টানা ভাজাপোড়া খেলে শরীরে যেসব পরিবর্তন হতে পারে
ভাজাপোড়া দিয়ে মুড়ি মাখিয়ে ইফতার করছেন তারা, ছবি: জাগো নিউজ
ঐতিহ্য আর স্বাদের টানে ইফতারের টেবিলে বেগুনি, পেঁয়াজু, আলুর চপ বা বিভিন্ন ধরনের ভাজাপোড়া যেন অপরিহার্য। খিচুড়ি, হালিম বা অন্য ভারী খাবার থাকলেও অনেকেই ভাজা আইটেম ছাড়া ইফতার কল্পনাই করতে পারেন না। কিন্তু টানা এক মাস প্রতিদিন ভাজাপোড়া খাওয়ার অভ্যাস শরীরের ভেতরে নীরবে নানা পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
বাইরে থেকে সব ঠিকঠাক মনে হলেও ভেতরে শুরু হতে পারে অস্বস্তির সূচনা। চলুন জেনে নেই একটানা এক মাস ভাজাপোড়া খেলে শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে এবং কেন সেগুলো নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

নীরবে বাড়বে ওজন
ভাজাপোড়া খাবারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বাড়তি ক্যালরি ও অতিরিক্ত লবণ। তেলে ডুবিয়ে ভাজা খাবারে ক্যালরির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। শরীর যতটুকু শক্তি খরচ করে, তার চেয়ে বেশি ক্যালরি গ্রহণ করলে সেই অতিরিক্ত অংশ জমা হয় চর্বি হিসেবে।
রমজানে অনেকেরই দৈনন্দিন শারীরিক পরিশ্রম কমে যায়, নিয়মিত ব্যায়ামও করা হয় না। ফলে বাড়তি ক্যালরি পোড়ানোর সুযোগ থাকে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ওজনের ওপর।

অন্যদিকে, ভাজাপোড়া খাবারে থাকা লবণও ওজন বাড়াতে ভূমিকা রাখে। লবণের স্বভাবই হলো শরীরে পানি ধরে রাখা। লবণ রক্তে শোষিত হলে রক্তে পানির পরিমাণ বাড়ে। সেই পানি কোষের মাঝের ফাঁকা জায়গায় জমা হতে পারে। এতে শরীরে ফোলাভাব দেখা দেয় এবং ওজন সাময়িকভাবে বাড়ে। অনেকেই মনে করেন চর্বি জমেছে, আসলে তার একটি অংশ পানি জমার ফল।
পিপাসা বাড়বে, তবু কোষ থাকবে পানিশূন্য
ভাজাপোড়া খাবারের অতিরিক্ত লবণ শরীরের পানির ভারসাম্য নষ্ট করে। রক্তনালী ও কোষের বাইরের অংশে পানি বেশি জমলেও কোষের ভেতরের পানির পরিমাণ কমে যেতে পারে। অর্থাৎ শরীরে মোট পানি থাকলেও কোষগুলো পানির অভাবে ভোগে।

এর ফল হলো বারবার পিপাসা লাগা। ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি না খেলে এই সমস্যা আরও বাড়ে। দীর্ঘ সময় এভাবে চলতে থাকলে পানিশূন্যতার ঝুঁকি তৈরি হয়। মাথাব্যথা, দুর্বলতা, মনোযোগ কমে যাওয়া এসব উপসর্গও দেখা দিতে পারে।
হজমে অস্বস্তি ও অ্যাসিডিটির ঝুঁকি
তেলেভাজা খাবার হজমে সময় নেয়। নিয়মিত ভাজাপোড়া খেলে পাকস্থলীতে অ্যাসিডের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। খাবার খাওয়ার পর বুক জ্বালাপোড়া বা গলায় খাবার উঠে আসছে এমন অনুভূতি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

দীর্ঘদিন এ অভ্যাস বজায় থাকলে পাকস্থলীর প্রদাহের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অম্বল, গ্যাস্ট্রিক, বদহজম এসব সমস্যা তখন নিয়মিত সঙ্গী হয়ে ওঠে। যাদের আগে থেকেই হজমজনিত সমস্যা আছে, তাদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি।
শরীরে চর্বি জমার গতি বাড়বে
অতিরিক্ত ক্যালরি শরীরে জমে চর্বি হিসেবে। এই চর্বি শুধু পেটের ওপরেই জমে না, রক্তে এবং রক্তনালির দেয়ালেও জমা হতে থাকে। লিভার ও পেটের ভেতরের অঙ্গগুলোর আশপাশেও চর্বি জমতে পারে। এভাবেই তৈরি হয় ফ্যাটি লিভার রোগের ঝুঁকি।

ভুঁড়ি বাড়া অনেক সময় শুধু বাহ্যিক পরিবর্তন মনে হলেও এর পেছনে থাকে ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে চর্বি জমার বিষয়টি। এই ধরনের চর্বি ভবিষ্যতে আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি রোগের আশঙ্কা
অতিরিক্ত ওজন এবং রক্তনালির প্রাচীরে চর্বি জমা দুটিই দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগের পথ তৈরি করে। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের পেছনে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বড় ভূমিকা রাখে।

রক্তনালির ভেতরে চর্বি জমতে জমতে তা সংকুচিত হলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। একইভাবে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে স্ট্রোকের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। অর্থাৎ এক মাসের অবহেলা হয়তো সঙ্গে সঙ্গে বড় অসুখ তৈরি করবে না, কিন্তু শরীরে এমন পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক হতে পারে।
করণীয়
ইফতারে বেগুনি, পেঁয়াজু বা অন্য ভাজাপোড়া একেবারে নিষিদ্ধ এমন নয়। তবে প্রতিদিন বড় পরিমাণে খাওয়ার বদলে সপ্তাহে এক-দুদিন সীমিত পরিমাণে রাখাই ভালো। বরং ইফতারের প্লেটে রাখুন চিড়া বা হালকা শর্করাযুক্ত খাবার, টক দই, তাজা ফল, সবজির সালাদ, পর্যাপ্ত পানি বা লেবু-পানি। এগুলো শরীরে শক্তি জোগাবে, পানির ঘাটতি পূরণ করবে এবং হজমেও সহায়ক হবে।

ভাজাপোড়া খাবার স্বাদে অনন্য এ নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু টানা এক মাস প্রতিদিন এ ধরনের খাবার খেলে শরীরের ভেতরে শুরু হতে পারে নানামুখী পরিবর্তন। সাময়িক তৃপ্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি ডেকে আনা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সংযমই হতে পারে সুস্থ রমজানের চাবিকাঠি। একটু সচেতন সিদ্ধান্তই আপনাকে রাখতে পারে ফিট, সতেজ ও সুস্থ।
তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এ.কে.এম. যোবায়ের
জেএস/