ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: 'লাথিটা এসে লাগছে আমাদের পেটে'

চিররঞ্জন সরকার | প্রকাশিত: ০৯:৫১ এএম, ১১ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সরাসরি সংঘাত কেবল ওই অঞ্চলের মানচিত্রকে রক্তাক্ত করছে না, বরং তা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে তছনছ করে দিচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ চেইন ছিঁড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। গত এক সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক আকার নিয়েছে; আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দ্রুত বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৫ ডলার অতিক্রম করেছে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। ভূ-রাজনীতির এই দাবানল থেকে হাজার মাইল দূরে অবস্থিত হলেও এর উত্তাপ আজ বাংলাদেশের প্রতিটি কৃষকের ঘরের আঙিনায় পৌঁছে গেছে। এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় ঢেউ আছড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে বাংলাদেশের উপকূলে, ঠিক যখন আমাদের সামনে তপ্ত গ্রীষ্ম আর বোরো আবাদের ভরা মৌসুম। ঐতিহাসিকভাবেই দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা মানেই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের থালায় টান পড়া—আর এবারের পরিস্থিতি নির্দেশ করছে যে, ইরানে কোনো বড় আগ্রাসন মানে সরাসরি আমাদের ‘পেটে লাথি’।

বাংলাদেশের কৃষি ক্যালেন্ডারে রবি মৌসুম (অক্টোবর-মার্চ) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রতি বছর দেশে প্রায় ৮০ থেকে ৮২ লাখ হেক্টর জমিতে রবি শস্য আবাদ হয়, যার সিংহভাগই দখল করে আছে বোরো ধান (প্রায় ৪৮-৫০ লাখ হেক্টর)। আমাদের বার্ষিক চাল উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি আসে এই বোরো থেকে। ফলে বোরো আবাদে সামান্যতম বিঘ্ন ঘটা মানেই দেশে দুর্ভিক্ষ সদৃশ পরিস্থিতি তৈরি হওয়া। এই বিপুল পরিমাণ জমিতে ফসল ফলাতে সেচই হলো মূল প্রাণভোমরা। কিন্তু এই সেচ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে জ্বালানি নির্ভর।

পরিসংখ্যান বলছে, বোরো ও রবি শস্যের সেচ কাজে দেশে প্রায় ১৬ লাখের বেশি সেচ পাম্প ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে প্রায় ১২ লাখ পাম্প চলে ডিজেলে এবং বাকি ৪ লাখের বেশি চলে বিদ্যুতে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য রবি মৌসুমে অতিরিক্ত ২৪০০ থেকে ২৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি বছরে কৃষিখাতে যে ৪৬ লাখ টন ডিজেল লাগে, তার সিংহভাগই খরচ হয় এই কয়েক মাসে। ফলে জ্বালানির অভাব মানেই হলো পাম্প স্তব্ধ হওয়া, আর পাম্প স্তব্ধ হওয়া মানেই হলো মাঠের সোনালী স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া।

এই সপ্তাহে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ১১৫ ডলার ছাড়িয়েছে, যা মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও ৮৯ ডলারের আশপাশে ছিল। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ে দাম প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি ইরান-ইসরায়েল সংঘাত আরও বিস্তৃত হয় বা হরমুজ প্রণালীতে চলাচল বড় আকারে ব্যাহত হয়, তবে তেলের দাম ১২০ ডলার বা তারও ওপরে পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি এখন খাদের কিনারায়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ডিজেলের মজুত আছে মাত্র ১৪ দিন বা দুই সপ্তাহের। অথচ এখন বোরো মৌসুমের ভরা সেচকাল; প্রতিদিনের চাহিদা প্রায় ১৪ হাজার টন।

এই সংকটের প্রতিফলন ইতোমধ্যেই রাজধানী ঢাকার রাস্তায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক পাম্পে একবারে ১৫০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না, যাতে সীমিত মজুত দিয়ে যতদিন সম্ভব পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়। কোথাও কোথাও সরবরাহ শেষ হয়ে যাওয়ায় পাম্প অস্থায়ীভাবে বন্ধও রাখতে হচ্ছে। এই দৃশ্য বাংলাদেশের জন্য অস্বাভাবিক এবং উদ্বেগজনক—কারণ এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বৈশ্বিক সংকট ইতোমধ্যেই দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে শুরু করেছে।

এই সংকটের মুহূর্তে বিপিসি ইতোমধ্যে তেল সাশ্রয়ে পাম্পগুলোতে রেশন বা সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। গাড়িপ্রতি তেলের পরিমাণ সীমিত করা হয়েছে যাতে মজুত দিয়ে অন্তত চলতি মাস পার করা যায়। কিন্তু কৃষকের পাম্পে যদি রেশন দেওয়া হয়, তবে ধান শুকিয়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় যদি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে নতুন জাহাজ বন্দরে না ভেড়ে, তবে আমাদের সেচ পাম্পগুলো স্তব্ধ হয়ে যাবে। আর সেচ বন্ধ হওয়া মানেই হলো কোটি কোটি কৃষকের স্বপ্ন আর দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অপমৃত্যু।

জ্বালানি তেলের পাশাপাশি আরেকটি বড় ক্ষত তৈরি হয়েছে গ্যাস সংকটে। আমাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সার কারখানাগুলো মূলত প্রাকৃতিক গ্যাস নির্ভর। হরমুজ প্রণালী দিয়ে কাতারের এলএনজি (LNG) সরবরাহ ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়ায় বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। জানুয়ারি মাসে যে এলএনজি ১০ ডলারে কেনা হয়েছিল, মার্চে এসে তা ২৩ থেকে ২৮ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে এই দাম আরও বাড়তে পারে।

এই উচ্চমূল্যের গ্যাসের অভাবে দেশে ইউরিয়া সার উৎপাদন কার্যত বন্ধ। দেশের ৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানার মধ্যে ৪টিই (ঘোড়াশাল-পলাশ, চিটাগাং ইউরিয়া, যমুনা ও আশুগঞ্জ) বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি কাফকো-ও উৎপাদন স্থগিত রেখেছে। বর্তমানে কেবল শাহজালাল সার কারখানাটি সীমিত আকারে চলছে। বোরো চাষের জন্য যখন দেশে প্রায় ২০-৩০ লাখ টন ইউরিয়া সারের প্রয়োজন, তখন এই উৎপাদন বন্ধ হওয়া দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত। বিদেশ থেকে সার আমদানির খরচ এখন চারগুণ বেড়ে গেছে, যা সরকারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কৃষি ও সার সবসময়ই রাজনীতির স্পর্শকাতর বিষয়। ৯০-এর দশকে সারের দাবিতে কৃষকদের ওপর গুলির সেই রক্তাক্ত স্মৃতি আজও এদেশের মানুষের মনে দাগ কেটে আছে। কৃষিতে ভর্তুকি দেওয়া বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের কৃষি নীতি ছিল আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশনের ঊর্ধ্বে। গত অর্থবছরগুলোতেও কৃষিখাতে সারে ভর্তুকি দিতে হয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ২৮ হাজার কোটি টাকা।

বর্তমানে দেশে এক ধরনের রাজনৈতিক ক্রান্তিকাল চলছে। 'নয়া বিএনপি' বা বর্তমান রাজনৈতিক শক্তির কৃষি নীতি কেমন হবে এবং তারা এই বৈশ্বিক সংকট কীভাবে সামাল দেবে, তা এই বোরো মৌসুমেই স্পষ্ট হবে। যদি সারের বাজারে সিন্ডিকেট হয় বা ডিলার পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, তবে জনরোষ সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা প্রশ্নে বাংলাদেশের রাজনীতি খুব দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইতিহাস বলছে, ধান, সার বা জ্বালানির সংকট কখনোই শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা হয়ে থাকে না—এগুলো দ্রুত রাজনৈতিক সংকটে রূপ নেয়।

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাব কেবল কৃষি বা জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়বে মুদ্রাস্ফীতির ওপর। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, ট্রাক ও লরি ভাড়া বাড়বে, যার ফলে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। ইতোমধ্যেই পরিবহন খরচ বাড়ার আশঙ্কায় পাইকারি বাজারে কিছু পণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে উচ্চমূল্যে জ্বালানি ও সার আমদানি করতে গিয়ে ডলারের মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে, যা আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। গ্যাস সংকট তীব্র হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হবে, ফলে লোডশেডিং বাড়বে এবং শিল্প উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সংকট মোকাবিলায় সরকারকে এখনই কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির পথ খুঁজতে হবে। ডিজেল ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌরচালিত সেচ পাম্প দ্রুত বাড়াতে হবে। বিপিসির জ্বালানি মজুত সক্ষমতা বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সারের বাজারে কৃত্রিম সংকট রোধে কঠোর তদারকি চালাতে হবে এবং কৃষকদের স্বল্প সেচে হয় এমন বিকল্প ফসল চাষে উৎসাহিত করতে হবে।

তবে বাস্তবতা হলো—এই সংকট কেবল অর্থনীতি দিয়ে বোঝার বিষয় নয়; এটি ভূরাজনীতির নির্মম বাস্তবতারও প্রতিফলন। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, কিন্তু তার অভিঘাত আমাদের ঘরের ভেতরেই এসে পড়ে। উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনে বা পাইপলাইনের তেল ব্যবহার করে হলেও বোরো চাষিদের রক্ষা করা এই মুহূর্তের প্রধান কাজ। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা হারালে কোনো রাষ্ট্রের অর্থনীতি, রাজনীতি বা উন্নয়ন—কিছুই স্থিতিশীল থাকে না।

বৈশ্বিক অর্থনীতি আজ এতটাই আন্তঃনির্ভর যে এক অঞ্চলের সংঘাত অন্য অঞ্চলের খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে নড়বড়ে করে দিতে পারে। ইরানের ওপর কোনো বড় আক্রমণ বা হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার অর্থ হবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভাতের থালায় আঘাত। তাই এই অনিশ্চিত সময় মোকাবিলায় দূরদর্শী পরিকল্পনা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং কৃষি খাতের প্রতি বিশেষ মনোযোগ—এই তিনটিই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভরসা।

কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের শক্তি মাপা হয় তার কৃষকের হাসি দিয়ে। কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ—আর কৃষকের পেটে লাথি পড়লে ভেঙে পড়বে রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড।

এইচআর/এমএস