ইরান যুদ্ধ ও নেকড়ের আস্তানা
সর্বশেষ খবর হল, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় কোনো সমঝোতা হয়নি। অবশ্য এটা যে হবে না তা সবাই জানতো। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের ১৫টি শর্ত এবং ইরানের ১০টি শর্তের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। তারপরও এই আলোচনার একটি বড় তাৎপর্য আছে। অন্তত দু-সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি পাওয়া গেছে এবং সেটা পূণরায় শুরু করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন কাজ হয়ে গেছে।
যারা জানেন যে আমরা বারবার যুদ্ধ করবো, যুদ্ধই আমাদের পেশা- তাদের যুদ্ধের পরিকল্পনা-পরিচালনার জন্য আলাদা গোপন কক্ষ থাকে। যুদ্ধের পার্মানেন্ট ব্যবস্থা আরকি। এমন যুদ্ধের কক্ষ হিটলারের ছিল দুটি। একটি ‘ফ্যুরার’স বাঙ্কার’ বা ‘জার্মান নেতার বাঙ্কার’, আরেকটি ছিল ‘ওলফ’স লেয়ার’ বা ‘নেকড়ের আস্তানা’। এই নেকড়ের আস্তানা বসানো হয়েছিল দখলকৃত পোল্যান্ডে।
তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে গ্রাউন্ড ফ্লোরে ৫ হাজার স্কয়ার ফিটের একটি কক্ষ আছে যার নাম সিচুয়েশন রুম। ভদ্র নাম। আগে এর নাম ছিল ওয়ার রুম বা যুদ্ধ কক্ষ। এই রুমটি চালু করেছিলেন প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাককিনলি ১৮৯৮ সালে, আমেরিকা-স্পেন যুদ্ধের সময়। তখন এই কক্ষে টেলিগ্রাফ এবং বিশ্ব মানচিত্র নিয়ে নেতারা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতেন, পরিকল্পনা সাজাতেন।
এরপর ১৯৬১ সালে কিউবায় ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে উৎখাতের চেষ্টা করে অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ঠিক এখন যেমন ইরানে চেষ্টা চালালো। কিন্তু সেই অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পর রুমটির নামকরণ করা হয় সিচুয়েশন রুম। জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নে জরুরি আলোচনার জন্য এরকম রুম ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়া এমনকি, কেনিয়া, তানজানিয়া জর্দান, সিয়েরা লিওন বা উগান্ডাতেও আছে। কিন্তু তাদের ওই রুম আর হোয়াইট হাউসের রুমের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য আছে।
যুক্তরাষ্ট্রে এই রুমটি প্রেসিডেন্টের পক্ষে পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউটিরি কাউনসিল। এই কক্ষে যখন গোপন মিটিং হয়, তখন সাধারণত উপস্থিত থাকেন প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অ্যডভাইজার, অন্যান্য নিরাপত্তা বিষয়ক অ্যাডভাইজার, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তরা। এইরকম একটি স্পর্শকাতর কক্ষে এবার এক ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটে গেছে।
১১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় একটি কালো রঙের গাড়িতে করে চুপি চুপি হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। হোয়াইট হাউসে অপেক্ষমান সাংবাদিকদের ফাঁকি দিয়ে ওই কক্ষে প্রবেশ করেন নেতানিয়াহু। সেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বসে আছেন তার নিজের চেয়ার ছেড়ে পাশের অন্য একটি চেয়ারে, দেয়ালে বড় একটি স্ক্রিনের দিকে মুখ করে।
যুক্তরাষ্ট্রকে এ যুদ্ধে জিততে হলে হয় পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে, অথবা দেশটির ২-৪ লাখ সেনা মাটিতে নামাতে হবে। এ দুটির কোনোটিই এখন সম্ভব না। তারপরও সবশেষ কথা, ট্রাম্প খুবই আনপ্রেডিকটেবল মানুষ। তাই সব হিসাব নিকাশের পরও সঠিকভাবে ট্রাম্পের মস্তিষ্ক পাঠ করে আগামী ১০ দিন পরের কথা বলা মুশকিল।
তার চারপাশে বসে আছেন হোয়াইট হাউস চিফ অব স্টাফ সুজি উইলস, সেক্রেটারি অব স্টেট এবং জাতিয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও, সেক্রেটারি অব ওয়ার বা ডিফেন্স সেক্রেটারি পিট হেগসেথ, জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ ড্যান কেইন, সিআইএ ডিরেক্টর জন র্যাডক্লিফ, ট্রাম্পের মেয়ের জামাই এবং প্রেসিডেন্টের বিশেষ প্রতিনিধি জারেদ কুসনার এবং ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি স্টিভ ভিচকফ। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তখন আজারবাইজান সফরে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু রুমে প্রবেশ করে ট্রাম্পের মুখোমুখি অন্য একটি চেয়ারে বসলেন। পর্দায় ভিডিও কানেকশনে দেখা গিয়েছে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের পরিচালক ডেভিড বার্নি এবং অন্যান্য সেনা কর্তাদের। এই গোপন মিটিঙে নেতানিয়াহু বলেন,‘ইরানে শাসক পরিবর্তনের (রেজিম চেঞ্জ) এখনই সময়। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল মিলে এই পরিবর্তন করা সম্ভব। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে রেজা শাহ পাহলভিকে ক্ষমতায় বসানোর কথা বলা হল।
কীভাবে কুর্দি সেনাদের ব্যবহার করা হবে সব বিষয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বোঝানো হয়। মার্কো রুবিও কতটা ঝুকি তা জানতে চাইলে নেতানিয়াহু বলেন, আক্রমণ করলে যা জুকি তারচেয়ে আক্রমণ না করাটা আরো বেশি জুকির। কেউ কেউ আপত্তি বা প্রশ্ন তুলতে চেয়েছিলেন কিন্তু তারা ট্রাম্প্রের বক্তব্যে বুঝতে পারেন, তিনি আক্রমণের পক্ষে। ফলে কেউই আর চাকরি হারাতে চাননি। ১১ ফেব্রুয়ারির এই কাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমসের কাছে কে বা কারা ফাস করে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রব্যাপী হৈচৈ হয়েছে এ নিয়ে। বহু আলোচক এবং যুদ্ধের প্রতিবাদকারীরা বলেছেন, এ ধরণের জাতীয় নিরাপত্তা রুমে একজন বিদেশি কোনোক্রমেই থাকতে পারেন না। কী করে ট্রাম্প সেখানে নেতানিয়াহু এবং স্ক্রিনে মোসাদ পরিচালককে রাখলেন। এটি জাতীয় নিরাপত্তার স্পষ্ট লঙ্ঘন।
মোসাদ এবং নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে কোনো ব্যাপারই না, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে নামলে দু-তিনদিনের মধ্যেই ইরান কাবু হয়ে যাবে। কিন্তু দুদিন গেল, পাঁচদিন গেল, সপ্তাহ গেল- এমনকি ছয় সপ্তাহ গেল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল মিলে ইরানকে কাবু করতে পারল না। বরং এ যুদ্ধ গলায় আটকে গেল। দিন যত গড়িয়েছে ইরানের আক্রমণের শক্তি যেন তত বেড়েছে।
সর্বশেষ এটা পরিস্কার বোঝা গিয়েছে যে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের ক্ষমতাই শুধু কমেনি, তারা ইরানের তীব্র আক্রমণের শিকার হয়েছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। ইরানের সাইবার এবং নেভিগেশন সক্ষমতা হতবিহ্বল করে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি ঘাটি হয় ধ্বংস হয়েছে অথবা অকেজো হয়ে পড়েছে। ইরানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রকে হারাতে হয়েছে অত্যন্ত দামি আধুনিক এফ-১৫ বিমান, সি-১৩০, ব্লাক হক এবং লিটল বার্ড হেলিকপ্টার।
অন্যদিকে ইসরায়েল এখন যে অস্ত্র ব্যবহার করছে তার গায়ে তৈরির সময় লেখা জানুয়ারি ২০২৬। অর্থাৎ নতুন তৈরি অস্ত্রে হাত দিতে হয়েছে। এতদিনের ক্ষেপনাস্ত্রের স্টক শেষ। এখন ইরানকে দিয়ে হরমুজ প্রণালী খোলাতে না পারায় গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতে চাপ পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তার সবচেয়ে বড় দুটি রণতরী ইরান উপকূল থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। যুদ্ধের এই অবস্থায় উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি হতাশ হয়ে উঠেছে। তারা এখন নতুন করে তাদের সম্পর্কের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান কেউ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসেনি। বরং স্পেনসহ ন্যাটোর কয়েকটি দেশ আকাশ ব্যবহার না করতে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ভীষণ ক্ষুব্দ হয়ে ন্যাটোই ভেঙে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ট্রাম্প বিরোধী মনোভাব তীব্র হয়ে উঠেছে। এই সবকিছু থেকে নিজেকে রক্ষা করতে ট্রাম্প তার শক্তি নিয়ে মিথ্যা আস্ফালন করতে থাকেন। ইরানকে ভয়াবহ পরিণতির হুমকি আরো বাড়িয়ে দেন।
৭ এপ্রিল মঙ্গলবার শুন্য আওয়ার পর্যন্ত ইরানকে সময় বেঁধে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্তগুলো মেনে নিয়ে বশ্যতা স্বীকার করতে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন যদি তার দাবিগুলো ইরান না মেনে নেয় তাহলে ইরানি সভ্যতাকে ধ্বংস করে দেবেন। এর আগে বেশ কয়েকবার তিনি ইরানকে নরককুণ্ডে পরিণত করার হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু হুমকিতে কাজ হয়নি। তার আলটিমেটামের সময় শেষ হওয়ার ঠিক ৯০ মিনিট আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নেওয়াজ শরীফ একটি টুইট করেন যে দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে।
ওই টুইটের ভাষা থেকে বিশ্ববাসী ধরে ফেলেছে যে এটি লিখে দেওয়া টুইট। সেখানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর অফিসিয়াল টুইটারে লেখা হয়েছে ‘পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন’! তার আগে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসাক দার কিন্তু চীন সফর করেছেন। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, চিনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বোঝাপড়া হয়েছে। ইসলামাবাদের আলোচনা ছিল তারই বহিঃপ্রকাশ।
এটা পরিষ্কার যে ট্রাম্প ইজ্জত নিয়ে এ যুদ্ধ থেকে সরে যেতে চাইছেন। কিন্তু যুদ্ধ যাতে কোনোক্রমেই বন্ধ না হয় সে জন্য নেতানিয়াহু লাগাতার লেবাননে হামলা করে যাচ্ছেন। শুধু ইউরোপ নয়, খোদ ইসরায়েলেও একটি বড় অংশ তার এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ বলছেন, ট্রাম্প এখন আর দুই সপ্তাহের বিরতির পর যুদ্ধে জড়াবেন না। কারণ এ যুদ্ধে কিছু মানুষ হত্যা এবং অবকাঠামো ধ্বংস ছাড়া কোনো লক্ষ্যই ট্রাম্পের পূরণ হয়নি। সে আর হওয়ার সম্ভাবনাও নেই।
অন্যদিকে সিএনএন এর রিপোর্ট অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, চীন কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানে অস্ত্র সরবরাহ করতে যাচ্ছে। এটাতো আগেই করার কথা ছিল বা করা উচিত ছিল। কারণ ইরান যদি ধ্বংস হয় তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে চীন। আর যদি টিকে থেকে লড়াই চালিয়ে যেতে পারে তাহলে সবচেয়ে লাভবান হবে চীন। ক্ষয় হবে আমেরিকার শক্তি ও সম্পদ।
যুক্তরাষ্ট্রকে এ যুদ্ধে জিততে হলে হয় পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে, অথবা দেশটির ২-৪ লাখ সেনা মাটিতে নামাতে হবে। এ দুটির কোনোটিই এখন সম্ভব না। তারপরও সবশেষ কথা, ট্রাম্প খুবই আনপ্রেডিকটেবল মানুষ। তাই সব হিসাব নিকাশের পরও সঠিকভাবে ট্রাম্পের মস্তিষ্ক পাঠ করে আগামী ১০ দিন পরের কথা বলা মুশকিল।
লেখক: সাংবাদিক, আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
এইচআর/জেআইএম