ফ্যাটি লিভার রোগীদের জন্য রোজা উপকারী নাকি ঝুঁকিপূর্ণ?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
লাইফস্টাইল ডেস্ক লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:১০ এএম, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রতীকী ছবি, এআই দিয়ে বানানো

রোজা শুধু আধ্যাত্মিক সাধনার সময় নয়, বরং শরীরের জন্যও এক ধরনের শৃঙ্খলা। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, খাবারের সময় ও ধরনে পরিবর্তন এসব আমাদের বিপাকপ্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে। কিন্তু যারা ফ্যাটি লিভারে ভুগছেন, তাদের জন্য রোজা কি উপকার বয়ে আনে, নাকি ঝুঁকি বাড়ায় এই প্রশ্নটি প্রায়ই উঠে আসে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি এককথায় ‘উপকারী’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে নির্ধারণ করা যায় না। রোগের ধরন, জটিলতা এবং ব্যক্তির সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার ওপরই নির্ভর করে সিদ্ধান্ত।

ফ্যাটি লিভার কী এবং কেন হয়?

ফ্যাটি লিভার হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে লিভারের কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমে যায়। সাধারণত অতিরিক্ত ওজন, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে চর্বির মাত্রা বেশি থাকা এবং অনিয়মিত জীবনযাপন এসব কারণে এই সমস্যা দেখা দেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি তেমন উপসর্গ দেয় না। কিন্তু দীর্ঘদিন অবহেলা করলে লিভারে প্রদাহ, ফাইব্রোসিস এমনকি সিরোসিস পর্যন্ত হতে পারে।

ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এ.কে.এম. যোবায়ের

রোজা কি উপকারী হতে পারে?

ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এ.কে.এম. যোবায়ের বলেন, যাদের ফ্যাটি লিভার প্রাথমিক পর্যায়ে এবং লিভারের কার্যকারিতা স্বাভাবিক আছে, তাদের জন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে রোজা রাখা অনেক সময় উপকারী হতে পারে। কারণ দীর্ঘ সময় না খেলে শরীর জমে থাকা চর্বি ব্যবহার করতে শুরু করে, যা ওজন কমাতে সাহায্য করে। ওজন নিয়ন্ত্রণ ফ্যাটি লিভার ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তিনি আরও জানান, রোজার সময় যদি ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত চিনি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা যায় এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ করা হয়, তাহলে লিভারের ওপর চাপ কমে।

তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে একই পরামর্শ প্রযোজ্য নয়। ডা. যোবায়ের বলেন, যাদের লিভারে প্রদাহ আছে, লিভার এনজাইম অনেক বেশি অথবা সিরোসিসের মতো জটিলতা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা বা পানিশূন্যতা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে যদি রোগী দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, বমি ভাব বা তীব্র পেটব্যথায় ভোগেন, তাহলে রোজা রাখা নিরাপদ নাও হতে পারে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, লিভার রোগীরা অবশ্যই রোজা রাখার আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।

রোজায় খাদ্যাভ্যাস কেমন হওয়া উচিত?

  • ইফতারে অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, তৈলাক্ত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা
  • চিনি ও মিষ্টি কম খাওয়া
  • পর্যাপ্ত পানি পান করা (ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত)
  • শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ
  • অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট ও কোমল পানীয় পরিহার

ডা. যোবায়ের বলেন, রোজা রেখে রাতের বেলা অতিরিক্ত খেয়ে ফেললে উপকারের বদলে ক্ষতি হতে পারে। অনেকেই মনে করেন সারাদিন না খেয়ে থাকায় যা ইচ্ছা খাওয়া যাবে এটি ভুল ধারণা।

যারা নিয়মিত ওষুধ খান, তাদের ক্ষেত্রে ডোজ ও সময় পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ বা সময় পরিবর্তন করা উচিত নয়। রোজার আগে লিভার ফাংশন টেস্ট করিয়ে নেওয়া ভালো, যাতে বোঝা যায় রোগের বর্তমান অবস্থা কী।

আরও পড়ুন: 

সতর্ক সংকেত

রোজা রাখার সময় যদি তীব্র দুর্বলতা, জন্ডিস (চোখ বা ত্বক হলুদ হওয়া), তীব্র পেটব্যথা, বমি বা বমিতে রক্ত, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা বিভ্রান্তি- এসব লক্ষণ জটিলতার ইঙ্গিত হতে পারে। এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

ফ্যাটি লিভার রোগীদের জন্য রোজা একদিকে যেমন ওজন কমানো ও বিপাক নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে, অন্যদিকে জটিল রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে। তাই একক কোনো সিদ্ধান্ত নয়; ব্যক্তিভেদে চিকিৎসকের পরামর্শই হওয়া উচিত প্রধান নির্দেশনা।

ডা. এ.কে.এম. যোবায়েরের ভাষায়, রোজা নিজে ক্ষতিকর নয়; ভুল খাদ্যাভ্যাস ও অনিয়ন্ত্রিত রোগই আসল সমস্যা। সচেতন থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপদে রোজা রাখা সম্ভব।

জেএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।