ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

নারী প্রার্থী এত কম কেন?

চিররঞ্জন সরকার | প্রকাশিত: ০৩:৫৩ পিএম, ২২ জানুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশ কি সামনে এগোচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে পেছনের দিকে সরে যাচ্ছে—এই প্রশ্নটি আজ আর শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা জিডিপির পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করার মতো সরল প্রশ্ন নয়। একটি দেশের অগ্রগতি পরিমাপ করতে গেলে সামাজিক অগ্রগতির সূচক, বিশেষ করে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সমতা ও প্রতিনিধিত্ব কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই বিবেচনায় দাঁড়িয়ে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে তাকালে উদ্বেগ এড়ানো কঠিন। কারণ এই নির্বাচন নারীদের রাজনৈতিক উপস্থিতির দিক থেকে বাংলাদেশকে এক ধরনের পশ্চাদমুখী বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে।

এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক দলের মধ্যে অন্তত ৩০টি দল কোনো নারী প্রার্থীই মনোনয়ন দেয়নি। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর মতো বড় ও সংগঠিত দলও রয়েছে। সামগ্রিকভাবে নারী প্রার্থীর হার আনুপাতিক হিসেবে মাত্র চার শতাংশের কাছাকাছি। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, যেখানে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী এবং ভোটার তালিকাতেও নারীর সংখ্যা প্রায় সমান, সেখানে নির্বাচনে নারী প্রার্থীর এমন নগণ্য উপস্থিতি কেবল একটি পরিসংখ্যানগত ব্যর্থতা নয়—এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন।

আইনগত দিক থেকে দেখলে, রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের শর্ত অনুযায়ী দলীয় কমিটিগুলোতে নির্দিষ্ট হারে নারী প্রতিনিধিত্ব থাকার কথা বলা আছে—বর্তমানে যা ৩০ শতাংশ। কিন্তু সংসদ নির্বাচনে কত শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে, সে বিষয়ে আইন স্পষ্ট নয়। এই ফাঁকটুকুই ব্যবহার করছে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল। অনেকে বলছেন, আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় দলগুলো নারী মনোনয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজনীতির মূল কাজই তো আইন ও নীতির পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম করা। যে দলগুলো ক্ষমতায় গেলে সংবিধান সংশোধন, আইন সংস্কার, রাষ্ট্রীয় কাঠামো বদলানোর দাবি করে, তাদের জন্য ন্যূনতম নৈতিক দায়বদ্ধতাও কি কোনো বিষয় নয়?

আইন না থাকলেই কি রাজনৈতিক সদিচ্ছার মৃত্যু ঘটে? আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলেও রাজনৈতিক দল চাইলে নিজেদের ভেতর থেকেই একটি অগ্রসর মানসিকতা দেখাতে পারত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নারী প্রার্থী প্রদানের ক্ষেত্রে দলগুলোর উদাসীনতা প্রায় সর্বব্যাপী। এই প্রবণতা শুধু তাৎক্ষণিক নয়, দীর্ঘমেয়াদে এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। গণতন্ত্র কেবল ভোটের দিন ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ কোনো প্রক্রিয়া নয়; এটি প্রতিনিধিত্ব, অংশগ্রহণ এবং অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন। সমাজ যদি নারী ও পুরুষ—এই দুই চাকার সাইকেলের মতো হয়, তাহলে একটি চাকা বাদ দিয়ে যে সাইকেল চলে, সেটি সার্কাসের খেলনা ছাড়া আর কিছু নয়।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এবারের সংসদীয় নির্বাচনে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে ন্যূনতম পাঁচ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে এবং ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে তা ৩৩ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এই সুপারিশ ছিল একটি ন্যূনতম রোডম্যাপ। কিন্তু বাস্তবে সেটিও মানা হয়নি। বড় দল বিএনপি তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও, সংখ্যার হিসাবে তারা নারী প্রার্থী দিয়েছে মাত্র ১০ জন। শতাংশের হিসাবে সেটিও অত্যন্ত কম। দ্বিতীয় স্থানে থাকা নতুন নিবন্ধিত দল বাসদ (মার্কসবাদী) নয়জন নারী প্রার্থী দিয়েছে এবং একমাত্র এই দলই তাদের মোট প্রার্থীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী মনোনয়ন দিয়ে একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ তৈরি করেছে। কিন্তু একটি বা দুটি ব্যতিক্রম সামগ্রিক প্রবণতাকে ঢেকে রাখতে পারে না।

এর পেছনের কারণগুলো নতুন কিছু নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরের ক্ষমতার কাঠামো এখনো পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত। মনোনয়ন বাণিজ্য, নির্বাচনী ব্যয়ের চাপ, সহিংস রাজনীতির আশঙ্কা—সব মিলিয়ে রাজনীতি নারীদের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রতিকূল ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পারিবারিক চাপ ও সামাজিক বাস্তবতা। অনেক নারীই মনে করেন, শুধু ব্যক্তিগত সক্ষমতা বা জনপ্রিয়তা থাকলেই যথেষ্ট নয়; পুরো রাজনৈতিক পরিবেশটাই তাদের বিরুদ্ধে কাজ করে।

এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো, যেসব নারী মনোনয়ন পেয়েছেন, তাদের একটি বড় অংশই কোনো না কোনো পুরুষ নেতার স্ত্রী, আত্মীয় বা পারিবারিক পরিচয়ের সূত্রে সামনে এসেছেন। মাঠপর্যায়ের ত্যাগী, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মী নারী এখানে খুব কমই জায়গা পেয়েছেন। অর্থাৎ নারীর প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও পুরুষতান্ত্রিক উত্তরাধিকার ও পৃষ্ঠপোষকতার ধারা বজায় রাখা হয়েছে। এটি নারীর ক্ষমতায়নের বদলে নারীর ব্যবহারের রাজনীতি।

নারীকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার অনিবার্য ফল হলো—তাকে ধীরে ধীরে শিক্ষা, অর্থনীতি ও প্রশাসনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও অযোগ্য প্রমাণ করার চেষ্টা। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এসব নিয়ে সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে শক্তভাবে প্রশ্ন করার হিম্মত রাখে? নাকি রাজনীতি থেকে নারীদের সরিয়ে দেওয়ার পরের ধাপেই বলা হবে—শিক্ষা ও চাকরির পরিসর থেকেও তাদের সরানো হোক? নারী মনোনয়ন না দেওয়া কি তবে কোনো বড় রাজনৈতিক প্রকল্পের ‘টপ-অব-দ্য-আইসবার্গ’? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে—বাংলাদেশ সত্যিই সামনে এগোচ্ছে, নাকি নিঃশব্দে পেছনে ফিরে যাচ্ছে!

সবচেয়ে হতাশার ব্যাপার হলো, ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর স্লোগানসমৃদ্ধ গত দেড় বছরে বাংলাদেশে নারী বিদ্বেষী বক্তব্য, প্রতীকী অবমাননা ও প্রকাশ্য গালাগালির ঘটনা আগের চেয়ে আরও বেড়েছে। বেগম রোকেয়ার ছবিকে অবমাননা করা হয়েছে, নারী সংস্কার কমিশনকে প্রকাশ্যে গালাগাল দিয়েছে বেশ কয়েকটি ধর্মীয় দল। এসব ঘটনায় উল্লেখযোগ্য কোনো রাজনৈতিক দল শক্ত অবস্থান নেয়নি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নারী সংস্কার কমিশনকে আক্রমণের সময় অন্য দলগুলোর নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। এই নীরবতা বা সহাবস্থান নারী বিদ্বেষের পরিবেশকে আরও বৈধতা দিয়েছে।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত দেড় বছরে প্রধান উপদেষ্টা যখন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংস্কার বা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বৈঠক করেছেন, সেসব বৈঠকে নারীদের কার্যত অনুপস্থিত রাখা হয়েছে। যত ছবি ও দৃশ্য জনসমক্ষে এসেছে, তার প্রায় সবই নারীহীন। নারী বিষয়ক সিদ্ধান্তেও নারী নেই—এই বাস্তবতা কেবল অবহেলার নয়, এটি একটি শক্তিশালী বার্তা ছড়িয়ে দেয় যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীরা অপ্রয়োজনীয়। এই বার্তাই সমাজে নারী বিদ্বেষকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক এবং ভোটারের অর্ধেক নারী। এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কোনো দেশকে এগিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব। বিশ্লেষকরা বলছেন, নারী প্রার্থী কমে যাওয়া মানে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কাঠামোগত দুর্বলতা আরও গভীর হওয়া। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীরা না থাকলে নীতি প্রণয়নেও তার প্রভাব পড়বে। নারী ও শিশু বিষয়ক নীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সমতার প্রশ্নগুলো সংসদে আরও দুর্বল কণ্ঠে উপস্থাপিত হবে।

এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের নারীরা আগ্রহ হারাতে পারেন। রাজনীতি যদি তাদের চোখে ক্রমাগত শত্রুভাবাপন্ন ও অপ্রবেশযোগ্য হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে। অনেক দলই এবারের নির্বাচনে বহু আসনে প্রার্থী দিলেও তাদের তালিকায় কোনো নারী নেই। রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে এটি কি ভূমিকম্পতুল্য নয়? দেশের জনসংখ্যার অর্ধেককে এভাবে পদ্ধতিগতভাবে ‘নাই-করে-দেয়া’র চেষ্টা এই যুগে একদিকে বিস্ময়কর, অন্যদিকে গভীর বার্তাবহ।

এই সিদ্ধান্তগুলো ইতিহাস, সমাজ ও অর্থনীতির আলোকে বিচার করলে প্রশ্নের পর প্রশ্ন উঠে আসে। জুলাই অভ্যুত্থানের আলোকে এই বাস্তবতাকে কীভাবে মূল্যায়ন করা যায়? জুলাইয়ের অকুতোভয় নারীযোদ্ধারা—যারা রাস্তায় নেমে, ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করেছেন—তারা কীভাবে দেখছেন এই সিদ্ধান্ত? তাদের বাইরে শিক্ষিত-নিরক্ষর নির্বিশেষে কোটি কোটি নারী এই পরিস্থিতিকে কীভাবে নেবেন? এটিকে কি তাদের বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব পাল্টা-অভ্যুত্থান হিসেবে দেখা হবে?

এই দেশের পরিবারে নারীদের চিরকালীন পরিশ্রমী ভূমিকা, জাতীয় অর্থনীতিতে নারীদের বিপুল অবদান, মুক্তিযুদ্ধ ও নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ঐতিহাসিক অংশগ্রহণের আলোকে রাজনৈতিক দলগুলোর এই সিদ্ধান্তকে কি দেশের অর্ধেক মানুষের প্রতি স্পষ্ট অবজ্ঞা বলা যায় না? পোশাক শিল্প থেকে কৃষিখাত—যেখানে নারীদের শ্রমে অর্থনীতি চলে; আবার সংকটের সময় যখন মধ্যরাতে নারীদের ঘর থেকে বেরিয়ে আসার ডাক দেওয়া হয়—তখন সেই নারীদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জায়গা থেকে সরিয়ে রাখা কি নিছক কাকতাল?

জাতীয় পর্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা ও প্রতিবাদের ঘাটতি দেখেও মনে হয়, বাংলাদেশ মুখে মুখে যতই একাত্তর, নব্বই বা ‘৩৬ জুলাই’-এর কথা বলুক, বাস্তবে নারীদের রাজনৈতিকভাবে কোনঠাসা ও অবদমিত করে রাখাই প্রভাবশালী একাংশের অঘোষিত নীতি। কিছু রাজনৈতিক দলের প্রার্থী তালিকায় তারই কাঠামোগত প্রকাশ দেখা যাচ্ছে।

নারীকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার অনিবার্য ফল হলো—তাকে ধীরে ধীরে শিক্ষা, অর্থনীতি ও প্রশাসনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও অযোগ্য প্রমাণ করার চেষ্টা। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এসব নিয়ে সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে শক্তভাবে প্রশ্ন করার হিম্মত রাখে? নাকি রাজনীতি থেকে নারীদের সরিয়ে দেওয়ার পরের ধাপেই বলা হবে—শিক্ষা ও চাকরির পরিসর থেকেও তাদের সরানো হোক? নারী মনোনয়ন না দেওয়া কি তবে কোনো বড় রাজনৈতিক প্রকল্পের ‘টপ-অব-দ্য-আইসবার্গ’? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে—বাংলাদেশ সত্যিই সামনে এগোচ্ছে, নাকি নিঃশব্দে পেছনে ফিরে যাচ্ছে!

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট।

এইচআর/জেআইএম