ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

খাল খনন কর্মসূচি: কৃষি ও অর্থনীতিতে প্রাণের সঞ্চার

এ এইচ এম ফারুক | প্রকাশিত: ১১:০৮ এএম, ২২ মার্চ ২০২৬

রাজনীতিতে অঙ্গীকার অনেকেই করেন, কিন্তু সেই অঙ্গীকার রক্ষায় পাহাড়সম দৃঢ়তা দেখানোর নজির ইতিহাসে বিরল। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই বিরল নেতৃত্বের উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তিনি কেবল স্বপ্ন দেখান না, বরং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করে তা হাতে-কলমে প্রমাণ করেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তিনি পিতার সেই কালজয়ী ‘খাল কাটা কর্মসূচি’কে আধুনিকায়ন করে পুনরায় জাতীয় এজেন্ডায় পরিণত করেছেন। সরকার গঠনের মাত্র এক মাসের মাথায় নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম বড় এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দৃষ্টান্ত দেখিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন—এটি কেবল কোনো রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না, বরং এটি ছিল একটি অর্থনৈতিক বিপ্লবের অঙ্গীকার।

তারেক রহমানের সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত এক মাসে রাষ্ট্র পরিচালনার ধরনে এক আমূল পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে ফ্যাসিবাদের জাঁতাকলে পিষ্ট রাষ্ট্রযন্ত্রকে সংস্কার করার পাশাপাশি তিনি জনগণের মৌলিক চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। সরকার গঠনের মাস খানেকের মধ্যেই তিনি দেশের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির সফল উদ্বোধন করেছেন। এই কার্ডের মাধ্যমে কোটি কোটি পরিবার ন্যায্যমূল্যে নিত্যপণ্য পাবেন। যা দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির এই সময়ে সাধারণ মানুষের মাঝে এক বিশাল স্বস্তি ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখবে।

এ ছাড়া প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তিনি নিজে ‘ভিভিআইপি কালচার’ বর্জন করে যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন, তা নজিরবিহীন। গত এক মাসে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের পথ সুগম করতে তার কঠোর নির্দেশনাগুলো দেশের ভেতরে ও বাইরে সরকারের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও তার উন্নয়ন দর্শনের সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে দেশব্যাপী ‘খাল খনন কর্মসূচি’।

১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন খাল কাটা কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলেন, তখন সেটি কেবল পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ছিল না, ছিল একটি আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির বীজবপন। আজ কয়েক দশক পর তারই সন্তান তারেক রহমান সেই কর্মসূচির মশাল হাতে নিয়েছেন। নির্বাচনী ইশতেহারে তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নদী ও খাল খনন হবে তার সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

খাল খনন কর্মসূচি কেন বর্তমান সময়ে অপরিহার্য, তা বুঝতে হলে আমাদের জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃষি ব্যবস্থার দিকে তাকাতে হবে। বাংলাদেশের কৃষি এখনো অনেককাংশেই বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। বর্ষায় বন্যা আর খরায় পানির অভাব—এই দ্বিমুখী সংকট থেকে পরিত্রাণের একমাত্র পথ হলো নদী ও খালগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা। তারেক রহমানের এই উদ্যোগ কেবল মৃত খালগুলোকে প্রাণ দেবে না, বরং কয়েক কোটি একর কৃষিজমিকে সেচ সুবিধার আওতায় নিয়ে আসবে, যা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

একটি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হওয়া এই মেগা প্রকল্পকে সফল করতে হলে কেবল সরকারি দপ্তরের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। এই কর্মসূচির মূল শক্তি হতে হবে ‘গণঅংশগ্রহণ’ বা ‘স্বেচ্ছাশ্রম’। এটিকে সফল করার জন্য নিচের পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।

১. জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা: শহীদ জিয়ার সময় মানুষ কোদাল হাতে যেভাবে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খাল খনন করেছিল, সেই ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ ঘটাতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক কর্মীদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে যে, এই খাল তাদের সম্পদের অংশ। যখন মানুষ নিজে থেকে সম্পৃক্ত হবে, তখন সেখানে দুর্নীতির সুযোগ কমে যাবে এবং কাজের গুণমান নিশ্চিত হবে।

২. বৈজ্ঞানিক ও টেকসই পরিকল্পনা: কেবল যত্রতত্র মাটি কাটলেই হবে না। আধুনিক প্রকৌশল বিদ্যা ব্যবহার করে পানির প্রবাহ ও ভৌগোলিক ঢাল বিশ্লেষণ করে নকশা করতে হবে। ড্রেজিং প্রযুক্তির পাশাপাশি স্থানীয় পলি অপসারণের সহজ উপায়গুলো ব্যবহার করতে হবে যাতে বছরের পর বছর ধরে খালের নাব্যতা বজায় থাকে।

৩. সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা: খাল খননের সাথে সাথে মৎস্য চাষ, সামাজিক বনায়ন এবং হাঁস পালনের মতো কার্যক্রম যুক্ত করতে হবে। খালের পাড়ে পরিকল্পিতভাবে ফলদ ও বনজ গাছ রোপণ করলে তা বজ্রপাত প্রতিরোধ এবং মাটির ক্ষয় রোধে কাজ করবে। সেই সাথে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি হবে।

৪. তদারকি ও স্বচ্ছতা: বড় প্রকল্পে সবচেয়ে বড় ভয় থাকে অর্থ অপচয় ও দুর্নীতির। তারেক রহমানের সরকার যেহেতু স্বচ্ছতার ওপর জোর দিচ্ছে, তাই প্রতিটি খালের জন্য একটি ‘ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম’ থাকা প্রয়োজন। প্রতিটি খালের বর্তমান অবস্থা এবং খনন পরবর্তী ফলাফল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে জনগণের সামনে উন্মুক্ত রাখতে হবে।

৫. দখলমুক্ত করা: খালের নাব্যতা ফেরানোর প্রথম ধাপ হলো অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে খালগুলোকে উদ্ধার করা। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে যারা খাল দখল করে ঘরবাড়ি বা কারখানা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।

তারেক রহমান কেবল খাল কাটার কথা বলছেন না, তিনি আসলে একটি ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতির ভিত গড়তে চাচ্ছেন। অভ্যন্তরীণ নৌপথ সচল হলে পণ্য পরিবহনের খরচ কমে যাবে, যা সরাসরি বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলবে। এ ছাড়া এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে, ফলে পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।

সরকার গঠনের প্রথম মাসেই ফ্যামিলি কার্ডের মতো জটিল প্রক্রিয়া সফলভাবে চালু করা এবং একই সাথে খাল খননের মতো সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রমাণ করে যে, তারেক রহমানের সরকার কোনো অহেতুক কালক্ষেপণে বিশ্বাসী নয়। তিনি জানেন, একটি দেশের উন্নয়ন কেবল বড় বড় মেগা প্রজেক্ট বা ফ্লাইওভারে সীমাবদ্ধ নয়; উন্নয়ন মানে সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং গ্রামবাংলার মাটির উর্বরতা রক্ষা করা।

শহীদ জিয়ার ‘১৯ দফা’ থেকে শুরু করে আজকের ‘ভিশন’—তারেক রহমানের ৩১ দফা তার নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন তিনি তার পিতার যোগ্য যোগ্যতম উত্তরসূরি। খাল খনন কর্মসূচি কেবল পানি প্রবাহের পথ নয়, এটি আমাদের জাতীয় সমৃদ্ধির পথ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেভাবে গত এক মাসাধিককাল ধরে তার নির্বাচনী ওয়াদাগুলো একের পর এক বাস্তবায়ন করে চলেছেন, তা যদি অব্যাহত থাকে তবে বাংলাদেশ অচিরেই একটি আত্মমর্যাদাশীল ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

দেশপ্রেমিক জনতা আজ তারেক রহমানের আহ্বানে সাড়া দিতে প্রস্তুত। কোদাল হাতে দেশ গড়ার সেই যে ইতিহাস শহীদ জিয়া শুরু করেছিলেন, তারই সুযোগ্য পুত্র তারেক রহমানের হাত ধরে সেই ইতিহাসের চূড়ান্ত সফল সমাপ্তি ঘটবে—এটাই আজ সমগ্র জাতির প্রত্যাশা।

লেখক: এ এইচ এম ফারুক (A H M Faruk) সাংবাদিক, কলামিস্ট, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। [email protected]

এইচআর/জেআইএম