খাল খনন কর্মসূচি: গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি
আমাদের দেশকে নদীমাতৃক বলা হয় শুধু নদীর সংখ্যার জন্য নয়; বরং নদী, খাল, বিল ও জলপথের এক বিশাল জালিকাই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এখানে কৃষি, জনবসতি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি গড়ে তুলেছে। একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি জনপদই কোনো না কোনো খাল বা জলপথের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সেই খালগুলো ছিল কৃষির প্রাণ, যোগাযোগের মাধ্যম এবং প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবহেলা, ভরাট, দখল এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে দেশের অসংখ্য খাল হারিয়ে গেছে বা মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা, কমেছে সেচের সুযোগ, এবং অনেক ক্ষেত্রে কৃষি উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই আবার নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে খাল খনন বা পুনঃখনন কর্মসূচি। আগামী ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়া এলাকায় একটি খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই দিনে সারাদেশে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা হওয়ার কথা রয়েছে। পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি সম্প্রতি খালটি পরিদর্শনকালে বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আবারও এই কর্মসূচি শুরু করা হচ্ছে এবং এটি বাস্তবায়িত হলে জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হবে। বিশেষ করে খাল পুনঃখননের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা দূর হবে, সেচ সুবিধা বাড়বে এবং কৃষি উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশে খাল খনন কর্মসূচির একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গ্রামীণ উন্নয়নের অংশ হিসেবে খাল খননকে একটি আন্দোলনের রূপ দিয়েছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং দেশের অর্থনীতিকে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে নেওয়া।
সেই সময়ে অনেক এলাকায় খাল খননের ফলে কৃষিতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা হারিয়ে যায়। বহু খাল ভরাট হয়ে যায়, অনেক খাল দখলের শিকার হয়, আর অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো সরকারি নথিপত্র থেকেও প্রায় হারিয়ে যায়।
এই বাস্তবতার ফলে আজ বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পথ না থাকায় কৃষিজমি দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকে। এতে ফসল নষ্ট হয় এবং কৃষককে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় সেচের সংকট দেখা দেয়। অর্থাৎ একই এলাকায় কখনো অতিরিক্ত পানি, আবার কখনো পানির অভাব—এই দ্বৈত সংকটের মুখোমুখি হতে হয় কৃষকদের।
খাল পুনঃখনন এই সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। খালগুলো যদি সঠিকভাবে পুনরুদ্ধার করা যায়, তাহলে বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হবে এবং একই সঙ্গে সেই পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে সেচের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে।
তবে খাল খনন কর্মসূচির সফলতা কেবল খনন কাজের ওপর নির্ভর করে না; এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা। অতীতে অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, খাল খননের পর কয়েক বছরের মধ্যেই আবার তা ভরাট হয়ে গেছে বা দখল হয়ে পড়েছে। ফলে প্রকল্পের সুফল স্থায়ী হয়নি। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার খাল পুনরুদ্ধারকে একটি সমন্বিত জলব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় জলপ্রবাহের একটি স্বাভাবিক নেটওয়ার্ক রয়েছে। নদী থেকে খাল, খাল থেকে বিল বা নিম্নাঞ্চল—এই ধারাবাহিক প্রবাহের মাধ্যমে পানি চলাচল করে। যদি খালগুলোকে সেই প্রাকৃতিক প্রবাহের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করা যায়, তাহলে তা শুধু কৃষি নয়, পরিবেশের জন্যও অত্যন্ত উপকারী হবে।
খাল খনন কর্মসূচি যদি পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি শুধু জলাবদ্ধতা দূর করবে না; বরং কৃষি, পরিবেশ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন করে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে। বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া খালগুলো আবার যদি জীবন্ত হয়ে ওঠে, তবে সেগুলো শুধু পানির প্রবাহই নয়, বরং সূচনা করতে পারে দেশের সার্বিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত।
বিশ্বের অনেক দেশ উন্নত জলব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। নেদারল্যান্ডস তার অন্যতম উদাহরণ। সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে অবস্থান করেও দেশটি উন্নত খাল ও পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে। একইভাবে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডও খাল ও সেচব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে কৃষিকে শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশের জন্যও এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
খাল পুনঃখননের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা। খালগুলো শুধু পানি প্রবাহের পথ নয়; এগুলো একটি সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্রের অংশ। খালে পানি প্রবাহ থাকলে আশপাশের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও স্থিতিশীল থাকে, যা কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া খালগুলো বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি ধারণ করে বন্যার ক্ষতিও কমাতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার ক্ষেত্রেও এই ধরনের প্রাকৃতিক জলপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পানি প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেছেন, আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যদি এই পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের জলব্যবস্থাপনার ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। এর মাধ্যমে শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা নয়, বরং কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে ভবিষ্যতে খাদ্য রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
তবে এই কর্মসূচির সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করবে প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের ওপর। খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্পে যদি স্থানীয় কৃষক, জনপ্রতিনিধি এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সক্রিয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে প্রকল্পের প্রতি মানুষের মালিকানা তৈরি হবে এবং তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে। এতে কোন সন্দেহ নেই।
দিনাজপুরের সাহাপাড়া এলাকায় যে খাল পুনঃখননের মাধ্যমে এই কর্মসূচির সূচনা হতে যাচ্ছে, সেটি তাই কেবল একটি স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর জাতীয় উদ্যোগের প্রতীক। এই উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশের বহু অঞ্চলে কৃষি ও গ্রামীণ জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
বাংলাদেশ আজ এক নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে দেশের সামনে জটিল এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং টেকসই জলব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খাল খনন কর্মসূচি যদি পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি শুধু জলাবদ্ধতা দূর করবে না; বরং কৃষি, পরিবেশ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন করে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে। বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া খালগুলো আবার যদি জীবন্ত হয়ে ওঠে, তবে সেগুলো শুধু পানির প্রবাহই নয়, বরং সূচনা করতে পারে দেশের সার্বিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
[email protected]
এইচআর/এমএস