ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

কেন প্রত্যেক ব্যবসায়ীর ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট শেখা অপরিহার্য

সাইফুল হোসেন | প্রকাশিত: ১২:০৯ পিএম, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬

একজন দক্ষ নাবিক যেমন জানেন যে কম্পাস ছাড়া সমুদ্র পাড়ি দেওয়া অসম্ভব, তেমনি একজন উদ্যোক্তার জন্য আর্থিক ব্যবস্থাপনা বা ফিন্যান্স ম্যানেজমেন্ট ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করা আত্মঘাতী হওয়ার শামিল। বর্তমানের অস্থির এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘আইডিয়া’ বা সৃজনশীল পণ্যের গুরুত্ব থাকলেও, সেই আইডিয়াকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দেয় সঠিক অর্থের হিসাব। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অনেক মেধাবী উদ্যোক্তা অত্যন্ত আকর্ষণীয় পণ্য এবং বিশাল বাজার নিয়ে যাত্রা শুরু করেন, কিন্তু কয়েক বছর না যেতেই তাদের উদ্যোগটি দেউলিয়া হয়ে যায়। এর কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, তারা বিক্রয় বৃদ্ধিতে যতটা আগ্রহী ছিলেন, অর্থের সঠিক ব্যবস্থাপনায় ততটাই উদাসীন। ব্যবসা কেবল আবেগ বা কঠোর পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকে না; ব্যবসা টিকে থাকে সংখ্যার নিখুঁত বিন্যাস আর ভবিষ্যৎ আর্থিক পূর্বাভাসের ওপর।

বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'ফেলিউরারি' (Failory)-এর একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৯০ শতাংশ স্টার্টআপ বা ক্ষুদ্র ব্যবসা ব্যর্থ হয়, যার মধ্যে ৪২ শতাংশ ক্ষেত্রে কারণ হিসেবে দেখা যায় বাজারের সঠিক চাহিদা না থাকা এবং প্রায় ২৯ শতাংশ ক্ষেত্রে সরাসরি কারণ হলো ক্যাশ-ফ্লো বা নগদ অর্থের সঠিক প্রবাহ বজায় রাখতে না পারা। এই ২৯ শতাংশ উদ্যোক্তা হয়তো প্রযুক্তি বা বিপণনে দক্ষ ছিলেন, কিন্তু তারা জানতেন না কীভাবে পুঁজি রক্ষা করে মুনাফার চাকা সচল রাখতে হয়। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক মিহির দেশাই তার ‘দ্য উইজডম অব ফিন্যান্স’ বইয়ে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, ফিন্যান্স কেবল অংকের খেলা নয়, এটি হলো রিস্ক বা ঝুঁকি নেওয়ার একটি সুশৃঙ্খল দর্শন। একজন ব্যবসায়ী যদি তার বিনিয়োগের বিপরীতে রিটার্ন (ROI) এবং ব্রেক-ইভেন পয়েন্ট (Break-even Point) না বোঝেন, তবে তার প্রতিটি পদক্ষেপ হবে লটারি খেলার মতো অনিশ্চিত।

বড় বড় সফল উদ্যোক্তাদের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা আর্থিক শৃঙ্খলার ব্যাপারে কতটা কঠোর ছিলেন। আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস তার ব্যবসায়িক জীবনের শুরু থেকেই ‘ক্যাশ-ফ্লো’ এর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, নেট প্রফিট বা নিট মুনাফার চেয়েও জরুরি হলো হাতে কতটুকু ‘ফ্রি ক্যাশ ফ্লো’ আছে। কারণ মুনাফা অনেক সময় কেবল কাগজের হিসাব হতে পারে, কিন্তু নগদ অর্থই হলো ব্যবসার রক্ত। বেজোস যখন বড় বড় লোকসান করছিলেন, তখনও তিনি জানতেন তার প্রতিটি পয়সা কোথায় বিনিয়োগ হচ্ছে এবং তার নগদ অর্থের মজুত কত। এই যে দূরদর্শী আর্থিক পরিকল্পনা, এটিই আমাজনকে আজ এই উচ্চতায় নিয়ে এসেছে। আবার ওয়ারেন বাফেটের কথাই ধরা যাক, যাকে বলা হয় সর্বকালের সেরা বিনিয়োগকারী। বাফেটের মতে, "হিসাববিজ্ঞান হলো ব্যবসার ভাষা; আপনি যদি এই ভাষা না শেখেন, তবে আপনি অন্যের দয়ার ওপর বেঁচে থাকবেন।" অধিকাংশ উদ্যোক্তা তাদের অ্যাকাউন্টিংয়ের দায়িত্ব অন্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকেন, যা তাদের অজান্তেই বড় ধরণের আর্থিক ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।

ব্যবসা একটি ম্যারাথন দৌড়ের মতো, আর এই দৌড়ে সেই টিকে থাকে যার শ্বাস-প্রশ্বাস (ক্যাশ-ফ্লো) এবং শক্তির (ক্যাপিটাল) ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে। তাই প্রত্যেক ব্যবসায়ীর উচিত আজ থেকেই আর্থিক ব্যবস্থাপনার অলিগলিগুলো শেখা শুরু করা। মনে রাখতে হবে, বুদ্ধিমান উদ্যোক্তা কেবল সেটিই খোঁজেন যা লাভজনক, কিন্তু সফল উদ্যোক্তা সেই পথটিই খোঁজেন যেখানে প্রতিটি টাকার হিসাব পরিষ্কার। হিসাব যেখানে সুশৃঙ্খল, সফলতা সেখানে দীর্ঘস্থায়ী এবং অনিবার্য।

আর্থিক ব্যবস্থাপনা শেখার মানে এই নয় যে আপনাকে একজন পেশাদার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হতে হবে। বরং একজন ব্যবসায়ীকে বুঝতে হবে তার ব্যবসার ‘কস্ট স্ট্রাকচার’ বা ব্যয়ের কাঠামো কেমন। অনেক সময় দেখা যায়, বিক্রয় বাড়লেও নিট মুনাফা বাড়ছে না। এর কারণ হতে পারে লুকানো খরচ বা অপ্রয়োজনীয় পরিচালনা ব্যয়। একজন উদ্যোক্তা যখন ফিন্যান্স ম্যানেজমেন্ট জানেন, তখন তিনি খুব সহজেই বুঝতে পারেন কোন বিভাগটি লাভজনক আর কোথায় পুঁজি অপচয় হচ্ছে। টাটা গ্রুপের সাবেক চেয়ারম্যান রতন টাটা প্রায়ই একটি কথা বলেন যে, প্রতিটি চেক সই করার আগে ব্যবসায়ীর ভাবা উচিত সেই টাকাটি কেন খরচ হচ্ছে। অর্থের প্রতি এই শ্রদ্ধা এবং সচেতনতাই একটি ক্ষুদ্র দোকানকে বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত করতে পারে। পুঁজি সংগ্রহ করা কঠিন, কিন্তু সেই সংগৃহীত পুঁজিকে উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করা তার চেয়েও কঠিন কাজ।

ব্যবসায়িক জীবনে ‘অনিশ্চয়তা’ একটি নিত্যসঙ্গী। বাজার যে কোনো সময় পড়ে যেতে পারে, কাঁচামালের দাম বেড়ে যেতে পারে কিংবা বিশ্বব্যাপী কোনো মহামারী বা মন্দা হানা দিতে পারে। এমন সংকটময় মুহূর্তে ফিন্যান্সিয়াল বাফারিং বা জরুরি তহবিল গঠনের কৌশল জানা থাকা জীবন রক্ষাকারী ঢাল হিসেবে কাজ করে। যারা কেবল লাভের আশায় সবটুকু অর্থ বিনিয়োগ করে ফেলেন এবং কোনো আপদকালীন সঞ্চয় রাখেন না, তারা সামান্য আঘাতেই ভেঙে পড়েন। আধুনিক ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি একজন উদ্যোক্তাকে শেখায় কীভাবে মুদ্রাস্ফীতির সাথে তাল মিলিয়ে নিজের মূলধন রক্ষা করতে হয়। যারা এই অংক বোঝেন না, তারা হয়তো দেখছেন ব্যবসা বড় হচ্ছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বা রিয়েল ক্যাপিটাল কমে যাচ্ছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক অর্থের সংঘাত। আমাদের দেশের অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যবসার ক্যাশ বাক্স আর নিজের পকেটকে এক করে ফেলেন। মাস শেষে তারা বুঝতে পারেন না তারা আসলে কত টাকা মুনাফা করেছেন এবং কত টাকা নিজের পেছনে খরচ করেছেন। ফিন্যান্স ম্যানেজমেন্টের প্রাথমিক পাঠই হলো ‘লিগ্যাল এন্টিটি’ বা ব্যবসাকে নিজের চেয়ে আলাদা সত্তা হিসেবে দেখা। নিজের ব্যবসায় নিজেকে একজন বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসেবে দেখা এবং লভ্যাংশ আলাদা রাখা—এই শৃঙ্খলাটুকু না থাকলে ব্যবসা কখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় না। বড় বড় উদ্যোক্তারা সবসময় পরামর্শ দেন যে, পুঁজিকে কেবল ব্যবসায়িক কাজেই ব্যবহার করতে হবে এবং ব্যক্তিগত বিলাসিতা মুনাফার নির্দিষ্ট একটি অংশ আসার আগে শুরু করা যাবে না।

পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান ডিজিটাল এবং ডেটা-চালিত বিশ্বে ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি একটি বাধ্যতামূলক যোগ্যতা। আপনি যদি আপনার ব্যবসার প্রতিটি পয়সার হিসাব যথাযথভাবে দিতে না পারেন, তবে কোনো বড় বিনিয়োগকারী বা ব্যাংক আপনার ওপর আস্থা রাখবে না। ব্যবসায়িক সমৃদ্ধি কেবল ভালো পণ্য বা আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে আপনার হাতে থাকা প্রতিটি টাকার সঠিক ব্যবহারের ওপর। ব্যবসা একটি ম্যারাথন দৌড়ের মতো, আর এই দৌড়ে সেই টিকে থাকে যার শ্বাস-প্রশ্বাস (ক্যাশ-ফ্লো) এবং শক্তির (ক্যাপিটাল) ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে। তাই প্রত্যেক ব্যবসায়ীর উচিত আজ থেকেই আর্থিক ব্যবস্থাপনার অলিগলিগুলো শেখা শুরু করা। মনে রাখতে হবে, বুদ্ধিমান উদ্যোক্তা কেবল সেটিই খোঁজেন যা লাভজনক, কিন্তু সফল উদ্যোক্তা সেই পথটিই খোঁজেন যেখানে প্রতিটি টাকার হিসাব পরিষ্কার। হিসাব যেখানে সুশৃঙ্খল, সফলতা সেখানে দীর্ঘস্থায়ী এবং অনিবার্য।

লেখক : “দ্য আর্ট অব কর্পোরেট ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট, দ্য আর্ট অব পার্সোনাল ফাইনান্স ম্যানেজমেন্ট, আমি কি এক কাপ কফিও খাবো না, দ্য সাকসেস ব্লুপ্রিন্ট ইত্যাদি বইয়ের লেখক, করপোরেট ট্রেইনার, ইউটিউবার এবং ফাইনান্স ও বিজনেস স্ট্র্যাটেজিস্ট।

এইচআর/এমএস