ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে শিক্ষাগত যোগ্যতার গুরুত্ব

মো. রহমত উল্লাহ্ | প্রকাশিত: ১০:১৩ এএম, ২২ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের অধিকাংশ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, নীতি বাস্তবায়ন, জবাবদিহিতা ও মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের ভূমিকা/সিদ্ধান্ত অনেক সময় একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ, শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের গতিপথ নির্ধারণ করে। তাই তাদের যোগ্যতা, মানসিকতা, তৎপরতা ও দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতির জন্য স্নাতক ডিগ্রির বাধ্যবাধকতা শিথিল বা বাতিল করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে বিভিন্ন মতামত উঠে এসেছে। এই আলোচনাটি আবেগ বা বিরোধিতার জায়গা থেকে নয়; বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার আলোকে গঠনমূলকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বর্তমান সময়ে শিক্ষা খাতে নানা ধরনের সংস্কার ও পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে। নতুন কারিকুলাম, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও নৈতিকতা বিকাশ, এসব বিষয় বাস্তবায়নের জন্য শুধু নীতিনির্ধারণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন। এই বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সরকার বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে নীতি বা পরিবর্তনের কথা বলছে, তা বাস্তবে প্রতিষ্ঠানে কার্যকর করতে হলে পরিচালনা কমিটির সক্রিয় সহযোগিতা ও সঠিক সিদ্ধান্ত অপরিহার্য।

এই কারণে পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষিত নেতৃত্ব সাধারণত শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য, পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন, শিক্ষকদের ভূমিকা এবং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশ সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে বেশি সচেতন থাকে। ফলে তারা নতুন নীতি ও সংস্কারগুলোকে সহজে বুঝতে পারে এবং তা বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

উচ্চশিক্ষিত সভাপতি ও সদস্য থাকলে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, শিক্ষা প্রশাসনে উৎকর্ষ, সর্বক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত হবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় এবং শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তারা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে সক্ষম হন এবং প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নের জন্য আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি, প্রযুক্তি ব্যবহার ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে আগ্রহী থাকেন।

এতে প্রতিষ্ঠান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, যদি পরিচালনা কমিটির নেতৃত্বে শিক্ষাগত যোগ্যতার মানদণ্ড না থাকে, তবে অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষতা ও অনিয়মের ঝুঁকি বাড়তে পারে। শিক্ষা ব্যবস্থার জটিলতা, নতুন কারিকুলাম বা আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতির বিষয়গুলো সঠিকভাবে অনুধাবন করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ফলে সরকারের ঘোষিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মূলত জ্ঞানচর্চার স্থান। সেখানে যদি নেতৃত্বে এমন ব্যক্তি থাকেন যাদের শিক্ষাগত ভিত্তি দুর্বল, তবে অনেক সময় শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে সমন্বয় তৈরি করা কঠিন হয়ে যায়। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া দুর্বল হয় এবং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাব, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালনা কমিটির নেতৃত্ব নির্ধারিত হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতার একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকলে অন্তত এই পদে কিছুটা যোগ্যতার ভিত্তি নিশ্চিত করা যায়। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থই অধিকতর সুরক্ষিত থাকে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট নৈতিক ব্যক্তিগণও মনেপ্রাণে প্রত্যাশা করেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটিতে অতি উচ্চশিক্ষিত সভাপতি ও সদস্য থাকুক। বিশেষ করে দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষিত দুইজন শিক্ষামন্ত্রীর আমলে সুশিক্ষিতরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও সদস্য হোক এবং পূর্বের অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হোক, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে আসুক, শিক্ষার্থীরা শিক্ষায় মনোনিবেশ করুক, আমাদের সন্তানদের সুশিক্ষা নিশ্চিত হোক- এটি দেশ ও জাতির প্রকৃত হিতাকাঙ্খীদের প্রাণের দাবি।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন কেবল পাঠ্যক্রম পরিবর্তন বা অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ, সচেতন ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি সেই নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই শিক্ষাগত যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণের বিষয়টি শুধু একটি প্রশাসনিক শর্ত নয়; এটি মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান, জবাবদিহিতা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের একটি গ্রহণযোগ্য শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অবশ্যই সহায়ক এবং আবশ্যক।

এক্ষেত্রে সরকার ও সরকারি দল যদি মনে করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্য হবার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা থাকলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে তাদের বৈধ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়/হবে তাহলে শুধু বৃহৎ পরিসরে নির্বাচিত (এমপি এবং জেলা/উপজেলা চেয়ারম্যান) জনপ্রতিনিধিদের সীমিতসংখ্যক কমিটিতে রাখার সুবিধার্থে তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা আপাতত শিথিল করা যেতে পারে। তবে কোনোভাবেই এটি সর্বজনীন করা উচিত নয়।

একটি বিষয় আমরা অনেকেই বুঝতে চাচ্ছি না বা বুঝতে পারছি না যে, সাধারণ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়া এবং সুনির্দিষ্ট কমিটিতে মনোনীত হওয়া, একই মানদণ্ডে পরিমাপ যোগ্য নয়। দুটি পদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা দুই রকম। শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ গঠনের প্রধান ভিত্তি। সেই ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে হলে নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও জ্ঞান, দক্ষতা ও দূরদর্শিতার গুরুত্বকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটিতে স্বল্পশিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত লোক থাকলে শিক্ষকসমাজ অধিক অস্বস্তিতে থাকেন, অসম্মানিত বোধ করেন, অপমানিত হবার আশঙ্কা করেন, স্বজন প্রীতি ও দুর্নীতি হবার সম্ভাবনা বেশি দেখেন। তাছাড়াও অধিকাংশ স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মী/ক্যাডার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি/সদস্য হওয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দলীয় কার্যালয়ে পরিণত করা, সারাক্ষণ প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করে ভালোদের দাবড়ানো, প্রতিষ্ঠানের টাকায় দলীয় লোকদের ভূরিভোজ করানো, প্রতিষ্ঠানের হল-মাঠ দোকানপাট হাট-ঘাট ফল-ফসল ইত্যাদি ভোগদখল করা, ফাঁকিবাজ দলীয় শিক্ষকদের আস্কারা দেওয়া, অকৃতকার্য বেয়াদব শিক্ষার্থীদের প্রমোশন দেওয়া ও ফরম ফিলাপ করা, দলীয় প্রভাবশালীদের টাকা মওকুফ করা, হীন স্বার্থে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা, বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদ্‌যাপনকে দলীয় অনুষ্ঠানে পরিণত করা, সৎ প্রতিষ্ঠান প্রধানের সঙ্গে চরম বিবাদ করা, অসৎ প্রতিষ্ঠান প্রধানের সঙ্গে মিলেমিশে দুর্নীতি করা, শিক্ষক-কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা- এমন অনেক অশুভ দৃশ্য শিক্ষক ও অভিভাবকদের চোখে ভেসে ওঠে! এটি তাদের অনুমান নয়, কল্পনা নয়; বাস্তব অভিজ্ঞতার ফলাফল।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে সুশিক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব। তাই শিক্ষাসংশ্লিষ্ট নৈতিক ব্যক্তিগণও মনেপ্রাণে প্রত্যাশা করেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটিতে অতি উচ্চশিক্ষিত সভাপতি ও সদস্য থাকুক। বিশেষ করে দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষিত দুইজন শিক্ষামন্ত্রীর আমলে সুশিক্ষিতরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও সদস্য হোক এবং পূর্বের অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হোক, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরে আসুক, শিক্ষার্থীরা শিক্ষায় মনোনিবেশ করুক, আমাদের সন্তানদের সুশিক্ষা নিশ্চিত হোক- এটি দেশ ও জাতির প্রকৃত হিতাকাঙ্খীদের প্রাণের দাবি।

সর্বোপরি বলা যায়, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া। বর্তমান সময়ে শিক্ষামন্ত্রীগণ যে পরিবর্তন ও সংস্কারের কথা বলছেন, সেগুলোর সফল বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সক্রিয় ও দক্ষ ভূমিকা অপরিহার্য। আর এই দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার জন্য সভাপতি ও সদস্যদের একটি গ্রহণযোগ্য শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, শিক্ষাচিন্তক ও কলাম লেখক।

এইচআর/জেআইএম