বেলায়েত হোসেনের কবিতা
চাঁদের বেদনা এবং অন্যান্য
ফাইল ছবি
চাঁদের বেদনা
অমাবস্যার পেট ছিঁড়ে লোকালয় হাসাবে বলেই পথ চেয়ে থাকা
বেদনাসিক্ত ধমনী, শিরা-উপশিরায় ক্ষণিক স্বস্তি কিংবা ফাঁকা
ক’টা দিনের—বলে দীপ্ত প্রহসন আড়ালে উঁকি দেয়
ভয় দেখিয়ে লাভ কি বলো—বসত যার দেনায়।
****
সুষম আদর
জন্মের আগে একবার পেয়েছিলাম
অজান্তে অনিচ্ছায় প্রাচুর্যের ডোর
সোনামাখা তৃষ্ণায় অধর
সেই নেশা আজও কাটেনি
নির্বাক প্রণয়ে সব আয়োজন
উন্মাদ প্রমত্তা ঘোর
সেই থেকে কোনো আদরই
আমাকে আড়ষ্ট করেনি
রৌদ্র কিংবা জোছনা স্নান
অপ্রকৃত ঠোঁট কিংবা ললাট
করতে পারেনি কিঞ্চিৎ লোভাতুর
আমায় পূর্ণ পৃথিবীর সব কোলাহল
অযতনের প্রতিটি করুণ স্পর্শ
ভেলকিবাজি চাতুর
অপেক্ষায় আছি, নিয়ে পৃথিবীর সব অনাদর
পেরিয়ে অযাচিত সব প্রহর
হোক-না অস্তমিত পৃথিবী হেলিয়ে পড়ার পর
একরাশ আদর...
সুষম আদর।
****
তন্দ্রাবিহীন স্বপ্নলোক অন্তিম শয্যায়
জলকণার মালা গেঁথে অপেক্ষায়
অথচ
গোচরে—অগোচরে
সকল আয়োজন, রূপ প্লাবন
ফুরিয়ে যায় পৃথিবীর তরে
সোনালি অন্তিম শয্যায়।
তন্দ্রাবিহীন স্বপ্নলোক
চলে যায় আজীবন তন্দ্রায়
কংকাল দেহসার আর শব্দসুর ছুঁয়ে
অপলক চেয়ে থাকে যেখানে
অভিজ্ঞান হেসে ওঠে বেসুরা স্বরে।
বিধ্বস্ত নিলীমা, বিষণ্ন নিমগ্ন প্রহর,
আর ঝরে পড়া পরাগরেণু মজেছে শেষ আড্ডায়
নীল পাখার প্রজাপতি পথ হারিয়ে অমোঘ অমাবস্যায়
ক্লান্ত সে পথ থেমে যায় এক ইশারায়
অজানা যে পথ, পৃথিবীর পথ ভুলে যায়
আপন ঠিকানায় একা একা...
****
শূন্য চরাচর
শুনেছি অনেকে টাকা জমাচ্ছে
মানে অগণিত, অজস্রজন;
এ খবরে ছেয়ে গেছে দিক থেকে দিগন্ত
পত্রিকার পাতায় পোস্টার সেঁটেছে অলিতে-গলিতে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সুইস ব্যাংক
সর্বত্র তুচ্ছে নেমেছে টার্গেট
এবার ইনসেন্টিভ হয়েছে কয়েকগুণ
মুখে হাসি আর চোখে সহস্র অজানা প্রশ্নে বিভোর
টাকা জমাচ্ছে সবাই,
নিয়মিত প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে শুধু টাকা জমাচ্ছে।
টাকা জমাচ্ছে সময় কিনবে বলে
ব্যস্ততায় বিভোর প্রিয় চোখ, ব্যস্ত চাহনি
আরও ব্যস্ত কোমল ঠোঁটের একদা তুমুল কাঁপন
টাকা জমাচ্ছে প্রথম দেখা মনহরিণীর কামনাসিক্ত চাহনির জন্য,
টাকা জমাচ্ছে প্রিয়র ব্যস্ততাকে পরাজিত করতে
সময় কিনবে বলে,
আর টাকা জমাচ্ছে ব্যস্ত পৃথিবীকে তুচ্ছ করে
প্রথম দেখার নিঃস্বার্থ শব্দস্বরের কোমলতায় ফেরার জন্য
আরও তথাকথিত সুশীল সমাজে রটে যাওয়া কিছু অযাচিত শব্দ শোনার জন্য,
টাকা জমাচ্ছে লাল সবুজের অম্বর শোভিত পতাকায় খচিত
শহীদের বজ্র প্রতিধ্বনি আর সোনার বাংলার সমস্বরে গান শুনতে।
আর আমার?
আমার তো টাকা নেই
নেই কোন ব্যাংক-ব্যালেন্স
ডাক্তার জানালো চোখগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে
আর যাই বলুক এটা নিশ্চিত যে শুকনো পাতার মত তো নয়,
ভাববেন না যে টাকা নেই বলে আমি শূন্য চরাচর
আমার আছে অক্ষত সাত সাগর তেরো নদীর জল।
এক বিস্তৃত গোধূলি কানে ফিসফিসে বললো
সাগরের বুকে ভেসে থাকা অস্তমিত সূর্যের চোখ জুড়ানো
সব রং লুটপাট করে নিয়ে ধন্য করো,
চোখ তুলে চাইতেই আলো-আঁধারির মেলায় হারিয়ে যায় সব কোমল স্বর।
তবুও আমি জমাচ্ছি নীলিমার সব নীল
বিশাল আকাশের কালোমেঘ
ঝরে পড়া নক্ষত্রসমগ্র
তিমির গগণের অসমাপ্ত প্রহর,
জমাচ্ছি ঝড়ের রাতে অগণিত ভরা পূর্ণিমার ফাঁসির দৃশ্য,
আরও জমাচ্ছি থুবড়ে পড়া বিনাশী ঢেউ
সমুদ্র ব্যাকুলতার গর্জন
মনে হতে পারে এ তো সামান্যই অর্জন!
যারা পারেনি কিনতে সময়
তাদেরই একজন আমি
সময় হলে কখনো বিপরীত মেরুতে যদি পড়ে অবিনাশী চোখ
তব দৃষ্টি নিও নীল কুয়াশার মিশে যাওয়া শিশির বিন্দুর তরে
নিমগ্ন স্বপ্নচাষিরা যুগে যুগে মিশেছে যেথায়।
এসইউ