্তে চর্বির মাত্রা বেশি থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্যানক্রিয়াটাইটিসের ইতিহাস থাকলে খাদ্যাভ্যাসে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। যেমন-
- অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত ও ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চলা
- লাল মাংস ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া
- হালকা, সহজপাচ্য ও সুষম খাবার গ্রহণ
- অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া
- পর্যাপ্ত পানি পান
ডা. যোবায়ের বলেন, অগ্ন্যাশয়কে বিশ্রাম দেওয়াই মূল লক্ষ্য। অতিরিক্ত তেল-চর্বি হজমে অগ্ন্যাশয়ের ওপর চাপ বাড়ায়, যা পুনরায় প্রদাহের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এমনকি যাদের প্যানক্রিয়াটাইটিস হয়েছে, তাদের জন্য অ্যালকোহল সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা উচিত। অল্প পরিমাণেও তা ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ডা. যোবায়ের সতর্ক করে বলেন, অ্যালকোহলজনিত প্যানক্রিয়াটাইটিসের ক্ষেত্রে আবার অ্যালকোহল গ্রহণ করলে রোগ দ্রুত জটিল আকার নিতে পারে।
নিয়মিত ফলোআপ ও পরীক্ষা
প্যানক্রিয়াটাইটিসের ইতিহাস থাকলে নিয়মিত চিকিৎসকের ফলোআপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম বা অন্যান্য ইমেজিং টেস্ট করাতে হতে পারে। যদি দীর্ঘদিনের ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিস থাকে, তাহলে হজমের এনজাইম কমে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসক এনজাইম সাপ্লিমেন্ট দিতে পারেন। পাশাপাশি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থাকায় রক্তে শর্করার মাত্রাও পর্যবেক্ষণে রাখা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন:
- রোজায় চা-কফি ও সফট ড্রিংকস কতটা নিরাপদ?
- ফ্যাটি লিভার রোগীদের জন্য রোজা উপকারী নাকি ঝুঁকিপূর্ণ?
- অসুস্থ হলে কখন রোজা ভাঙা জরুরি
সতর্ক সংকেত যেগুলো অবহেলা করা যাবে না
তীব্র বা বাড়তে থাকা পেটব্যথা
পিঠে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা
বারবার বমি
অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া
তৈলাক্ত বা দুর্গন্ধযুক্ত পায়খানা
জ্বর
এসব লক্ষণ পুনরায় প্রদাহ বা জটিলতার ইঙ্গিত হতে পারে।
রোজা বা দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা কি ঝুঁকিপূর্ণ?
অনেকেই জানতে চান, প্যানক্রিয়াটাইটিসের ইতিহাস থাকলে দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা নিরাপদ কি না। ডা. যোবায়ের বলেন, রোগের ধরন ও বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যাদের ক্রনিক সমস্যা রয়েছে বা বারবার অ্যাকিউট অ্যাটাক হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা বা অতিরিক্ত ভরপেট খাওয়া দুটোই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
ডা. এ.কে.এম. যোবায়েরের পরামর্শ অনুযায়ী, সচেতন থাকলে এবং কারণ নিয়ন্ত্রণে রাখলে অধিকাংশ রোগীই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। তবে সামান্য উপসর্গকেও অবহেলা করা যাবে না—কারণ অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ দ্রুত জটিল আকার নিতে পারে।
জেএস/