ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

মনই তোমার সবচেয়ে বড় সম্পদ, তার যত্ন কর

সাইফুল হোসেন | প্রকাশিত: ০৯:২৫ এএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মানুষ সাধারণত তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে কীকে দেখে? কেউ বলে টাকা, কেউ বলে স্বাস্থ্য, কেউ বলে সম্পর্ক। কিন্তু এমন একটি সম্পদ আছে যা এই সবকিছুর ভিত্তি—আর সেটি হলো মন। আপনি কীভাবে ভাবেন, কীভাবে অনুভব করেন, কীভাবে সিদ্ধান্ত নেন—সবকিছুই নির্ভর করে আপনার মনের অবস্থার উপর। এই কারণেই রোমান দার্শনিক মার্কাস অরেলিয়াস লিখেছিলেন, “You have power over your mind — not outside events. Realize this, and you will find strength.” বাস্তবতা নয়, বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের ব্যাখ্যাই আমাদের জীবনকে তৈরি বা ভেঙে দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ কোনো না কোনো মানসিক চাপে ভুগছে। একই সাথে WHO জানায়, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিবছর প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের উৎপাদনশীলতা হারিয়ে যায়। এই সংখ্যা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির গল্প বলে না, এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মন একটি ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তিও বটে। আপনার মন সুস্থ থাকলে আপনি শুধু নিজের জীবনই নয়, আপনার চারপাশের মানুষদের জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেন।

আমরা প্রায়ই শরীরের যত্ন নিতে শিখি—ডায়েট, ব্যায়াম, চিকিৎসা—সবকিছুতেই সচেতনতা থাকে। কিন্তু মনকে আমরা অবহেলা করি। অথচ স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ৩০% পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। মানসিক চাপ শুধু অনুভূতির সমস্যা নয়, এটি শারীরিক বাস্তবতা তৈরি করে। আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব স্ট্রেসের একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রায় ৭৫% চিকিৎসা সংক্রান্ত সমস্যার পেছনে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ একটি বড় ভূমিকা পালন করে।

শেষ পর্যন্ত, মনই সেই জায়গা যেখানে জীবন অনুভূত হয়। সাফল্য, ব্যর্থতা, আনন্দ, বেদনা—সবকিছুই সেখানে জন্ম নেয়। তাই আপনার মনকে শুধু ব্যবহার করবেন না, তাকে যত্ন করুন। কারণ এটিই আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ—যা হারালে সবকিছু থেকেও কিছুই থাকে না, আর যা সুরক্ষিত থাকলে অল্প দিয়েও জীবন পূর্ণ হয়ে ওঠে।

বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম জেমস বলেছিলেন, “The greatest discovery of my generation is that a human being can alter his life by altering his attitudes.” মনকে যত্ন করা মানে শুধু নেতিবাচক চিন্তা এড়ানো নয়, বরং নিজের অভ্যন্তরীণ কথোপকথনকে সচেতনভাবে গড়ে তোলা। কারণ আমরা সারাদিন যেসব চিন্তা করি, সেগুলোই ধীরে ধীরে আমাদের বিশ্বাসে পরিণত হয়, আর বিশ্বাস আমাদের আচরণকে পরিচালনা করে।

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট মনকে শান্ত রাখার জন্য ধ্যান বা প্রতিফলনের চর্চা করেন, তাদের মানসিক স্থিতিশীলতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়। এই পরিবর্তন শুধু অনুভূতিতে নয়, ব্রেইন স্ক্যানেও দেখা যায় যে নিয়মিত মানসিক যত্ন নেওয়া মানুষের মস্তিষ্কের স্ট্রেস রেসপন্স সিস্টেম ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে।

এপিকটেটাস বলেছিলেন, “It’s not what happens to you, but how you react to it that matters.” একই ঘটনা দুইজন মানুষের জীবনে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রভাব ফেলতে পারে—কারণ তাদের মানসিক ব্যাখ্যা ভিন্ন। কেউ প্রতিকূলতাকে ধ্বংস হিসেবে দেখে, কেউ সেটিকে শিক্ষা হিসেবে দেখে। এই পার্থক্যই নির্ধারণ করে কে ভেঙে পড়বে আর কে বেড়ে উঠবে।

আধুনিক নিউরোসায়েন্স দেখিয়েছে যে মস্তিষ্ক স্থির নয়, এটি পরিবর্তনশীল। এই ধারণাকে বলা হয় neuroplasticity। লন্ডন ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ইতিবাচক প্রতিফলন বা সচেতন চিন্তার অনুশীলন করেন, তাদের মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত অংশগুলো সময়ের সাথে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, আপনি যেভাবে চিন্তা করেন, আপনার মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে সেই অনুযায়ী নিজেকে পুনর্গঠন করে।

আমরা প্রায়ই বাইরের অর্জন নিয়ে ব্যস্ত থাকি—ক্যারিয়ার, সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক সফলতা। কিন্তু মন যদি ক্লান্ত, উদ্বিগ্ন বা বিভ্রান্ত থাকে, তাহলে এই অর্জনগুলোও আনন্দ দেয় না। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল কানেম্যান দেখিয়েছেন, মানুষের সুখের অনুভূতি আয়ের একটি নির্দিষ্ট সীমার পর খুব বেশি বাড়ে না, কিন্তু মানসিক শান্তি ও সম্পর্কের গুণগত মান সুখকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

বুদ্ধ বলেছেন, “The mind is everything. What you think you become.” এই উক্তিটি শুধু আধ্যাত্মিক সত্য নয়, এটি মনোবিজ্ঞানের বাস্তবতাও। কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপির (CBT) মতো আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি দেখায় যে চিন্তার ধরন পরিবর্তন করলে অনুভূতি ও আচরণও পরিবর্তিত হয়।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত কৃতজ্ঞতা চর্চা করেন, তাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সুখের অনুভূতি প্রায় ২৫% বেশি থাকে। এটি প্রমাণ করে যে মনকে যত্ন করা মানে শুধু সমস্যা দূর করা নয়, ইতিবাচক অভিজ্ঞতার দিকে সচেতন মনোযোগ দেওয়াও।

জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জের শুরু হয় মনের ভেতরে, এবং প্রতিটি সমাধানেরও শুরু সেখানেই। আপনি যদি নিজের মনকে অবহেলা করেন, তাহলে বাইরের অর্জনও আপনাকে পূর্ণতা দিতে পারবে না। কিন্তু যদি আপনি মনকে যত্ন করেন—তাকে বিশ্রাম দেন, তাকে বোঝেন, তাকে প্রশিক্ষিত করেন—তাহলে আপনি শুধু টিকে থাকবেন না, আপনি বিকশিত হবেন।

শেষ পর্যন্ত, মনই সেই জায়গা যেখানে জীবন অনুভূত হয়। সাফল্য, ব্যর্থতা, আনন্দ, বেদনা—সবকিছুই সেখানে জন্ম নেয়। তাই আপনার মনকে শুধু ব্যবহার করবেন না, তাকে যত্ন করুন। কারণ এটিই আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ—যা হারালে সবকিছু থেকেও কিছুই থাকে না, আর যা সুরক্ষিত থাকলে অল্প দিয়েও জীবন পূর্ণ হয়ে ওঠে।

লেখক: দ্য আর্ট অফ পার্সোনাল ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট, দ্য আর্ট অফ কর্পোরেট ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট, দ্য সাকসেস ব্লু প্রিন্ট, আমি কি এক কাপ কফিও খাব না ইত্যাদি বইয়ের লেখক, ফাইন্যান্স এন্ড বিজনেস মেন্টর।

এইচআর/এএসএম

আরও পড়ুন