ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি কতটুকু নৈতিক?

আহসান হাবিব বরুন | প্রকাশিত: ০৯:৪১ এএম, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশে এক অদ্ভুত বাস্তবতা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে—চাঁদ দেখা যাওয়ার আগেই বাজারে আগুন লাগে। পবিত্র রমজান, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা কিংবা অন্য ধর্মীয় উৎসব ঘনিয়ে এলেই চাল, ডাল, তেল, চিনি, খেজুর, মাংস, পোশাক—প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। যেন উৎসব মানেই বাড়তি মুনাফার মৌসুম। কিন্তু প্রশ্ন হলো—ইসলামের আলোকে এই প্রবণতা কতটা বৈধ? এটি কি কেবল অর্থনৈতিক কৌশল, নাকি নৈতিক অবক্ষয়? আরও গভীরভাবে বললে—এটি কি পাপ নয়?

এই নিবন্ধে কুরআন-হাদিস, ইসলামী চিন্তাবিদদের মতামত, বাংলাদেশের বাস্তবতা এবং অন্যান্য মুসলিম দেশের উদাহরণ বিশ্লেষণ করে দেখব—ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে মূল্যবৃদ্ধি কতটা অন্যায় এবং ইসলামের দৃষ্টিতে তা কতটা কঠোরভাবে নিন্দিত।

১. রমজান: সংযমের মাস, লোভের নয়:
রমজান আত্মশুদ্ধি, সংযম ও তাকওয়ার মাস। মহান আল্লাহ বলেন:
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে… যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।”
— আল কোরআন ২:১৮৩।
তাকওয়া মানে আল্লাহভীতি ও নৈতিক সংযম। অথচ এই মাসেই যদি ব্যবসায়ী সমাজ লোভে অন্ধ হয়ে দরিদ্র মানুষের কষ্ট বাড়ায়, তাহলে তা তাকওয়ার পরিপন্থী। রোজাদার মানুষের ইফতারের সামগ্রী, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য—এসবের দাম বাড়ানো শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি রমজানের আত্মার বিরুদ্ধাচরণ।

২. কুরআনের দৃষ্টিতে মুনাফাখোরি ও কারসাজি:
কুরআনে ওজনে কম দেওয়া, প্রতারণা এবং বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি রয়েছে।
“দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা ওজনে কম দেয়।”
— আল কুরআন ৮৩:১
আরও বলা হয়েছে
“মানুষকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিও না।”— আল কুরআন ৭:৮৫

কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো—এটিও মানুষের অধিকার হরণ। ইসলামী ফিকহে ‘ইহতিকার’ (মজুতদারি) হারাম হিসেবে বিবেচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি কৃত্রিমভাবে খাদ্য মজুত করে দাম বাড়ায়, সে গুনাহগার।”
— সহীহ মুসলিম।

অর্থাৎ এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে উৎসবকে সামনে রেখে পণ্য আটকে রেখে মূল্যবৃদ্ধি করা সরাসরি গুনাহ।

৩. ঈদুল আজহা ও কোরবানির বাজার: ইবাদত না বাণিজ্য?

ঈদুল আজহা হলো ত্যাগের শিক্ষা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কোরবানির পশুর বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। অনেক সময় সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানো হয়। অথচ কুরআন বলছে:

“আল্লাহর কাছে তাদের গোশত বা রক্ত পৌঁছে না; পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।”
—আল কুরআন ২২:৩৭

যেখানে তাকওয়াই মুখ্য, সেখানে কোরবানিকে কেন্দ্র করে অতিমুনাফা অর্জন—ইবাদতের চেতনাকে বাণিজ্যে পরিণত করার শামিল।

৪. ইসলামী স্কলারদের দৃষ্টিভঙ্গি:
মধ্যযুগের প্রখ্যাত আলেম ইমাম গাজ্জালি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ইহইয়া উলুমুদ্দিন-এ লিখেছেন, ব্যবসা ইবাদতের অংশ হতে পারে যদি তা ন্যায় ও সততার ভিত্তিতে হয়। তিনি বলেন:
“লাভ বৈধ, কিন্তু লাভের নামে জুলুম হারাম।”
আধুনিক যুগের আলেম ইউসুফ আল-কারাদাভি তাঁর The Lawful and the Prohibited in Islam গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:
“Monopoly and exploitation contradict the spirit of Islamic brotherhood.”
অর্থাৎ“একচেটিয়া দখল ও শোষণ ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধের পরিপন্থী।”
অতএব, উৎসবকেন্দ্রিক মূল্যবৃদ্ধি ইসলামের ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

৫. বাংলাদেশের বাস্তবতা: উৎসব মানেই মূল্যবৃদ্ধি
বাংলাদেশে রমজান এলেই বাজারে অস্বাভাবিক চাহিদার কথা বলে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানো হয়। অথচ বহু ক্ষেত্রে সরবরাহ থাকে পর্যাপ্ত। মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেট সংস্কৃতি এই প্রবণতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে মুনাফা অর্জন সামাজিক বৈষম্য বাড়িয়ে তোলে । নিম্নআয়ের মানুষ ইফতার বা কোরবানি দিতে গিয়ে হিমশিম খায়। এতে ধর্মীয় আনন্দ ম্লান হয়, উৎসব পরিণত হয় আর্থিক যন্ত্রণায়।

৬. অন্যান্য মুসলিম দেশের উদাহরণ:
মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে রমজান উপলক্ষে সরকার মূল্যনিয়ন্ত্রণ জোরদার করে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার—এসব দেশে রমজানে প্রয়োজনীয় পণ্যে ছাড় দেওয়া হয়। সেখানে রমজানকে ব্যবসার ‘সুযোগ’ নয়, বরং সামাজিক সংহতির সময় হিসেবে দেখা হয়।
তুরস্ক ও মালয়েশিয়াতেও সরকার ও বেসরকারি খাত যৌথভাবে বিশেষ বাজার চালু করে, যাতে নিম্নআয়ের মানুষ কম দামে পণ্য কিনতে পারে। ফলে রমজান সেখানে মূল্যবৃদ্ধির নয়, বরং মূল্যছাড়ের মৌসুম হিসেবে পরিচিত।
বাংলাদেশেও যদি ইসলামী নীতিকে অনুসরণ করা হতো, তবে রমজান হতো ন্যায্য বাণিজ্যের প্রতীক।

৭. নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পরিণতি:
ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে মূল্যবৃদ্ধি শুধু অর্থনৈতিক শোষণ নয় বরং এটি সামাজিক আস্থার ভাঙন। যখন একজন রোজাদার মানুষ ইফতারের জন্য বেশি দাম দিতে বাধ্য হন, তখন তার মনে ক্ষোভ জন্মায়। এই ক্ষোভ সমাজে অবিশ্বাস সৃষ্টি করে।
ইসলাম ন্যায়বিচারকে ঈমানের অংশ হিসেবে দেখেছে। আল্লাহ বলেন:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আদেশ করেন ন্যায় ও সদাচরণের।”
—আল কোরআন ১৬:৯০।

ন্যায়ের আদেশ যেখানে স্পষ্ট, সেখানে উৎসবের সময় অন্যায় মূল্যবৃদ্ধি আল্লাহর আদেশের অবমাননা।

সুতরাং এখানে দেখা যাচ্ছে যে, ইসলাম একটি ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি চায়, যেখানে লাভ থাকবে, কিন্তু শোষণ থাকবে না।

উৎসব হোক মানবতার, মুনাফার নয়। ধর্মীয় উৎসব মানুষের হৃদয়কে কোমল করে, সমাজকে সংহত করে। কিন্তু যদি এই সময়েই মূল্য বৃদ্ধির কারণে দরিদ্র মানুষের কষ্ট বাড়ে, তাহলে তা ইবাদতের আত্মাকে চরমভাবে আঘাত করে। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে,অন্যায় মূল্যবৃদ্ধি, মজুতদারি ও সিন্ডিকেট সংস্কৃতি শুধু অনৈতিক নয়; এটি গুনাহ।

সুতরাং রমজান হোক সংযমের মাস, ঈদ হোক সহমর্মিতার প্রতীক, কোরবানি হোক ত্যাগের শিক্ষা। ধর্মীয় উৎসবকে ব্যবসায়িক শোষণের হাতিয়ার বানানো চিরতরে বন্ধ হোক। কারণ ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে যে,ন্যায়ই প্রকৃত বরকত, আর জুলুম শেষ পর্যন্ত ডেকে আনে ধ্বংস।

লেখক: সাংবাদিক কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]

এইচআর/এএসএম

আরও পড়ুন