ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. জাতীয়

গণপরিবহনে জ্বালানি সংকট 

‘আয় বন্ধ থাকলেও খরচ থেমে নেই, দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না’

মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল | প্রকাশিত: ০৪:৩৭ পিএম, ১০ এপ্রিল ২০২৬

রাজধানীর আজিমপুর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা (শিববাড়ি) রুটে চলাচলকারী ‘ভিআইপি’ বাসের চালক মোহাম্মদ মামুন। গাড়ি চালিয়ে যা আয় করেন তা দিয়েই চলে তার সংসার। কিছু দিন আগেও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খেয়ে পরে সুখেই ছিলেন তিনি। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি মামুনের সেই জীবন বদলে দিয়েছে। জ্বালানি সংকটে বাস চালাতে পারছেন না তিনি। এতে আয় বন্ধ হওয়ায় পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

জ্বালানি সংকটের কারণে রাজধানীর সড়কে গণপরিবহনের চাকা যেন ধীরে ধীরে থমকে যাচ্ছে। চাহিদামতো জ্বালানি না পাওয়ায় বাস চালাতে পারছেন না চালকরা। ফলে আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে হাজারো পরিবহন শ্রমিকের দিন কাটছে অনিশ্চতায়।

জ্বালানি সংকটের কারণে রাজধানীর সড়কে গণপরিবহনের চাকা যেন ধীরে ধীরে থমকে যাচ্ছে। চাহিদামতো জ্বালানি না পাওয়ায় বাস চালাতে পারছেন না চালকরা। ফলে আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে হাজারো পরিবহন শ্রমিকের দিন কাটছে অনিশ্চতায়।

শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সকালে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ‘ভিআইপি’ বাসের চালক মোহাম্মদ মামুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ডিজেলের অভাবে গত তিন দিন ধরে বাস চালাতে পারছি না। প্রতিদিন অন্তত ৬০ লিটার ডিজেল লাগে। বিভিন্ন পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজনীয় তেল পাওয়া যাচ্ছে না। বলতে গেলে আয়-রোজগার একপ্রকার বন্ধ। এখন অবস্থা এমন—দুই টাকা আয় করলে তিন টাকা খরচ হয়ে যায়।’

jagonews24.comজ্বালানি সরবরাহ না থাকায় বন্ধ রাখা হয়েছে পাম্প/ছবি: জাগো নিউজ

‘আয় বন্ধ থাকলেও বাসা ভাড়া, বাজার-সদাই, সন্তানদের পড়াশোনাসহ কোনো খরচই থেমে নেই। দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না।’—বলছিলেন মামুন।

নীলক্ষেতে থেমে থাকা বাসের সারি
সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর নীলক্ষেত মোড়ে গিয়ে দেখা যায় এক ব্যতিক্রমধর্মী দৃশ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে নিউমার্কেটমুখী সড়কের আইল্যান্ড ঘেঁষে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে গোলাপি রঙের ‘ভিআইপি’ বাস।

‘আয় বন্ধ থাকলেও বাসা ভাড়া, বাজার-সদাই, সন্তানদের পড়াশোনাসহ কোনো খরচই থেমে নেই। দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না।’—বাসচালক মামুন

প্রথমে মনে হতে পারে, পাশের পেট্রোল পাম্প থেকে তেল নেওয়ার অপেক্ষায় বাসগুলো রাখা হয়েছে। কিন্তু পাম্পটি বন্ধ দেখে ভিন্ন বাস্তবতা সামনে আসে। বাসগুলোর দরজা বন্ধ, ভেতরে নেই কোনো চালক বা হেলপার।

আরও পড়ুন
জ্বালানি সংকটে ঢাকার সড়কে কমেছে গণপরিবহন, নাগরিক ভোগান্তি চরমে
তেল নিতে একাধিক পাম্পে ঘুরছে দূরপাল্লার বাস, কমেছে যাত্রাসংখ্যা
গণপরিবহনে পর্যাপ্ত জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে, বাড়তি ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট, দেশে দেশে নানা পদক্ষেপ
পথে পথে তেল নিয়ে গন্তব্যে যাচ্ছে দূরপাল্লার বাস

পরে পাম্পের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, একটি বেঞ্চে বসে কয়েকজন চালক ও হেলপার আড্ডা দিচ্ছেন। পাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা জানান, তারা সবাই ভিআইপি বাসের চালক ও হেলপার। জ্বালানি তেলের জন্য গত রাত থেকেই সিরিয়ালে আছেন। কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের কাছে কোনো মজুত নেই। বিকেল বা আগামীকাল সরবরাহ এলে তারা তেল পাবেন।

jagonews24.comপর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছে না দূরপাল্লার বাস/ছবি: জাগো নিউজ

পাম্পে পাম্পে তেলের সংকট
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ পেট্রোল পাম্পেই জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। কোথাও তেল নেই, আবার কোথাও সীমিত পরিমাণে সরবরাহ থাকায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে যানবাহনগুলোকে।

বাস, মাইক্রোবাস, কাভার্ড ভ্যান, প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল—সব ধরনের যানবাহনের ভিড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেকেই তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

চালকদের ক্ষোভ ও হতাশা
নীলক্ষেতের একটি পাম্পে অপেক্ষমাণ আরেক বাসচালক সেলিম মিয়া বলেন, ‘গত রাত থেকেই লাইনে আছি। পরশু এক ট্রিপ দেওয়ার পর তেল শেষ হয়ে গেছে। এরপর অনেক পাম্পে ঘুরেও তেল পাইনি, উল্টো রিজার্ভে যা ছিল তাও শেষ হয়ে গেছে।’

‘গত রাত থেকেই লাইনে আছি। পরশু এক ট্রিপ দেওয়ার পর তেল শেষ হয়ে গেছে। এরপর অনেক পাম্পে ঘুরেও তেল পাইনি, উল্টো রিজার্ভে যা ছিল তাও শেষ হয়ে গেছে।’—বাসচালক সেলিম মিয়া

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সবাই তো ড্রাইভার-হেলপারের ওপর নির্ভর করে, কিন্তু আমাদের দেখার কেউ নেই। শুধু আমাদের ওপরই চাপ পড়ে।

আরও পড়ুন
১৫০০ থেকে ৩০০ টাকায় নেমেছে মোটরসাইকেল চালকদের আয়
জ্বালানি তেলের সংকট: ছোট যাত্রায় কী ধরনের গাড়ি-বাইক ব্যবহার করবেন
সাতক্ষীরায় ডিজেল সংকটে বিপাকে চালকরা
জ্বালানি সংকটে আয়-রোজগারে টান, বিপাকে রাইড শেয়ারিং চালকরা
পাম্পে থাকছেন না ‘ট্যাগ অফিসার’, তেল বিতরণে সেই বিশৃঙ্খলা

একাধিক চালক জানান, তারা ঢাকা-গাজীপুর রুটে বাস চালালেও বর্তমানে গাজীপুরের পাম্পগুলো তাদের তেল দিতে অনীহা দেখাচ্ছে। তারা (পেট্রোল পাম্পের লোকজন) বলে, ‘আপনারা সবসময় ঢাকায় তেল নেন, এখনো সেখান থেকেই নিন।’

যাত্রীদের মধ্যে বাড়ছে অসহিষ্ণুতা
জ্বালানি সংকটের কারণে মাঝপথে বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। এতে যাত্রীদের সঙ্গে চালক ও সহকারীদের অহরহ বাকবিতণ্ডার ঘটনা ঘটছে।

.jagonews24.comপাম্পে তেল নিতে দীর্ঘ লাইন কমছে না/ছবি: জাগো নিউজ

চালকদের ভাষ্য, রাস্তায় তেল শেষ হয়ে গেলে কোনো পাম্পে গিয়ে লাইনে দাঁড়ালেই যাত্রীরা গালিগালাজ শুরু করে। সব মিলিয়ে খুব কষ্টে আছেন তারা।

নগরজীবনে বাড়ছে চাপ
জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাজধানীর জনজীবনে। সড়কে গণপরিবহন কমে যাওয়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ছে, কর্মস্থলে পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে, আর পরিবহন শ্রমিকরা পড়ছেন চরম আর্থিক সংকটে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে এই সংকট আরও গভীর হয়ে নগরজীবনে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।

এমইউ/এমএমকে